ভারতের মেইনস্ট্রিম লেফটরা এটা উপলব্ধিই করতে পারেননি যে এখানকার শ্রেণি পরিচিতির মধ্যেও বর্ণবিভাজন, লৈঙ্গিক বিভাজন ও জাতিসত্তা এবং ভাষা প্রশ্নগুলো মিলেমিশে আছে। এটা হয় তাঁরা উপলব্ধি করতে পারেননি অথবা উপলব্ধি করলেও এই বিষয়টাকে এড়িয়ে চলতে চেয়েছেন। এখানকার বেশির ভাগ কমিউনিস্ট হলেন ভদ্রবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি। আর এই ভদ্রবিত্ত মানেই উচ্চবর্ণ। তাঁরা মনে করেন নিম্নবর্ণের মানুষ যাঁরা কিংবা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও মুসলমান যাঁরা, তাঁরা নাকি উচ্চবর্ণের থেকে অনেক পিছিয়ে! হা হা! এ জন্য এই তথাকথিত কমিউনিস্ট পার্টি সিপিএম-এর পলিটব্যুরোতে দেখুন নিম্নবর্ণের জায়গা নেই, বাঙালি মুসলমানের উল্লেখযোগ্য কোনো উপস্থিতি নেই। নারীদের জায়গাও খুবই কম। সেখানে গুটিকয়েক উচ্চবর্ণের মানুষ বছরের পর বছর ধরে চেয়ার আগলে বসে রয়েছেন। ফলে একসময়ে যে কমিউনিস্ট আন্দোলন বাংলায় তথা উপমহাদেশে আলোড়ন তৈরি করেছিল, তা ক্রমশই শূন্যের কোটায় মিলিয়ে গেল!
এর কারণ কমিউনিস্ট পার্টি যাদের লড়াইয়ের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উঠে এসেছিল, তাদের কণ্ঠস্বর তাদের প্রতিনিধিত্ব ধারণ করতে পারল না। কিছু তাত্ত্বিক কচকচানির মধ্যে আর ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেল মেইনস্ট্রিম কমিউনিস্টরা। এই উচ্চবর্ণের তাত্ত্বিক বিপ্লবীদের কাছে বিপ্লব না হলে কিছুই যায় আসে না। কারণ উচ্চবর্ণের প্রতিনিধি হওয়ার কারণে, বর্ণহিন্দু হওয়ার কারণে শ্রেণির লড়াইয়ে তাঁদের আন্তরিকতা ছিল না, জেদ ছিল না। এই লড়াইটা যে জিততেই হবে, বিদ্যমান এই ব্যবস্থাটা যে ভেঙে ফেলতেই হবে—এমন কোনো সংকল্প তাঁদের মধ্যে ছিল না। তাঁরা খালি নেতাগিরির দোকানদারি চালিয়েছেন। এ কারণেই নিম্নবর্ণের ও নিম্নবর্গের মানুষদের তাঁরা কাছে টানতে পারেননি।
নকশালবাড়ির কথাটা ভিন্ন। নকশালবাড়ির রাজনীতির প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু ভুল-ভ্রান্তি থাকলেও ওই লড়াইটা এই বৈষম্য আর নিপীড়নের ব্যবস্থাকে সমূলে উচ্ছেদ করার ডাক দিয়েছিল সামগ্রিকভাবে। ... সেইটা ভিন্ন পরিসরে আলোচনার বিষয় হতে পারে।
তথ্যসূত্র: অতনু সিংহ কর্তৃক পশ্চিমবঙ্গের দলিত লেখক মনোরঞ্জন ব্যাপারীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ, ‘প্রতিপক্ষ’ পত্রিকা থেকে সংগৃহীত