রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গ্রুমিং বা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি ভয়াবহ রূপ নেয়। কারণ, সেখানে ক্ষমতা, প্রলোভন, গোপনীয়তা ও প্রভাব একসঙ্গে কাজ করে। সম্প্রতি রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের এমন কিছু সংবাদ দেখিয়ে দিয়েছে, গ্রুমিং পরিচিত ও ক্ষমতাধর ব্যক্তির হাতেও ঘটতে পারে।
গ্রুমিং নিজে কোনো স্বতন্ত্র মানসিক রোগ নয়। এটি একটি অপরাধমূলক আচরণ কৌশল। তবে এর পেছনে বেশ কিছু মানসিক ব্যাধি কাজ করতে পারে। পেডোফিলিক ডিসঅর্ডার বা প্রিপিউবার্টাল শিশুদের প্রতি তীব্র যৌন আকর্ষণ; অ্যান্টি-সোশ্যাল পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার বা অন্যের অধিকার ও নিরাপত্তার প্রতি চরম অবহেলা, প্রতারণা, অনুশোচনাহীনতা বা নার্সিসিস্টিক পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার অর্থাৎ আত্ম মুগ্ধতা, প্রশংসার অতিরিক্ত প্রয়োজন, শিকারকে নিজের সম্পত্তি ভাবা।
এ ছাড়া সাইকোপ্যাথি, শৈশবের ট্রমা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও কগনিটিভ ডিস্টরশন কাজ করে। ক্ষমতাধর ব্যক্তির ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় কাজ করে—এনটাইটেলমেন্ট অর্থাৎ আমি যা চাই, তা পাওয়ার অধিকার আমার আছে।
গ্রুমিং শুধু ব্যক্তির মানসিক সমস্যা নয়, এর গভীর সামাজিক শিকড় আছে। বাংলাদেশে শিশু ও তরুণীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে অপরাধী পরিবারের সদস্য, আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক বা পরিচিত কেউ। এর পেছনে কাজ করে বিষাক্ত পিতৃতন্ত্র, সামাজিক নীরবতা, দারিদ্র্য ও নির্ভরতা, রাজনৈতিক ক্লায়েন্টেলিজম এবং বিচারহীনতা। পরিবারের ‘সম্মান’ রক্ষার চাপে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে পারেন না। অন্যদিকে ক্ষমতার আশ্রয়ে অপরাধীরা আইন, প্রশাসন ও মিডিয়ার সহায়তা পেয়ে যান। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৫৩ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কিশোর-কিশোরী অনলাইন গ্রুমিংয়ের শিকার। চাইল্ড লাইট গ্লোবাল চাইল্ড সেফটি ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের গবেষণায় উঠে এসেছে, ১৮ বছর হওয়ার আগে ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ মেয়ে এবং ১৯ শতাংশ ছেলে অনলাইন গ্রুমিংয়ের শিকার হয়। গত এক বছরের হিসাবে এই হার ৭ দশমিক ৪ শতাংশ মেয়ে এবং ৫ দশমিক ৩ শতাংশ ছেলে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ৩০৬ জন মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যেখানে ছেলেশিশুর সংখ্যা ৩০। দেশের প্রথম সারির একটি জাতীয় দৈনিক তাদের প্রতিবেদন জানিয়েছে, দেশে প্রতি চারজন মেয়েশিশুর মধ্যে একজন এবং প্রতি ছয়জন ছেলেশিশুর মধ্যে একজন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়।
অচেনা বা পরিচিত কোনো প্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে হঠাৎ খুব ঘনিষ্ঠতা, ব্যাখ্যাহীন উপহার বা টাকা, ফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত গোপনীয়তা, পরিবার-বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যাওয়া, কারও সঙ্গে গোপনে দেখা করতে চলে যাওয়া—এগুলো বিপদের সংকেত হতে পারে। এ রকম কিছু চোখে পড়লে সতর্ক হতে হবে।
লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার বিডি