হোম > বিশ্লেষণ

আল-জাজিরার চোখে মেসি-ম্যারাডোনার দেশ নিয়ে বাংলাদেশিদের উন্মাদনা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

আর্জেন্টিনার ম্যাচ সামনে রেখে বাংলাদেশি সমর্থকদের উৎসব। ছবি: আল-জাজিরা

বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা দলকে বিপুল সমর্থনের বিষয়টি নজর এড়ায়নি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) মেসি আর ম্যারাডোনার দেশকে সমর্থনের উন্মাদনা নিয়ে আল-জাজিরা লিখেছে—আর্জেন্টিনা থেকে প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ বাংলাদেশ। অথচ বিশ্বকাপ এলেই দেশের অলিগলি, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, ছাদ, পাড়া-মহল্লা আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন রূপ নেয় ছোট্ট এক বুয়েনস আইরেসে। আকাশি-সাদা পতাকার ঢেউ, রাতভর খেলা দেখা, বিজয় মিছিল—সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশিদের আবেগ বিশ্বজুড়েই বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে।

ঢাকার একটি বড় পর্দায় আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ম্যাচ শেষ হয়েছে। লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিকের পর খেলা শেষ হলেও হাজারো সমর্থক তখনো স্লোগান দিচ্ছেন—‘আর্জেন্টিনা! মেসি! মেসি!’ চারদিকে বাজছে ভুভুজেলা, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলছে উদ্‌যাপন। দৃশ্যটি যেন আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেসের, অথচ এটি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা।

বাংলাদেশ কখনোই ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে পারেনি। তবুও প্রতি চার বছর পরপর বিশ্বকাপ এলেই দেশের নানা প্রান্তে তৈরি হয় বিশাল পর্দা, আয়োজন করা হয় সারারাত খেলা দেখার অনুষ্ঠান, আর অসংখ্য মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি সাজিয়ে তোলেন আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে।

ঢাকার বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী আবদুল হাইয়ের কাছে এই ভালোবাসার শুরু ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ থেকে। তখন ডিয়েগো ম্যারাডোনার অসাধারণ নৈপুণ্য, আবেগ আর নেতৃত্ব তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। তাঁর ভাষায়, ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলসহ পুরো টুর্নামেন্টই তাঁদের প্রজন্মকে আর্জেন্টিনার প্রেমে ফেলেছিল। এরপর দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে, যখন লিওনেল মেসির হাতে ওঠে কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ ট্রফি। আবদুল হাই বলেন, মেসিকে বিশ্বকাপ জিততে দেখে ফুটবল নিয়ে তাঁর আর কোনো আক্ষেপ নেই।

বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক কোচ ও খেলোয়াড় শফিকুল ইসলাম মানিকের মতে, ১৯৮৬ সালই ছিল বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা-সমর্থনের প্রকৃত সূচনা। ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার ঐতিহাসিক পারফরম্যান্স এবং বিশ্বকাপ জয় মানুষের হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলেছিল। এর আগে ব্রাজিলের আধিপত্য থাকলেও ম্যারাডোনার আবির্ভাব আর্জেন্টিনাকে ব্রাজিলের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

মানিক মনে করেন, ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার পরাজয় এবং ম্যারাডোনার অশ্রুসিক্ত বিদায়ও বাংলাদেশিদের আবেগ আরও গভীর করে তোলে। সেই সময়ের অনেক দর্শক তাঁর কান্নায় নিজেদের বেদনা খুঁজে পেয়েছিলেন। ফলে আর্জেন্টিনার প্রতি সমর্থন আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। একই কারণে জার্মানি বা ইতালির মতো সফল দলগুলো বাংলাদেশে কখনো একই ধরনের জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি।

আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশের ভালোবাসা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের উচ্ছ্বাস আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হওয়ার পর ২০২৩ সালে ৪৫ বছর পর ঢাকায় পুনরায় দূতাবাস চালু করে আর্জেন্টিনা। যদিও এর পেছনে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক স্বার্থও ছিল, দুই দেশের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, ফুটবল দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

শুধু নিজে নন, পোষা বিড়ালটিকেও আর্জেন্টিনার জার্সি পরিয়েছেন এক সমর্থক। ছবি: আল-জাজিরা

