হোম > বিশ্লেষণ

শান্তি নয়, গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘মহাসংঘাতে’ জড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। ছবি: সংগৃহীত

গত জুনের মাঝামাঝি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেন। এর পরপরই তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে ওই চুক্তির পক্ষে সমর্থন গড়ে তুলতে শুরু করেন। তাঁদের আশা ছিল, এই সমঝোতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া যাবে এবং যুদ্ধ ধীরে ধীরে অবসানের দিকে নেওয়া সম্ভব হবে।

কিন্তু ইরানের কট্টরপন্থী নেতারা তেহরানে বৈঠকে বসে ভিন্ন এক পরিকল্পনা করেন বলে জানিয়েছেন ইরানি ও আরব কর্মকর্তারা। তাঁদের ধারণা ছিল, এই চুক্তি আসলে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর তৈরি চাপ কমাতে এবং ভবিষ্যতে আরও বড় হামলার প্রস্তুতির জন্য সময় কিনতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একটি কৌশল হতে পারে। তাই আলোচনার ওপর আস্থা রাখার বদলে তাঁরা গত দুই মাসকে আরও বড় সংঘাতের প্রস্তুতিতে কাজে লাগান।

এই প্রস্তুতির মধ্যে রয়েছে—শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসকে (আইআরজিসি) ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনীর ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ দেওয়া, ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধ এবং অতীতের অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নে কঠোর অভিজ্ঞতা অর্জন করা প্রবীণদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ, দেশের অভ্যন্তরে পাল্টা গোয়েন্দা তৎপরতা সম্প্রসারণ এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন বাড়ানো।

ইরানের নেতৃত্ব দ্রুতই উদ্যোগ নিজেদের হাতে নেয়। তারা জাহাজে হামলা চালিয়ে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করার চেষ্টা করে এবং যুদ্ধের ক্ষেত্র রেড সি বা লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত করে। ইরানের পারস্য উপসাগরীয় অবরোধ এড়িয়ে সৌদি আরব যে সমুদ্রপথটি ব্যবহার করে থাকে, সেই লোহিত সাগরকেও সংঘাতের আওতায় আনে তারা।

আরব গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ইরান ও ইয়েমেন ও ইরাকের মতো দেশগুলোর মিত্র মিলিশিয়াদের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন প্রমাণ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। এসব তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, ইরানের কট্টরপন্থী নেতৃত্ব তাদের বাহিনীকে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত করার এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এর মূল্য আরও বাড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত কর্মকর্তাদের মতে, কুয়েতের মতো অপেক্ষাকৃত দুর্বল উপসাগরীয় দেশগুলোকেও আতঙ্কিত করে তুলছে এই পরিস্থিতি। ইরানের নেতারা এখন শত্রু ভূখণ্ডে আক্রমণাত্মক অভিযান চালানোর বিষয়ে ক্রমেই বেশি আলোচনা করছেন।

তাঁদের মূল লক্ষ্য হলো এমন মাত্রায় ক্ষয়ক্ষতি ও যন্ত্রণা সৃষ্টি করা, যাতে ইরানের ওপর গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধে এবং চলমান সংঘাতে যে ধরনের হামলা হয়েছে, তা আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে। তেহরানভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মোহাম্মদ হাসান সাংতারাশ বলেন, ‘ইরানে ব্যাপকভাবে এমন একটি ধারণা রয়েছে যে মূল যুদ্ধ এখনো শুরু হয়নি। এখন পর্যন্ত যা দেখা গেছে, তা ক্রমেই ‘সালামি-স্লাইসিং’ কৌশলের আলোকে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, বড় ধরনের সংঘাতের আগে সক্ষমতাগুলো দুর্বল করে দেওয়ার জন্য সীমিত ও ধাপে ধাপে উত্তেজনা বাড়ানো।’

ইরানের এই প্রস্তুতি যুদ্ধের এই পর্যায়কে ওয়াশিংটন ও তেহরান কতটা ভিন্নভাবে দেখছে, তার মধ্যে বিশাল ব্যবধানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পার্থক্যই ইরানের নেতাদের কঠোর অবস্থান নেওয়া এবং চুক্তি চূড়ান্ত করতে অনীহাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিষয়টি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ধারাবাহিকভাবে হতাশ করেছে। ট্রাম্প ইরানের নেতাদের ‘পাগল’ বলেছেন এবং তাঁদের মিথ্যা বলার অভিযোগ করেছেন।

