হোম > বিশ্লেষণ

নেপালে ভয়াবহ বিপর্যয় কি প্রাচীন প্রজ্ঞা ভুলে আধুনিক নগরায়ণের ফল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

নদী পাশে অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ পানির প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করেছে। ছবি: এএফপি

নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলায় বরফ ও পাথরের ভয়াবহ ধসের পর সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও কাদা-পাথরের স্রোতে এক বিশাল মানবিক ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এই ঘটনায় অন্তত ৪৬৯ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ১ হাজার ৪৬৮ জনেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২৬ আগস্ট স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে কাঠমান্ডু থেকে উত্তরে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় এই বিশাল হিমবাহ ধসটি ঘটে। ধসের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে ভূ-পৃষ্ঠে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য কম্পন সংকেত রেকর্ড করা হয়।

আন্তর্জাতিক পার্বত্য সমন্বিত উন্নয়ন কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি) এবং কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে, হাজার হাজার টন বরফ ও পাথর পাহাড় থেকে খসে ‘লেন্দে খোলা’ নদী অববাহিকায় আছড়ে পড়ে। এতে নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ কিছু সময়ের জন্য অবরুদ্ধ হয়ে কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হয়। পরবর্তীতে পানির প্রচণ্ড চাপে সেই বাঁধ ভেঙে গিয়ে ভয়াবহ বেগে কাদা, পাথর ও পানি নিচে নেমে আসে। এর ধাক্কায় ভোটে কোশী ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকার তিমুরে ও স্যাব্রুবেসির মতো এলাকা প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সেতু ও বসতি সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে।

প্রতিটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর নিখোঁজ ও মৃত্যুর সংখ্যায় স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা তারতম্য ঘটে। দ্বৈত নাগরিকত্ব, লাশ শনাক্তকরণের জটিলতা এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে উভয় দেশের প্রশাসন প্রতিনিয়ত তালিকা হালনাগাদ করছে। সীমান্ত অঞ্চলের উভয় পার মিলিয়ে অন্তত ১ হাজার ৪৬৮ জন। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, তাদের সীমানায় ৯১০ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে অন্তত ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক। তবে নেপাল পর্যটন বোর্ডের হিসাবে নিখোঁজ পর্যটক ও পরিব্রাজকের সংখ্যা ৬৬৭ (যার মধ্যে ১২৭ জন স্থানীয় নেপালি পর্যটক)। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের সীমানায় ২৬০ জন বিদেশিসহ মোট ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

ভূ-গঠনগত ঝুঁকি ও ‘মরেন’ সংকট

বিজ্ঞানীদের মতে, নেপাল ও হিমালয় অঞ্চল দুটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের (ইন্ডিয়ান প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেট) সংযোগস্থলে অবস্থিত, যা বছরে প্রায় ২০ মিলিমিটার গতিতে একে অপরের মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। এই ভৌগোলিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বায়ুমণ্ডলীয় উষ্ণতা বৃদ্ধি।

ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউট অব হিমালয়ান জিওলজির (ডব্লিউআইএইচজি) জ্যেষ্ঠ হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ড. মণীশ মেহতা ব্যাখ্যা করেন, বিশ্বজুড়ে হিমালয়ের হিমবাহগুলো আশঙ্কাজনক হারে পিছু হটছে। গলিত হিমবাহের পেছনে বিপুল পরিমাণ আলগা পাথর, কাদা ও পলির স্তূপ রেখে যায়—যাকে ‘মরেন’ বলা হয়। ২ হাজার ৮০০ মিটার উচ্চতার ওপরে জমা হওয়া এই মরেন অত্যন্ত অস্থির ও ভঙ্গুর। বর্তমানে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে উঁচুতে বরফের বদলে বৃষ্টিপাত বাড়ছে। অতিরিক্ত বৃষ্টি ও বরফগলা পানি আলগা মরেনকে ভাসিয়ে নিয়ে বিশাল ধ্বংসাত্মক কাদাস্রোতে পরিণত করে।

ড. মেহতা সতর্ক করেন, বাঁধ ভেঙে গেলে অথবা জলীয় চাপ বাড়লে এই আলগা মরেন পানির সঙ্গে মিশে নদীর স্বাভাবিক পানির ঘনত্ব বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়, যা নদীর পারের সবকিছু গুঁড়িয়ে দেওয়ার শক্তি লাভ করে।

প্রাচীন প্রজ্ঞা বনাম আধুনিক নগরায়ণ

নেপালের কাঠমান্ডুভিত্তিক সংস্থা আইসিআইএমওডি-এর ক্রিওস্ফিয়ার বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ ফারুক আজম চীন থেকে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে এনডিটিভিকে জানান, প্রাথমিক বিশ্লেষণে এটিকে কেবল প্রাচীন হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা বলা যায় না। এটি বরফ ও পাথরের যৌথ ধস, যা উপত্যকায় এক ভয়াবহ ক্যাস্কেডিং (ধারাবাহিক) প্লাবন তরঙ্গের জন্ম দিয়েছে।

ড. আজম সতর্ক করে বলেন, হিমালয় অঞ্চলে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের ধরন এই বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করেছে। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি হিমালয়ের প্রাচীন আদিবাসীদের বসতি স্থাপনের কৌশল দেখেন, তবে দেখবেন তাঁরা নদী থেকে বেশ উঁচুতে পাহাড়ের ঢাল বা চূড়ায় বাড়িঘর বানাতেন। পানির জন্য নিচে নামতে হলেও থাকার জন্য নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতেন। কিন্তু আধুনিক সময়ে নদীর একদম সংলগ্ন এলাকা, প্লাবনভূমি, এমনকি নদীর ওপর খুঁটি পুঁতে বাজার, ঘরবাড়ি ও হোটেল নির্মাণ করা হচ্ছে।’

ড. আজম ২০১৩ সালের ভারতের কেদারনাথ, ২০১০ সালের লেহ এবং ২০২১ সালের চামোলি ট্র্যাজেডির উদাহরণ টেনে বলেন, নদীগুলোর স্বাভাবিক চলাচলের পথ রুদ্ধ করার কারণেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

ড. আজম আরও সতর্ক করে বলেন, মূল প্লাবন পার হয়ে যাওয়ার পরও বিপদ কাটেনি। বন্যার তীব্র ধাক্কায় উপত্যকার দু’পাশের পাহাড়ের ঢালগুলো মারাত্মকভাবে দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। এখন থেকে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস ধরে খুব সামান্য বৃষ্টিপাত বা ছোটখাটো ভূ-কম্পনেও নতুন করে ‘গৌণ ভূমিধস’ ঘটতে পারে। ফলে বাসিন্দাদের এখনই ধ্বংসস্তূপে ফিরে যাওয়া বিপজ্জনক।

এদিকে পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতি হওয়ায় নেপাল ও চীন উভয় পক্ষই রসুয়া সীমান্তে রেড অ্যালার্ট জারি রেখেছে।

এই আন্তর্জাতিক বিপর্যয়ের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের রাজনীতিতেও। নেপালে তিব্বত সীমান্তবর্তী কৈলাশ মানস সরোবর যাত্রায় গিয়ে রাজ্যটির ৮০ জনেরও বেশি তীর্থযাত্রী নিখোঁজ বা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় গতকাল বৃহস্পতিবার রাজ্য বিধানসভা তীব্র বাদানুবাদে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

ক্ষমতাসীন তামিলগা ভেট্রি কাজাগাম (টিভিকে) সরকার এবং বিরোধী দল দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগাম (ডিএমকে)-এর মধ্যে পরিষদীয় নিয়মকানুনের প্রয়োগ নিয়ে তর্কবিতর্ক শুরু হয়।

ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন বিরোধী দলের মূল মুলতবি বা মনোযোগ আকর্ষণী নোটিশ উত্থাপনের আগেই স্কুল শিক্ষামন্ত্রী রাজ মোহন নিখোঁজ তীর্থযাত্রীদের বিষয়ে সরকারি বিবৃতি দিতে উদ্যত হন। বিরোধী দলনেতা উদয়নিধি স্টালিন এবং জ্যেষ্ঠ নেতা কে এ সেনগোত্তাইয়ান এর তীব্র প্রতিবাদ জানান।

বিধানসভার স্পিকার জে সি ডি প্রভাকর প্রথমে পূর্বের ঘটনার উদাহরণ দিলেও, পরে বিরোধীদের দাবি মেনে নিয়ে তাঁদের প্রথমে বক্তব্য রাখার অনুমতি দেন। বিরোধী দলনেতা উদয়নিধি স্টালিন বিধানসভায় বলেন, ‘স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে রাজ্যের পরিবারগুলোর মধ্যে মারাত্মক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। সরকার থেকে ঠিক কতজনের উদ্ধার কাজ শেষ হয়েছে, হেল্পলাইনে আসা ফোনগুলোর কী গতি হচ্ছে এবং নেপালে কোনো বিশেষ উদ্ধারকারী দল পাঠানো হচ্ছে কি না—তা পরিষ্কার করা দরকার।’

প্রতিবেদনে জানা যায়, মাদ্রাজ হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক বিচারপতি শিবজ্ঞানমও আক্রান্ত হিমালয় এলাকায় আটকে পড়া ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছেন।

পরবর্তীতে শিক্ষামন্ত্রী রাজ মোহন জানান, কেন্দ্র এবং নেপালের ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে রাজ্য সরকার যৌথভাবে কাজ করছে।

উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, একাধিক জায়গায় পথ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ার ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।হিমালয় অঞ্চলের তিন দেশ—চীন, নেপাল ও ভারত—রেড অ্যালার্ট জারি রেখে হেলিকপ্টার ও বিশেষ পার্বত্য উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করেছে।

তবে বায়ুমণ্ডলীয় উষ্ণায়ন এবং হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যে এই ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি আন্তসীমান্ত সমন্বিত নদী ও ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতি প্রয়োগের তাগিদ দিয়েছেন পরিবেশবিজ্ঞানীরা।