তবে নতুন প্রজন্মের কাছে ম্যারাডোনার চেয়ে মেসিই বড় অনুপ্রেরণা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত দ্বীন ইসলাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি মেসির কারণে আর্জেন্টিনাকে ভালোবাসেন। অন্যদিকে মোহাম্মদ জহিরের সমর্থন এসেছে পারিবারিক ঐতিহ্য থেকে। তাঁর বাবা আর্জেন্টিনার সমর্থক ছিলেন, সেই ভালোবাসাই উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছেন তিনি। পরে আর্জেন্টিনার খেলার ধরন তাঁকে আরও বেশি আকৃষ্ট করেছে।

এবারের বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রে হওয়ায় বাংলাদেশের দর্শকদের অনেক ম্যাচ দেখতে হচ্ছে গভীর রাতে কিংবা ভোরে। তবুও সমর্থকদের উৎসাহে কোনো ভাটা নেই। জহির মজা করে বলেন, আর্জেন্টিনার ম্যাচের দিন তাঁর অ্যালার্মের প্রয়োজন হয় না; নিজে থেকেই ঘুম ভেঙে যায়।

ক্রীড়া সাংবাদিক ও ভাষ্যকার শাহানূর রব্বানীর মতে, বাংলাদেশের মানুষ বরাবরই ক্রীড়ার নায়কদের ভালোবাসে। স্বাধীনতার পর বিশ্ব ফুটবলে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার ধারাবাহিক সাফল্য, আর ম্যারাডোনা, রোনালদো, রিভালদো, মেসি কিংবা নেইমারের মতো তারকাদের উপস্থিতি এই দেশের মানুষের আবেগকে প্রভাবিত করেছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশিরা শুধু সুন্দর ফুটবলই নয়, বরং এমন এক নায়ককে খোঁজে, যার সঙ্গে নিজেদের স্বপ্ন ও অনুভূতির মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থনের বিভাজন অনেক সময় একই পরিবারের মধ্যেও দেখা যায়। কোথাও বাবা আর্জেন্টিনার সমর্থক, মা ব্রাজিলের; আবার ভাই-বোনের পছন্দও আলাদা। বিশ্বকাপ এলেই এই বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

তবে এক প্রশ্ন থেকেই যায়—এত ফুটবলপ্রেম থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কেন বিশ্বকাপের মঞ্চে নেই? বর্তমানে ফিফা পুরুষ র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক নিচে। শাহানূর রব্বানীর মতে, দেশে পর্যাপ্ত মাঠ, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, একাডেমি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। তরুণদের প্রতিভা বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো গড়ে ওঠেনি।

একই মত সাবেক কোচ শফিকুল ইসলাম মানিকেরও। তাঁর মতে, বাংলাদেশ একসময় প্রতিভাবান ফুটবলার তৈরি করলেও পরবর্তী প্রজন্ম গড়ে তোলার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তরুণেরা আগামীকালই বিশ্বকাপে খেলতে চায় না; তারা অন্তত একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দেখতে চায়।

বিশ্লেষকদের মতে, আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশের অগাধ ভালোবাসা শুধু আবেগের গল্প নয়; এটি প্রমাণ করে, এ দেশের মানুষ খেলাধুলাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে। এখন প্রয়োজন সেই আবেগকে সঠিক পরিকল্পনা, অবকাঠামো ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের নিজস্ব ফুটবলের শক্তিতে রূপান্তর করা।

২ লাখ ২৯ হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে নতুন ব্রিটিশ-মার্কিন চুক্তি

ইসরায়েলের নতুন টার্গেট তুরস্ক ও ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’ অক্ষ, কী করবে মধ্যপ্রাচ্য

ম্যারাডোনা থেকে মেসি: বাংলাদেশিরা আর্জেন্টাইন ফুটবলার কেন এত বেশি পছন্দ করে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ কী বার্তা দিল

বিশ্বকাপ টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম, প্রশ্নের মুখে ফিফার মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি

দীনেশ ত্রিবেদীকে মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে বাংলাদেশকে কী বার্তা দিল ভারত

সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ কি তবে আসন্ন

বিশ্বকাপে ভাইরাল তারকাদের আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু

প্রেসিডেন্ট পদের দৌড়ে ভ্যান্স-রুবিও দ্বৈরথ প্রকাশ্যে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের প্রভাব সুদূরপ্রসারী: গ্লোবাল টাইমসের নিবন্ধ