ইরানের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকার বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে গভীর অবিশ্বাসও তুলে ধরছে। আর এই অবিশ্বাসের কারণে অদূর ভবিষ্যতে সংঘাতের অবসান ঘটাতে দুই পক্ষের মধ্যে একটি টেকসই চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

ইরানের নেতাদের প্রকাশ্য বক্তব্যে অবশ্য দম্ভের উপাদানও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় দেশটির সামরিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ নেতৃত্বের আরও বাস্তববাদী অংশের সদস্যরা বারবার সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ শেষ করার জন্য ইরানের এমন এক চুক্তিতে যাওয়া প্রয়োজন, যাতে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তা না হলে দেশটির অর্থনীতি ধসে পড়তে পারে।

তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা—যারা ইরানের অগ্রগতির বিষয়ে অবগত—তাঁদের উদ্বেগ হলো ইরান প্রত্যাশার তুলনায় অনেক দ্রুত তার অবকাঠামো পুনর্গঠন করছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোতে আবার প্রবেশাধিকার ফিরিয়ে আনছে। একই সঙ্গে ইরান সফলভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে এবং জাহাজ ও উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলার মতো পর্যাপ্ত সামরিক সক্ষমতা এখনো ধরে রেখেছে। আরব কর্মকর্তারা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্নের আশঙ্কায় প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ইরানবিষয়ক সাবেক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কূটনীতিক ও পরমাণু আলোচক অ্যালান আইয়ার বলেন, ‘শাসকগোষ্ঠীর কাছে মূল ভিত্তি হলো যুদ্ধ। ইরান যুদ্ধকালীন অবস্থান বজায় রাখবে এবং পরবর্তী হামলার প্রস্তুতি নিতে থাকবে।’

গত ১৭ জুন ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে সই করার সময় মনে হচ্ছিল, সবচেয়ে বড় বাধা হবে মার্কিন সমালোচকদের বোঝানো যে চুক্তিটি তেহরানের প্রতি অতিরিক্ত উদার নয়। চুক্তিতে ইরানকে তেল বিক্রির সুযোগ দিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা, কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্যের জব্দ করা অর্থে প্রবেশাধিকার এবং দেশটি পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের সম্ভাবনার কথা ছিল। বিনিময়ে ইরানের প্রধান দায়িত্ব ছিল জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং এরপর দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তরিকভাবে আলোচনা করা।

কিন্তু তিন সপ্তাহ পর জুলাইয়ের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র যে জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে পরিচালনা করে নিয়ে যাচ্ছিল, সেগুলোর ওপর ইরান গুলি চালানো শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্র বিস্মিত হয়ে যায়। ট্রাম্প তখন বলেন, ‘ইরানের এই অত্যন্ত বিপজ্জনক মানুষগুলো অসুস্থ।’ তিনি ইরানের নেতাদের ‘আবর্জনা’ বলেও আখ্যা দেন। ট্রাম্প আরও বলেন, ‘তাদের মধ্যে কিছু একটা সমস্যা আছে।’

বাস্তবে ইরান তখন দুই ধারার নীতি অনুসরণ করছিল। একদিকে দেশটির কূটনীতিকেরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিচুক্তির আলোচনা চালাচ্ছিলেন। অন্যদিকে ইরানের নেতা মোজতবা খামেনি এমন পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও বিস্তৃত সংঘাতের জন্য প্রস্তুত করা, এমনকি সেই সংঘাত তেহরান নিজেই শুরু করতে পারে এমন সম্ভাবনাও সামনে রেখে।

বিষয়টি সম্পর্কে সাম্প্রতিক আরব গোয়েন্দা তথ্যের অনুসন্ধান সম্পর্কে অবহিত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সমঝোতা স্মারকের কারণে তৈরি হওয়া শান্ত পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে রেভল্যুশনারি গার্ড অঞ্চলজুড়ে তাদের মিত্র মিলিশিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজন হলে হামলা বাড়ানোর ভিত্তি তৈরি করে। পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে তারা ইরাক, ইয়েমেন ও লেবাননে উপদেষ্টাদের পাঠায়। আটক করা বার্তা যোগাযোগসহ গোয়েন্দা তথ্য থেকে জানা যায়, রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ডাররা ইয়েমেনের হুতিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে গিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাত বাড়ানোর পরিকল্পনা করেন। এই পরিকল্পনা করা হয় ইরানের সমর্থনপুষ্ট ইরাকি মিলিশিয়াদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে।

