মাদ্রাসায় পড়তে গিয়ে এক শিক্ষকের কাছে যৌন নির্যাতনের শিকার হয় ১১ বছরের এক শিশু। ভয়ে কয়েক মাস কাউকে কিছু বলেনি সে। শারীরিক পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান তার মা। পরীক্ষায় জানা যায়, শিশুটি প্রায় সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। চিকিৎসকের জিজ্ঞাসায় শিশুটি কাঁপতে কাঁপতে শুধু বলে, ‘হুজুর’। পরে শিশুটির মা ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করেন।
নেত্রকোনার মদনের এই ঘটনায় শিশুটির জন্ম দেওয়া নবজাতকের সঙ্গে অভিযুক্ত শিক্ষকের ডিএনএ পরীক্ষায় মিল পেয়েছে পুলিশ। একটি শিশুর শৈশব, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল যে শিক্ষকের ওপর, তিনিই শিশুটিকে যৌন নিপীড়ন করেছেন বলে প্রমাণ মেলে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য বলছে, গত আগস্টে সারা দেশে ধর্ষণের শিকার ৫৪ জনের মধ্যে ৩৬ জনই ছিল কন্যাশিশু। অর্থাৎ যাদের বয়স ১৮ বছরের কম। সে হিসেবে ধর্ষণের শিকার প্রতি তিনজনের দুজনই কন্যাশিশু। একই মাসে ১১ কন্যাশিশুসহ ১৪ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। আট কন্যাশিশুসহ ১৩ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে একজন কন্যাশিশুসহ দুজনকে।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত দেশে অন্তত ২৩৬ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে ৫৭ জনের বয়স ছিল ৬ বছরের কম। ৬ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে ৫টি শিশু দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ধর্ষণের শিকার ১০১ জনের বয়স ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে, যার মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৭টি। ৭৮ জনের বয়স ১৩-১৮ বছর, তাদের মধ্যে ২৪ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার।
মহিলা পরিষদের হিসাব অনুযায়ী, আগস্ট মাসে নির্যাতনের শিকার ২৫২ জনের মধ্যে ১১৮ জন কন্যাশিশু। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২৩৮ শিশু ও কিশোরীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। সংগঠনগুলো মূলত গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে পরিসংখ্যান তৈরি করে। অনেক ঘটনার সংবাদ প্রকাশ না হওয়ায় তা হিসাবের বাইরে থেকে যায়।
জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সভাপতি বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘দেশে প্রকৃতপক্ষে ধর্ষণের যত ঘটনা ঘটে, তার খুব কম ঘটনাই প্রকাশ্যে আসে। ভয়ে, লজ্জায় অনেকেই এগুলো প্রকাশ করতে চায় না। কন্যাশিশুদের ক্ষেত্রে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ হলো, কিশোর গ্যাং বিভিন্ন জায়গায় উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করছে। গ্রামগঞ্জে অনেক জায়গাতেই হুমকি, নিপীড়নের ঘটনা শুনতে পাচ্ছি।’
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরের প্রথম সাত মাসের তুলনায় চলতি বছর একই সময়ে শিশু ধর্ষণের মামলার সংখ্যা বেশি। গত জানুয়ারি-জুলাই পর্যন্ত শিশু ধর্ষণের ১ হাজার ৪৮৫টি মামলা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে মামলার সংখ্যা ছিল ৯৯৮টি। আর ২০২৪ সালের প্রথম সাত মাসে মামলা হয়েছিল ৭৫১টি। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে গত বছরের একই সময়ের থেকে ৪৯ শতাংশ এবং ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ৯৮ শতাংশ মামলা বেড়েছে।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘শিশুরাই সব’-এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বলেন, শিশুরা তাদের সঙ্গে কোনো যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটলে কার কাছে বলবে, কীভাবে বলবে, সেসব বুঝতে পারে না। তারা বিষয়গুলো ঠিকভাবে জানেও না। ফলে ঘটনা প্রকাশ পেতে দেরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে গোপনই থেকে যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিচিতরাই তাদের লক্ষ্যবস্তু বানায়।
কন্যাশিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা কমাতে অপরাধের পর মামলা ও বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবারে শিশুর সঙ্গে নিরাপদ যোগাযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, শিক্ষক ও কর্মীদের জবাবদিহি, শিশুবান্ধব চিকিৎসাসেবা এবং নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়ামাত্র শিশুকে নিরাপদ পরিবেশে নেওয়ার ব্যবস্থা কার্যকর করার পরামর্শ দেন লায়লা।
আজ জাতীয় কন্যা শিশু দিবস। ‘শিশু বিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়’ প্রতিপাদ্যে এবার দিবসটি পালন করা হবে। আগামী ১২ অক্টোবর সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন দিবসটি পালন করবে।