দূর থেকে দেখলে মনে হবে ছোট্ট একটি কারখানায় কাঠের কাজ চলছে। একটু কাছে গেলে চোখে পড়ে ভিন্ন দৃশ্য। কোথাও বাবলা কাঠের কাঠামো তৈরি হচ্ছে, কোথাও সেই কাঠামোর সঙ্গে টিস্যু দড়ি বুনে দেওয়া হচ্ছে। কেউ ব্যস্ত খাট তৈরিতে, কেউ টুল আবার কেউ তৈরি করছেন দোলনা, ছোটদের পড়ার টেবিল-চেয়ার কিংবা সোফা। কারও হাতে কাঠ, কারও হাতে দড়ি—সব মিলিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে ব্যস্ততা। দড়ির খাটের হারিয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন আঞ্জুয়ারা খাতুন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ পৌরসভার বাগানটুলি এলাকায় তিনি তৈরি করেছেন ‘আয়েশি’ নামে একটি কারখানা।
একসময় ঢাকার একটি আইটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন আঞ্জুয়ারা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ এবং এমবিএ শেষ করে ক্যারিয়ার গড়েছিলেন ঢাকায়। বিয়ের পর চাঁপাইনবাবগঞ্জে আসায় চাকরির সেই জীবন থেমে যায়। কিন্তু থেমে থাকেননি তিনি। সংসারের পাশাপাশি নিজের জন্য কিছু করার তাগিদ থেকে শুরু করেন অনলাইনে আমের ব্যবসা। সেটি মৌসুমি ব্যবসা হওয়ায় বছরের বেশির ভাগ সময় কাজ করা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই সারা বছর চালানোর মতো একটি ব্যবসার কথা ভাবছিলেন আঞ্জুয়ারা। সেই ভাবনা থেকে একটি সাধারণ টুল বা মাচা হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের মোড় ঘোরানো পণ্য। আজ সেই ছোট্ট শুরু পেরিয়ে আঞ্জুয়ারা তৈরি করছেন প্রায় ৫০ ধরনের হস্তশিল্প। অনলাইনে ও সরাসরি অর্ডার নিয়ে এসব পণ্য বিক্রি করছেন দেশের বিভিন্ন এলাকার ক্রেতাদের কাছে। মাসে আয় হচ্ছে প্রায় তিন লাখ টাকা। করেছেন নারী-পুরুষসহ ২০ জনের কাজের সংস্থান।
আঞ্জুয়ারা খাতুনের উদ্যোক্তা জীবনের শুরু ২০১৮ সালে, আম বিক্রির মাধ্যমে। তবে তাঁর জীবনের গতি বদলে দেয় একটি টুল। ফেসবুকে সেই টুলের ছবি দেওয়ার পর অনেকে এমন পণ্য কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সেই আগ্রহ তাঁকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। আঞ্জুয়ারার স্বামী শাহী আল আমিন শাহিন মনাকষার কারিগরদের কাছে সেই টুল তৈরি শিখে এসে স্ত্রীকে শেখান। এভাবেই শুরু হয় তাঁদের হাতে-কলমে শেখার পর্ব।
শুরুতে অর্ডার ছিল খুব কম। মাত্র ২ হাজার টাকার একটি মাচা বা টুল তৈরির অর্ডার পান তিনি। এরপর আসে ৫ হাজার টাকার একটি খাটের অর্ডার। একটির পর একটি অর্ডার আসতে থাকায় বাড়তে থাকে তাঁর আত্মবিশ্বাস। এরপর ধীরে ধীরে আঞ্জুয়ারার কারখানায় বানানো শুরু হয় দড়ির খাট, মিনি খাট, দোলনা, ডাইনিং চেয়ার, পড়ার টেবিল ও চেয়ার, ছোট চেয়ার, সোফাসহ প্রায় ৫০ ধরনের জিনিস। কোনো পণ্যের আকার ছোট, কোনোটি বড়। কোনোটি ঘরের জন্য, কোনোটি বারান্দা বা ছাদে ব্যবহারের জন্য।
আঞ্জুয়ারা জানান, তাঁর তৈরি আসবাবের দাম সেগুলোর আকারের মতো বৈচিত্র্যময়। ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ১৫-১৬ হাজার টাকা দামের পণ্য রয়েছে। অর্ডারের ধরন, আকার ও নকশার ওপর ভিত্তি করে দাম নির্ধারণ করা হয়।
আঞ্জুয়ারার ব্যবসার বড় একটি অংশ পরিচালিত হয় অনলাইনে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পণ্যের ছবি ও ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছান তিনি। সেখান থেকে অনেক অর্ডার আসে। পাশাপাশি সরাসরি যোগাযোগ করেও অনেকে পণ্য কিনছেন। ফলে তাঁর ব্যবসায় অনলাইন ও অফলাইন—দুই ধরনের বাজার তৈরি হয়েছে।
বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আঞ্জুয়ারার পণ্যের ক্রেতা। তিনি জানান, বিভিন্ন শ্রেণির ক্রেতা তাঁর তৈরি পণ্য কেনেন। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন হোটেল, রেস্টুরেন্টসহ নানা জায়গা থেকে অর্ডার আসে। সচিবসহ বিভিন্ন ভিআইপি ক্রেতাও আমার তৈরি পণ্য নিয়েছেন।’
তবে এখানেই থেমে থাকতে চান না আঞ্জুয়ারা। আরও নতুন ডিজাইনের আসবাব তৈরি, অনলাইনে বাজার সম্প্রসারণ এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। তাঁর স্বামী শাহী আল আমিন শাহিন বলেন, ‘সরকারের সহযোগিতা পেলে দেশ পেরিয়ে বিদেশে আমাদের উৎপাদিত পণ্যগুলো রপ্তানি করতে পারব।’
আঞ্জুয়ারার মতে, উদ্যোক্তা হতে শুরুতে বড় কিছু করার প্রয়োজন নেই। ছোট পরিসরে শুরু করে কাজের মান ভালো রাখলে ধীরে ধীরে ক্রেতার আস্থা তৈরি করা সম্ভব।