রেভল্যুশনারি গার্ড লোহিত সাগরের দিকে তাক করে থাকা অবস্থানগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র, নৌ অস্ত্র এবং ড্রোন উৎক্ষেপণব্যবস্থা মোতায়েনের তদারকি করে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা ইয়েমেনি যোদ্ধাদের গোয়েন্দা তথ্য, সৌদি বন্দর ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোসহ লক্ষ্যবস্তুর তালিকা এবং সৌদি পাল্টা হামলা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে কোথায় আশ্রয় নেওয়া যায় সে বিষয়ে পরামর্শও দেয়।

এর ফল হিসেবে জুলাইয়ের শেষভাগ পর্যন্ত লড়াই ক্রমেই তীব্র হয়। হুতিরা সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর ওপর হামলা চালায় এবং বিশ্ববাজারের সঙ্গে লোহিত সাগরের সংযোগকারী বাব এল-মান্দেব প্রণালিকে সৌদি আরবের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। মিলিশিয়া গোষ্ঠীটি সৌদি জাহাজেও হামলা চালিয়েছে। এতে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির প্রচেষ্টা আরও জটিল হয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ ঝুঁকি বেড়ে যায়।

প্রায় একই সময়ে সৌদি আরব জানায়, ইরানের সমর্থনপুষ্ট ইরাকি মিলিশিয়ারা দেশটির তেল স্থাপনাগুলোতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। রেভল্যুশনারি গার্ড উপসাগরীয় দেশগুলোকে হুমকি দিয়ে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়, তাহলে তারা ওই দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করে দেবে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা এতটাই এগিয়ে যায় যে আরব দেশগুলোর অংশীদারদের কাছে পৃথক পৃথক লক্ষ্যবস্তুর বিস্তারিত তালিকাও পাঠানো হয়।

ইরানও মার্কিন সেনাদের ওপর হামলা আরও বাড়িয়ে তোলে। সংঘাতের এক পর্যায়ে সাময়িক বিরতির সময় তেহরান যুক্তরাষ্ট্রকে চমকে দিয়ে জর্ডানের দিকে পাঁচটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এর দুই সপ্তাহ আগে জর্ডানে আরেক ইরানি হামলায় তিন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছিলেন।

উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারা ক্রমেই বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কারণ, তারা দেখছিলেন হামলার পরিধি বাড়ছে এবং ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনের লক্ষ্যবস্তুতে আরও নিখুঁতভাবে আঘাত হানছে। আগস্টেও লড়াই গড়িয়ে যায়। গত দুই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার সময় ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের ছয়টি জাহাজে হামলা চালায়।

ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি জুলাইয়ে ইরানি সংবাদ সংস্থা তাসনিমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা যুদ্ধবিরতির সময়কে পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছি। আমরা আমাদের সক্ষমতা বাড়িয়েছি, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের হার ত্বরান্বিত করেছি এবং ক্ষেপণাস্ত্রের নির্ভুলতা উন্নত করেছি।’

পর্দার আড়ালে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি আরও আগ্রাসী লড়াইয়ের জন্য নিজের বাহিনীকে প্রস্তুত করছিলেন। তিনি সাতজন গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে নতুন করে সাজানো সামরিক ও দমনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করেন। এই পুনর্গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয় মাত্র এক সপ্তাহ আগে। নতুন নিয়োগগুলোর সঙ্গে ছিল আগ্রাসী কিছু লক্ষ্য। এর মধ্যে ছিল সামরিক কমান্ড কাঠামো আরও কঠোর করা, একটি আদর্শিক মিলিশিয়াকে পাড়াভিত্তিক গোয়েন্দা সংস্থায় রূপান্তর করা এবং আক্রমণাত্মক কৌশলের ওপর জোর দেওয়া।

১৯৮০-এর দশকে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া মোহসেন রেজায়িকে ইরানের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব করা হয়েছে। সেখানে তিনি খামেনির প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। গত সপ্তাহে এই কাউন্সিলই হরমুজ প্রণালি ধীরে ধীরে খুলে দেওয়ার একটি চুক্তি নিয়ে চলমান অগ্রগতি থামিয়ে দেয়।

অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করতে খামেনি তাঁর পুরোনো ঘনিষ্ঠ সহযোগী হোসেইন তাইবকে আবারও বাসিজের নেতৃত্বে ফিরিয়ে এনেছেন। ২০০৯ সালের বিক্ষোভে প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাইব। ইসরায়েলি গোয়েন্দারা দুটি যুদ্ধের সময় ইরানের নিরাপত্তা কাঠামো কতটা গভীরভাবে ভেদ করতে পেরেছে, তা প্রকাশ পাওয়ার পর খামেনি তাঁকে স্বেচ্ছাসেবী এই বাহিনীকে ‘জনগণের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কে’ রূপান্তরের দায়িত্ব দিয়েছেন।

ইরান সরকারের উপদেষ্টারা মনে করছেন, সংঘাতের পরবর্তী ধাপ প্রচলিত যুদ্ধের গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশের ভেতরে অস্থিরতা উসকে দেওয়ার জন্য বাইরের প্রচেষ্টাকেও অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। জানুয়ারিতে দেশটির অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সরকার কঠোর হাতে দমন করেছিল। এখন তাদের আশঙ্কা, মার্কিন চাপের কারণে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অব্যাহত অবনতি হলে আবারও বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নামতে খুব বেশি সময় লাগবে না।

খামেনি প্রতিনিয়ত সেনাবাহিনীর ওপরও ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের প্রভাব আরও কেন্দ্রীভূত করেছেন। দুই সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ একীভূত করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি আবদোল্লাহির হাতে দেওয়া হয়েছে। তিনি বিপ্লবী গার্ডের একজন অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ও সামরিক নেতা। পারস্য উপসাগরের আশপাশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে এমন আরব দেশগুলোর ওপর হামলার পক্ষে তিনি জোরালোভাবে অবস্থান নিয়েছেন।

নতুন ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডার-ইন-চিফ আহমাদ ভাহিদি মার্চ থেকেই অনানুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সোমবার তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদ দেওয়া হয়। তাঁকে ‘শত্রুর বিরুদ্ধে শক্তিশালী আক্রমণাত্মক অভিযান’ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে তাঁকে নিয়োগের ডিক্রিতে উল্লেখ করা হয়। এর পরদিন ভাহিদির উপদেষ্টা জেনারেল মোহাম্মাদ রেজা নাঘদি বলেন, আধাসামরিক বাহিনীকে অবশ্যই শত্রুর ভূখণ্ডে অভিযান চালানোর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেনেসি অ্যাট শ্যাতানুগার ইরানের নিরাপত্তা সংস্থাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ সাঈদ গোলকার বলেন, ‘ভাহিদির পদোন্নতি এমন একটি নেতৃত্বের প্রস্তুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যারা স্বাভাবিক শান্তিকালীন রাজনীতিতে ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের একটি সময়ের জন্য নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রস্তুত করছে।’

প্রায় ২ লাখ সদস্যের সশস্ত্র বাহিনী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড আরও উত্তেজনা বাড়ানোর নতুন পরিকল্পনা তৈরি করেছে বলে ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও প্রকাশ্য বিবৃতি থেকে জানা গেছে। এসব বিকল্পের মধ্যে রয়েছে আগাম হামলা, পারস্য উপসাগরে ইন্টারনেটের সাবমেরিন কেবল নাশকতা করা, কুয়েত ও বাহরাইনের মতো শিয়া জনগোষ্ঠী রয়েছে এমন দেশগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করা এবং এমনকি সম্ভাব্য স্থল অভিযান চালানো।

কুয়েত এসব ঝুঁকিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। মে মাসের শুরুতে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী জানায়, তারা ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের ছয় সদস্যকে আটক করেছে। ওই সদস্যরা একটি ভাড়া করা মাছ ধরার নৌকা ব্যবহার করে কুয়েতের একটি দ্বীপে অবতরণ করেছিল। দ্বীপটি ইরান থেকে মাত্র একটি সরু ইরাকি ভূখণ্ড দিয়ে বিচ্ছিন্ন।

ইরানের কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এমনও প্রস্তাব দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি খার্গ দ্বীপের মতো ইরানি ভূখণ্ডকে হুমকি দেয়, তাহলে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড দক্ষিণ ইরাক হয়ে কুয়েতে স্থল অভিযান চালাতে পারে। উপসাগরীয় কয়েকজন কর্মকর্তা বলেছেন, যুদ্ধের পর ইরানের সাম্প্রতিক আচরণ এই অঞ্চলের অনেক বড় এবং এখন আরও আগ্রাসী প্রতিবেশীর সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের সক্ষমতার ওপর ঠিক কতটা ক্ষতি করতে পেরেছে, তা নিরূপণ করা এখনও কঠিন বলে তারা জানান। তবে তাদের মতে, একটি বিষয় স্পষ্ট—সংগঠনটি পরাজিত বা নিরুৎসাহিত হয়নি। বরং হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আঞ্চলিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে।

এই বাস্তবতাই উপসাগরীয় দেশগুলোকে এমনকি নিজেদের জন্য প্রতিকূল চুক্তিকেও সমর্থন করতে ঠেলে দিয়েছে। এসব চুক্তির মাধ্যমে ইরানকে হরমুজ প্রণালির ওপর কিছুটা তদারকির স্বীকৃতি দেওয়া হতে পারে, বিনিময়ে তেহরানকে আরও উত্তেজনা সৃষ্টি বন্ধ করতে হবে। তবে একই সঙ্গে আঞ্চলিক নেতারা কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রতিক্রিয়ায় তেহরানের আচরণে মৌলিক কোনো পরিবর্তন না আসায় ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ছেন।

তাদের মতে, ইরানের নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নেতৃত্ব নিজেদের দাবির ব্যাপারে ক্রমেই বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে। আলোচনার মধ্যস্থতাকারীরা জানান, মাসের শুরুতেই ইরানি কূটনীতিকরা ওমানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে সম্মত হয়েছিলেন। ওই চুক্তির লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে চলাচলের পথ নির্ধারণ ও তদারকি করা এবং ধীরে ধীরে প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়া। কিন্তু ইসলামি বিপ্লবী গার্ড সেই প্রচেষ্টা আটকে দেয় এবং আবারও জাহাজে হামলা শুরু করে।

আলোচনা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ইরান সংঘাত বাড়ানোর পথ থেকে সরে না আসায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আপাতত পিছু হটেছেন। মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, তিনি দেখছেন নিষেধাজ্ঞাজনিত অর্থনৈতিক চাপ এবং মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ ইরানের অবস্থানকে কতটা নরম করতে পারে। তবে ইরানের নেতারা ট্রাম্পের উদ্দেশ্য নিয়ে গভীরভাবে সন্দিহান। তারা এমন একটি ‘টিকে থাকার অর্থনীতি’র দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যার লক্ষ্য হলো যত দীর্ঘ সময় সম্ভব চাপ সহ্য করে টিকে থাকা।

ইরানের শীর্ষস্থানীয় আলোচকদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা সতর্ক করেছেন, শান্তি আলোচনা হয়তো পরবর্তী সংঘাতের আগে কেবল একটি সাময়িক বিরতি। ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মাদ বাঘের গালিবাফের কৌশলগত উপদেষ্টা মেহদি মোহাম্মাদি মঙ্গলবার বর্তমান অচলাবস্থাকে ‘ঝড়ের আগের শান্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এর আগে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মোহাম্মাদি বলেন, সংঘাত অব্যাহত থাকার অন্যতম চালিকাশক্তি হলো ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার ‘প্রজন্মব্যাপী রক্তের বদলা’ প্রকল্প। আলি খামেনি হলেন মোজতাবা খামেনির বাবা। ইরানের আলোচনাদলের সদস্য মোহাম্মাদি আরও বলেন, ‘ইরানি জাতির এখনো ট্রাম্পের সঙ্গে অনেক অসমাপ্ত হিসাব রয়েছে। ইরান মহাসংঘাতের জন্য প্রস্তুত।’

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান