ক্রিস্টা ও তাঁর প্রেমিক তাদারিল শিপ মিলে টেনেসির নক্সভিলে স্লেমারকে যেভাবে হত্যা করেন, সেটা ছিল যথেষ্ট নৃশংস। স্লেমারের বুকে খোদাই করা একটি উল্টো ‘পেন্টাগ্রাম’ বা শয়তান উপাসকদের প্রতীক পাওয়া যায়। সাজা ঘোষণার সময় বিচারক হয়তো এই নৃশংসতার কথাই স্মরণে রেখেছিলেন। হত্যাকাণ্ডের সময় ক্রিস্টা পাইকের প্রেমিকের বয়স ১৭ বছর থাকায় তিনি মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পান। তবে সাজা ঘোষণার সময় ক্রিস্টার বয়স ২০ বছর পূর্ণ হওয়ায় তাঁকে পেতে হয় ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট। ফলে তিনি হয়ে যান মার্কিন ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী কয়েদি।
তারপর ৩০ বছর ধরে ক্রিস্টা প্রতিদিন অপেক্ষা করেছিলেন, কবে তাঁর সাজা কার্যকর করা হবে। কোনটি হবে তাঁর শেষ দিন। তাঁকে কেউ কিছু বলত না, তাঁর মামলা সম্পর্কে, সাজা সম্পর্কে কোনো কিছুই তিনি জানতে পারতেন না। ডেথ রো-তে তাঁর সঙ্গে কারও দেখা-সাক্ষাৎ সাধারণত হতো না। ফলে ৩০ বছর পর যখন তাঁকে জানানো হলো, বিষাক্ত ইনজেকশন প্রয়োগের মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, তিনি অস্পষ্ট স্বরে বলেছিলেন, ‘আমি মরতে ভয় পাই না, তবে পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে কিছুটা নার্ভাস।’
ক্রিস্টার নার্ভাসনেস ছড়িয়ে পড়ল সাজা কার্যকরকারীদের মধ্যেও। বলতে গেলে কারা অধিদপ্তর থেকে সেই নার্ভাসনেস আক্রান্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পুরো বিচারব্যবস্থাকে। কারণ, ক্রিস্টা পাইক মারা যাননি। পেন্টোবারবিটল নামের বিষাক্ত রাসায়নিক ইনজেকশনের দুটি ডোজ তাঁর শরীরে পুশ করার পরও তাঁর মৃত্যু হয়নি। তিনি অচেতন হয়ে পড়েন বটে, কিন্তু তাঁর হৃৎপিণ্ড সচল ছিল, ঘড়ঘড় করে নাক ডাকার আওয়াজ পাচ্ছিলেন উপস্থিত সকলে। তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া দেখার জন্য দাতব্য সংস্থার সহায়তায় প্লেনের টিকিট কিনে আরেক রাজ্য থেকে উড়িয়ে আনা হয়েছিল স্লেমারের মা মে মার্টিনেজ ও তাঁর স্বামীকে। তাঁরা পুরো ঘটনাটি দেখে হতাশ কণ্ঠে বলেন, ‘পুরো বিষয়টি চরম বিশৃঙ্খল ও ব্যর্থ। এমন একটি দিন বা একটি মিনিট যায় না, যখন আমি কলিন স্লেমারের কথা ভাবি না। ছুটির দিনগুলো আমার জন্য সবচেয়ে কষ্টের।’
এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় টেনেসি রাজ্যের গভর্নর আদেশ জারি করে এ বছর কার্যকরের অপেক্ষায় থাকা রাজ্যের সব মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করে দিয়েছেন। উল্লেখ্য, টেনেসি রাজ্যে গত ২০০ বছরের মধ্যে প্রথম কোনো নারী অপরাধী হিসেবে ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সিদ্ধান্ত হয়েছিল, যা আপাতত ব্যর্থ হয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনে ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রথম ডোজের মাধ্যমে মৃত্যু না হলে দ্বিতীয় ডোজ প্রয়োগের বিধান আছে। কিন্তু দ্বিতীয় ডোজ কাজ না করলে তৃতীয় বা চতুর্থ ডোজ প্রয়োগ করা যাবে কি না, তার উল্লেখ নেই! বিপিসি বা ব্রিটিশ পেনাল কোড অনুসারে দড়িতে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়ার সময় নির্দিষ্ট প্রটোকল অনুসরণ করার পরও অপরাধীর মৃত্যু না হলে পরে আর তা কার্যকর করা হয় না। যেমন কাউকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখার পরও মৃত্যু না হলে, কিংবা ফাঁসিতে ঝোলানোর পরপরই ফাঁসির দড়ি ছিঁড়ে গেলে বা আলগা হয়ে গেলে, ফাঁসির বেদি ভেঙে গেলে, লিভার জ্যাম হয়ে গেলে ইত্যাদি যেকোনো প্রক্রিয়ায় ফাঁসিতে মৃত্যু নিশ্চিত করা না গেলে সেই অপরাধীর সাজা মওকুফ হয়ে যায় ‘অ্যাক্ট অব গড’-এর নামে। অর্থাৎ তাঁর প্রাণভিক্ষা সৃষ্টিকর্তার মাধ্যমে মঞ্জুর হয়েছে ধরে নেওয়া হয়।
কিন্তু মার্কিন পেনাল কোডে এমন কিছু লেখা নেই। তৃতীয়বার চেষ্টা করা যাবে না—এমনটা যেমন লেখা নেই, তেমনি করা যাবে, সেটাও লেখা নেই! ক্রিস্টার তাহলে কী হবে? তিনি যদি হাসপাতালের লাইফ সাপোর্ট থেকে ফিরে আসেন, তাহলেও কি আবার তাঁকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হবে? নাকি তাঁর জীবন স্বয়ং ঈশ্বর রক্ষা করেছেন ধরে নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে; সেই সিদ্ধান্ত জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। যেটা ক্রিস্টার ভাষায় ‘ক্লান্তিকর ও বিরক্তিকর’।
ক্রিস্টা পাইক এখনো বেঁচে আছেন। অথবা, ক্রিস্টা পাইক এখনো মারা যাননি। অর্থ একই হলেও দুটি বাক্য দুই রকমের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। আপনি কোনটা গ্রহণ করবেন?