হোম > নারী

ভারতের প্রথম নির্বাচনে কেন বাদ পড়েছিলেন ২৮ লাখ নারী

জগৎপতি বর্মা, ঢাকা

১৯৫১-৫২ সালে ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের আগে রাজস্থানে নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

অক্টোবর, ১৯৫১। হিমাচলের কল্পা অঞ্চলের এক দুর্গম পাহাড়ি গ্রাম। সেখান থেকে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে এক তরুণী তাঁর বৃদ্ধ মাকে নিয়ে এসেছেন ভোটকেন্দ্রে। উদ্দেশ্য ছিল, স্বাধীন ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ।

ওই দিনের ঘটনাটি নিয়ে খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ তাঁর বিখ্যাত ‘ইন্ডিয়া আফটার গান্ধী’ বইয়ে লিখেছেন, ‘...অন্তত সেই একটি দিনের জন্য হলেও ওই নারী অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, এই রাষ্ট্রে তাঁর মূল্য রয়েছে এবং তিনি গুরুত্বপূর্ণ।’

তবে ১৯৫১ সালের অক্টোবরের কনকনে শীতে স্বাধীন ভারতের প্রথম লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে ২৮ লাখের বেশি নারী ভোট দিতে পারেননি। কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা বা রাজনৈতিক বৈষম্যের কারণে নয়, তাঁরা বাদ পড়েছিলেন ভোটার তালিকায় নিজেদের প্রকৃত নাম অন্তর্ভুক্ত না করে পুরুষ স্বজনদের পরিচয়ে নিবন্ধিত হওয়ার কারণে। সে সময়কার উত্তর ও মধ্য ভারতের একটি বড় অংশের নারী সামাজিক সংকোচ ও পিতৃতান্ত্রিক প্রথার কারণে বহিরাগত গণনাকারীদের কাছে নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চাননি। ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম উঠেছিল ‘রামের মা’, ‘রহিমের স্ত্রী’, ‘অমুকের মেয়ে’ কিংবা ‘অমুকের বিধবা স্ত্রী’ হিসেবে।

স্বাধীন ভারতে প্রথম নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ

স্বাধীন ভারতের জন্য ১৯৫১-৫২ সালের নির্বাচন কেবল জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়াই ছিল না, ছিল একটি পরীক্ষা। সে সময় ভারতের নতুন সংবিধানে ২১ বছর বা তার বেশি বয়সের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ভোটাধিকার দেওয়া হয়। এর আগে পৃথিবীর ইতিহাসে এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে একসঙ্গে সার্বভৌম ভোটাধিকার দেওয়া হয়নি। তখনকার হিসাবে মোট ভোটার ছিলেন ১৭ কোটি, তার মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যাই ছিল প্রায় ৮ কোটি।

নির্ধারিত ১৭ কোটি ভোটারের সিংহভাগই ছিলেন চরম দরিদ্র, নিরক্ষর এবং আধুনিক শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ।

পশ্চিমের বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সে সময় প্রকাশ্যে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছিল, ভারতের মতো একটি জনবহুল ও নিরক্ষর দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের সর্বজনীন ভোটাধিকারের ধারণা পাগলামি ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে দেশি-বিদেশি সমালোচকদের ভুল প্রমাণ করে ঐতিহাসিক এই মহাযজ্ঞ সফলভাবে সম্পন্ন করেছিল ভারত। আর সেই জটিল, বিশাল ও প্রায় অসম্ভব বলে মনে হওয়া নির্বাচনকে সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার পেছনে যাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি ছিল, তিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেন।

সুকুমার সেন একজন গণিতবিদ ও দক্ষ সরকারি কর্মকর্তা। তিনি নির্বাচন কমিশনার হিসেবেও সফল হয়েছিলেন। নদী, পাহাড়, বন-জঙ্গল পেরিয়ে প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন ব্যালট বাক্স।

ভারতে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সুকুমার সেনের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়ায়। তা হলো, ভোটার তালিকায় জায়গা পাওয়া প্রতিটি মানুষকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। কোনো পুরুষের অধীন বা কেবল কারও ‘স্ত্রী’, ‘কন্যা’ বা ‘মা’ হিসেবে নয়।

পুরুষ স্বজনদের পরিচয়ে নারীদের তালিকাভুক্ত করার এই সামাজিক প্রথাকে সুকুমার সেন ‘অতীতের কুসংস্কারাচ্ছন্ন উচ্ছিষ্ট’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। তিনি ঘোষণা করেন, স্বাধীন ভারতে ভোটাধিকার কেবল ভোট দেওয়ার অধিকার নয়, এটি একজন নাগরিকের মর্যাদার প্রতীক। তাঁর পরিচয়। তাই পুরুষদের নাম বা সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া পরিচয় ভোটার তালিকায় স্থান পাবে না। তিনি দেশের নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন, নারীদের পুরুষ স্বজনদের পরিচয় মুছে ফেলে তাঁদের নিজের নাম ভোটার তালিকায় যুক্ত করতে হবে।

কেন পুরুষ স্বজনদের পরিচয়ে নথিভুক্ত হতেন নারীরা

১৯৫১-৫২ সালের প্রথম নির্বাচনে সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রবর্তন করা হলেও শত শত বছর ধরে গেঁথে থাকা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধাগুলো রাতারাতি উপড়ে ফেলা সহজ ছিল না। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলে ভোটাধিকার ছিল সীমিত। সম্পত্তি, শিক্ষার হার কিংবা স্বামীর সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে তখন খুব অল্পসংখ্যক নারী ভোট দেওয়ার সুযোগ পেতেন। উপরন্তু, ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক বিধিতে নারীদের সামাজিক সংকোচের কথা বিবেচনায় নিয়ে নিজেদের নাম না দিয়ে স্বামী বা বাবার পরিচয়ে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল।

ফলে ১৯৪৮ ও ১৯৪৯ সালে যখন স্বাধীন ভারতের প্রথম খসড়া ভোটার তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়, তখন ভারতের তৎকালীন যুক্ত প্রদেশ (বর্তমান উত্তর প্রদেশ), বিহার ও রাজস্থানের মতো এলাকাগুলোতে গণনাকারীরা বাড়ি বাড়ি গেলে নারীরা অপরিচিত পুরুষ আধিকারিকদের সামনে নিজেদের নাম বলতে ইতস্তত বোধ করেন। তৎকালীন গ্রামীণ ও ঐতিহ্যবাহী পরিবারগুলোতে ‘পরপুরুষের সামনে গৃহবধূর নাম উচ্চারণ’ করা সামাজিক নীতিবিরুদ্ধ বলে মনে করা হতো। ফলে মাঠপর্যায়ের কর্মচারীরাও ঝামেলা এড়াতে ঔপনিবেশিক আমলের মতো ‘অমুকের স্ত্রী’ বা ‘অমুকের মা’ হিসেবে খাতায় নাম তুলে নেন।

১৯৫৫ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচনের ওপর ভারতের নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, নারীদের নাম না দেওয়ার এই প্রবণতা কোনো রাজনৈতিক অনীহা বা ভোটদানে অনিচ্ছার কারণে ছিল না। এটি ছিল স্থানীয় সামাজিক কুপ্রথা। কিন্তু সুকুমার সেন এবং তাঁর নির্বাচন কমিশন নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। কোনো নাগরিককেই তাঁর নিজের পরিচয় ছাড়া ভোটার হিসেবে গণ্য করা হবে না।

বাড়ি বাড়ি প্রচার, ঢোল পিটিয়ে সচেতনতা ও সামাজিক বাধা

কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ অরনিট শানির বিখ্যাত গবেষণাগ্রন্থ ‘হাউ ইন্ডিয়া বিকেম ডেমোক্রেটিক: সিটিজেনশিপ অ্যান্ড দ্য মেকিং অব দ্য ইউনিভার্সাল ফ্র্যাঞ্চাইজ’-এ পাওয়া যায়, নারীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার এই সংকটটি ১৯৪৮ সাল থেকেই তৈরি হয়েছিল, অর্থাৎ সুকুমার সেন ১৯৫০ সালের মার্চে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই।

তৎকালীন যুক্ত প্রদেশের (উত্তর প্রদেশ) বিভিন্ন জেলার প্রশাসকেরা প্রাদেশিক সরকারকে জানান, স্থানীয় নারীরা কোনোভাবেই বহিরাগত আধিকারিকদের কাছে নিজেদের আসল নাম প্রকাশ করতে রাজি হচ্ছেন না। তাঁরা নিজেদের ‘অমুকের স্ত্রী’, ‘অমুকের কন্যা’ কিংবা ‘অমুকের বিধবা স্ত্রী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার দাবি জানাচ্ছেন। জবাবে তৎকালীন পূর্ব পাঞ্জাব ও যুক্ত প্রদেশের সরকার একটি নির্বাহী আদেশ জারি করে। সেখানে বলা হয়, ‘ভোটার তালিকায় নারীর আসল ও পূর্ণ নাম প্রবেশ করানো বাধ্যতামূলক।’

কিন্তু এরপরও চ্যালেঞ্জ ছিল পরিবারগুলোকে রাজি করানো। কীভাবে এই সামাজিক দেয়াল ভাঙা সম্ভব? ১৯৪৮ সালের নভেম্বরে আগ্রার জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো এবং পরবর্তী সময়ে সমস্ত জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো একটি সরকারি চিঠিতে নারীদের সচেতন করতে খবরের কাগজ, গণমাধ্যম এবং হাটবাজারে ‘ঢোল পিটিয়ে’ প্রচার চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। নারীদের মানসিক সংকট ও সংকোচ দূর করতে বিশেষ নারী কর্মী ও গণনাকারী নিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়।

সে সময় বিহারে ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য অতিরিক্ত এক মাস সময়সীমা বাড়ানো হয়েছিল, যাতে বাদ পড়ার ঝুঁকিতে থাকা নারীদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়। নির্বাচন কমিশনের ১৯৫৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিহার সরকার এই বর্ধিত সময়ের সুযোগ নিয়ে ভোটার তালিকায় ব্যাপক সংস্কার আনে এবং বহু নারীর নাম যুক্ত করে। তবে রাজস্থানে অতিরিক্ত সময় দেওয়া সত্ত্বেও সামাজিক গোঁড়ামির কারণে তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি।

তবে কমিশনের বার্তা ছিল স্পষ্ট—আইন সবার জন্য সমান। নির্দিষ্ট সময়সীমা, সচেতনতামূলক অভিযান ও বিশেষ সুযোগ দেওয়ার পরও যেসব নথিতে সংশোধন আনা সম্ভব হয়নি, সেগুলো বাদ দেওয়া হয়। ফলে ভারতের প্রায় ৮ কোটি নারী ভোটারের মধ্যে প্রায় ২৮ লাখ নারী ভোটার শেষ পর্যন্ত প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে চিরতরে বঞ্চিত হন। এই বাদ পড়া ২৮ লাখ নারীর প্রায় সবাই ছিল বিহার, উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান, বিন্ধ্য প্রদেশ (বর্তমান মধ্যপ্রদেশের অংশ) এবং মধ্য ভারত অঞ্চলের।

প্রথম নির্বাচনে বাদ পড়া এই ২৮ লাখ নারী ঐতিহাসিক মুহূর্তটির অংশ হতে পারেননি সত্য, তবে সুকুমার সেনের এই কঠোর নীতিগত অবস্থান নতুন গণপ্রজাতন্ত্রের ভিত চিরতরে শক্ত করে দিয়েছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, রাষ্ট্রের চোখে প্রতিটি নাগরিক সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ উল্লেখ করেছেন, সুকুমার সেন এই সামাজিক বিতর্ক ও আলোড়নকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই ধাক্কাটি সমাজের ভেতরে শিকড় গেড়ে বসা পিতৃতান্ত্রিক প্রথাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে।

১৯৫১ সালের অক্টোবরে রাজস্থানের ভরতপুরে এক জনসভায় সুকুমার সেন নিজে গিয়ে উপস্থিত নারীদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, প্রথম নির্বাচনে নাম না থাকলেও পরবর্তী নির্বাচনের আগেই তাঁদের সম্মানজনকভাবে পূর্ণ নামে ভোটার তালিকায় যুক্ত করা হবে। নির্বাচন কমিশনের সেই নিরলস প্রচেষ্টার ফল মিলেছিল খুব দ্রুতই। ১৯৫৭ সালে দেশের দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচনের আগেই সুকুমার সেনের উদ্যোগে সেই বাদ পড়া ২৮ লাখ নারীর মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ নারী নিজেদের আসল ও পূর্ণ নামে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন।

ওই সময় সুকুমার সেনের এই দক্ষ ও নীতিভিত্তিক নির্বাচন পরিচালনার সুনাম সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫৩ সালে আফ্রিকা মহাদেশের সুদান তাঁদের প্রথম সংসদীয় নির্বাচন আয়োজনের জন্য সুকুমার সেনকে আমন্ত্রণ জানায়। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি সুদানের নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সেখানেও একটি সফল নির্বাচন উপহার দেন।

‘ইন্ডিয়া টুডে’তে প্রকাশিত সাংবাদিক সুশীম মুকুলের লেখা থেকে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা।