১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসের এক তপ্ত দুপুর। ৯ বছরের ছোট একটি মেয়ে বাড়ির দোতলার জানালায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। একটু আগেই এয়ার রেইড সাইরেন বেজে উঠেছিল। তাই মার্কিন যুদ্ধবিমান দেখার কৌতূহলে জানালার বাইরে চোখ রাখতেই বাতাসে ভেসে থাকা একটি প্যারাস্যুট আর চোখধাঁধানো এক তীব্র আলোর ঝলকানি দেখা গেল। পর মুহূর্তেই সব অন্ধকার। সংজ্ঞা হারিয়ে বারান্দার মেঝেতে গড়িয়ে পড়া সেই ছোট্ট মেয়েটির নাম জুনকো ওয়াকিয়ামা। ১৯৪৫ সালের ৯ আগস্টের সেই পারমাণবিক বোমার ধ্বংসলীলা থেকে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল সে।
এখন জুনকো বয়স ৮৯ বছর। থাকেন নাগাসাকিতে। জুনকো এখন বয়সী রন্ধনশিল্পী এবং স্থানীয় খাদ্যবিশেষজ্ঞ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পারমাণবিক বোমা হামলা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী চরম খাদ্যসংকটের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তিনি ঐতিহ্যবাহী রান্না শেখানো এবং খাদ্য অপচয় রোধে সচেতনতা ছড়িয়ে যাচ্ছেন আজও।
জুনকোর জন্ম ও বেড়ে ওঠা জাপানের নাগাসাকি শহরে। যুদ্ধ তখন শেষ দিকে, কিন্তু দুঃখের ট্র্যাজেডি শুরু হয়েছিল আগেই। বোমার তাণ্ডবের কিছুদিন আগে, ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাত্র ৪২ বছর বয়সে জুনকোর বাবা যক্ষ্মায় ভুগে মারা যান। পাঁচ সন্তানকে নিয়ে একেবারে একা হয়ে পড়েন মা তোশিকো। তিনি ছিলেন এক স্থানীয় বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের গার্হস্থ্য বিজ্ঞানের শিক্ষিকা। স্বামীর মৃত্যুর ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই নাগাসাকিতে নেমে আসে পারমাণবিক বোমার নারকীয় বিপর্যয়। হাইপোসেন্টার বা বোমার মূল কেন্দ্রস্থল থেকে ৩ দশমিক ৩ কিলোমিটার দূরে থাকায় জুনকো কোনোমতে বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর স্কুলের উরাকামি এলাকার অর্ধেক সহপাঠী আর বাড়ি ফেরেননি। যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনি পড়তেন, বোমা হামলায় সেটা ছাই হয়ে যায়। এরপর সেপ্টেম্বরে ভর্তি হতে হয় নতুন এক স্কুলে। সে সময় স্কুলের মাঠেই জমে থাকা কাঠ দিয়ে চলত নিহত মানুষের সৎকার। মাঠে খেলতে গিয়ে পাথর কুড়াতে গেলে হাতে উঠে আসত মানুষের পোড়া হাড়ের টুকরা!
যুদ্ধের পর শুরু হলো চরম দুর্ভিক্ষ। চারদিকে খাদ্যের সংকট। শিশুদের শরীর শীর্ণকায়, কঙ্কালসার। স্কুলের রিপোর্ট কার্ডে সবার স্বাস্থ্যবিষয়ক মন্তব্যের ঘরে একটাই কথা লেখা থাকত—অপুষ্টি। কিন্তু মা তোশিকো হার মানেননি। সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখতে তিনি পণ করেছিলেন। বলতেন, ‘পাথর ছাড়া বাকি সবকিছু কিন্তু খাওয়া যায়।’ মা আর সন্তানদের প্রতিদিনের যুদ্ধ শুরু হলো খাবারের খোঁজে। জুনকো আর তাঁর ভাইবোনেরা বাইরে থেকে যা কিছু খাওয়ার উপযোগী বুনো গাছপালা পেতেন, কুড়িয়ে আনতেন। মা তোশিকো সেই বুনো শাকসবজি দিয়েই বানিয়ে ফেলতেন সুস্বাদু সুইতন ডাম্পলিং সুপ। সাগোর তৈরি পেস্ট দিয়ে বানাতেন সুস্বাদু জিয়াওজি ডাম্পলিং। আর মিষ্টি বলতে ছিল আলুর হালকা ঝোল বা সুইট পটেটো সুপ। মিছো সুপ বানানোর পর কড়াইয়ে পড়ে থাকা সেদ্ধ শুকনা চ্যাপা বা সার্ডিন মাছগুলোও ফেলে দেওয়া হতো না। তিতা লাগলেও মা তাদের বুঝিয়ে-সুজিয়ে সেই মাছ খাইয়ে দিতেন—যেন সন্তানদের শরীরে প্রোটিনের ঘাটতি না হয়।
মায়ের এই অমূল্য শিক্ষা জুনকোর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। তিনি বুঝেছিলেন, একটু সদিচ্ছা ও সৃজনশীলতা থাকলে যেকোনো সাধারণ খাবারই সুস্বাদু ও পুষ্টিকর করে তোলা সম্ভব। মায়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে জুনকো নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেন। সিদ্ধান্ত নেন, তিনিও মায়ের মতো গার্হস্থ্য বিজ্ঞানের শিক্ষিকা হবেন, নিজের পায়ে দাঁড়াবেন। নাগাসাকি ইউনিভার্সিটি থেকে হোম ইকোনমিকস বিষয়ে পড়ার সময় তিনি তাঁর স্নাতক থিসিসের বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন মায়ের রান্নায় ব্যবহৃত সেই শুকনা সার্ডিন মাছের অ্যামিনো অ্যাসিডের পরিমাণগত বিশ্লেষণ। এরপর জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বিভিন্ন হাইস্কুল ও কলেজে পুষ্টিবিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যাপনা করেন।
সময় গড়িয়েছে, যুদ্ধের সেই কালো দিনগুলো এখন ইতিহাস। জাপানে এসেছে প্রাচুর্য। কিন্তু ৮৯ বছর বয়সে পৌঁছেও জুনকো ওয়াকিয়ামা সেই সংগ্রামের দিনগুলো ভুলে যাননি। আজও তিনি নাগাসাকির ঐতিহ্যবাহী রান্নার কর্মশালা পরিচালনা করেন। নবীনদের শেখান উরাকামি সোবোরো—যেখানে পাতলা করে কাটা শূকরের মাংস, গাজর আর বরবটি বা বারডক রুট দিয়ে এক চমৎকার মিষ্টি ও ঝাল স্বাদের তরকারি তৈরি করা হয়। আজকের তরুণ প্রজন্মকে তিনি শেখান খাবার অপচয় না করার মন্ত্র। মায়ের স্মৃতি মনে করে বলেন, ‘মূল-জাতীয় সবজির খোসা ফেলবে না, তাও খাওয়া যায়। চিংড়ির শক্ত খোসা বা বাঁধাকপির ভেতরের শক্ত অংশটুকুও ফেলে দেওয়ার মতো নয়।’
আজকের দিনে যখন পৃথিবীজুড়ে খাবারের প্রাচুর্য আছে, তখন জুনকো ওয়াকিয়ামা মানুষকে বারবার মনে করিয়ে দিতে চান সেই অভাবের দিনের কথা। তিনি বিশ্বাস করেন, যুদ্ধ কিংবা পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে যদি আবার কখনো খাদ্যসংকট ফিরে আসে, তবে তখন আফসোস করে কোনো লাভ হবে না। তাই আজকের প্রাচুর্যের দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রত্যেককে খাবারের প্রতিটি দানার সঠিক মূল্য দিতে শিখতে হবে।
সূত্র: দ্য মেইনিচি