হোম > নারী

রাজনৈতিক ক্ষমতার আড়ালে শিশু ও নারীর গ্রুমিং পেছনে মনস্তত্ত্ব কী

অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া

ছবি: পেক্সেলস

রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গ্রুমিং বা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি ভয়াবহ রূপ নেয়। কারণ, সেখানে ক্ষমতা, প্রলোভন, গোপনীয়তা ও প্রভাব একসঙ্গে কাজ করে। সম্প্রতি রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের এমন কিছু সংবাদ দেখিয়ে দিয়েছে, গ্রুমিং পরিচিত ও ক্ষমতাধর ব্যক্তির হাতেও ঘটতে পারে।

গ্রুমিং যেভাবে ঘটে

রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রেক্ষাপটে গ্রুমিং সাধারণত ছয়টি ধাপে ঘটে।

  • ব্যক্তি নির্বাচন: আর্থিকভাবে দুর্বল, পারিবারিক সমস্যায় আছেন, কর্মহীন বা সামাজিক মর্যাদার আশায় থাকেন, অপরাধী এমন নারীকে বেছে নেন।
  • আস্থা অর্জন: প্রশংসা, উপহার, বিভিন্নভাবে অর্থ দেওয়া, পড়ার খরচ, চাকরির প্রলোভন বা রাজনৈতিক পরিচয়ের মাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
  • বিচ্ছিন্নতা: ধীরে ধীরে তরুণীকে পরিবার ও বন্ধুদের থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়।
  • সংবেদনশীলতা হ্রাস: অশ্লীল কথা, ছবি, ভিডিও, মাদক বা ব্যক্তিগত দেখা-সাক্ষাতের মাধ্যমে তাঁকে ধীরে ধীরে যৌন বিষয়ে অভ্যস্ত করা হয়।
  • নিয়ন্ত্রণ ও হুমকি: গোপনীয়তার চাপ, ব্ল্যাকমেল, সামাজিক অপমান, মামলা, পুলিশ বা রাজনৈতিক ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে তাঁকে চুপ করানো হয়।
  • শোষণ: সবশেষে যৌন নির্যাতন, বারবার ডেকে নেওয়া, বাল্যবিবাহ, ট্রাফিকিং বা দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ শুরু হয়।

আসলে মনস্তত্ত্ব কী

গ্রুমিং নিজে কোনো স্বতন্ত্র মানসিক রোগ নয়। এটি একটি অপরাধমূলক আচরণ কৌশল। তবে এর পেছনে বেশ কিছু মানসিক ব্যাধি কাজ করতে পারে। পেডোফিলিক ডিসঅর্ডার বা প্রিপিউবার্টাল শিশুদের প্রতি তীব্র যৌন আকর্ষণ; অ্যান্টি-সোশ্যাল পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার বা অন্যের অধিকার ও নিরাপত্তার প্রতি চরম অবহেলা, প্রতারণা, অনুশোচনাহীনতা বা নার্সিসিস্টিক পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার অর্থাৎ আত্ম মুগ্ধতা, প্রশংসার অতিরিক্ত প্রয়োজন, শিকারকে নিজের সম্পত্তি ভাবা।

এ ছাড়া সাইকোপ্যাথি, শৈশবের ট্রমা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও কগনিটিভ ডিস্টরশন কাজ করে। ক্ষমতাধর ব্যক্তির ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় কাজ করে—এনটাইটেলমেন্ট অর্থাৎ আমি যা চাই, তা পাওয়ার অধিকার আমার আছে।

শুধুই কি মানসিক সমস্যা

গ্রুমিং শুধু ব্যক্তির মানসিক সমস্যা নয়, এর গভীর সামাজিক শিকড় আছে। বাংলাদেশে শিশু ও তরুণীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে অপরাধী পরিবারের সদস্য, আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক বা পরিচিত কেউ। এর পেছনে কাজ করে বিষাক্ত পিতৃতন্ত্র, সামাজিক নীরবতা, দারিদ্র্য ও নির্ভরতা, রাজনৈতিক ক্লায়েন্টেলিজম এবং বিচারহীনতা। পরিবারের ‘সম্মান’ রক্ষার চাপে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে পারেন না। অন্যদিকে ক্ষমতার আশ্রয়ে অপরাধীরা আইন, প্রশাসন ও মিডিয়ার সহায়তা পেয়ে যান। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৫৩ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কিশোর-কিশোরী অনলাইন গ্রুমিংয়ের শিকার। চাইল্ড লাইট গ্লোবাল চাইল্ড সেফটি ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের গবেষণায় উঠে এসেছে, ১৮ বছর হওয়ার আগে ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ মেয়ে এবং ১৯ শতাংশ ছেলে অনলাইন গ্রুমিংয়ের শিকার হয়। গত এক বছরের হিসাবে এই হার ৭ দশমিক ৪ শতাংশ মেয়ে এবং ৫ দশমিক ৩ শতাংশ ছেলে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ৩০৬ জন মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যেখানে ছেলেশিশুর সংখ্যা ৩০। দেশের প্রথম সারির একটি জাতীয় দৈনিক তাদের প্রতিবেদন জানিয়েছে, দেশে প্রতি চারজন মেয়েশিশুর মধ্যে একজন এবং প্রতি ছয়জন ছেলেশিশুর মধ্যে একজন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়।

যেভাবে সতর্ক থাকা যেতে পারে

অচেনা বা পরিচিত কোনো প্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে হঠাৎ খুব ঘনিষ্ঠতা, ব্যাখ্যাহীন উপহার বা টাকা, ফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত গোপনীয়তা, পরিবার-বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যাওয়া, কারও সঙ্গে গোপনে দেখা করতে চলে যাওয়া—এগুলো বিপদের সংকেত হতে পারে। এ রকম কিছু চোখে পড়লে সতর্ক হতে হবে।

গ্রুমিংয়ের শিকার হলে যেভাবে সাহায্য চাইবেন

আপনি নিজে কিংবা বন্ধু বা পরিচিত কেউ গ্রুমিং বা যৌন নির্যাতনের শিকার হলে সঙ্গে সঙ্গে সাহায্য নিন। দেশে কিছু টোল ফ্রি হেল্পলাইন আছে। যেমন—

  • শিশু সহায়তা হেল্পলাইন: ১০৯৮ এটি ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে।
  • জরুরি সেবা: ৯৯৯ যেকোনো বিপদে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস বা অ্যাম্বুলেন্স সেবার জন্য।
  • নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ হেল্পলাইন: ১০৯ নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগের জন্য।
  • সরকারি আইন সহায়তা: ১৬৪৩০ আইনি পরামর্শ ও সহায়তার জন্য।

লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপি প্র‍্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার বিডি