হোম > নারী

গাজার তাঁবুতে অন্তঃসত্ত্বা নারীর বেঁচে থাকার লড়াই

জগৎপতি বর্মা, ঢাকা

ছবি: সংগৃহীত

তাঁবুর পাশের পলিথিনের একটি পর্দা বা ফ্ল্যাপ সরালেই খোলা বাতাস ও আলো আসে। চারপাশে যত দূর চোখ যায়, সবকিছু ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। পুরো এলাকা যেন ভেঙে পড়া কংক্রিট আর দুমড়েমুচড়ে যাওয়া স্টিলের এক বিশাল স্তূপ। এটি গাজা!

গাজা যুদ্ধের চার বছর হতে চলেছে। এই সময়ে গাজা উপত্যকার অনেক কিছুই ধ্বংস হয়ে গেছে। একসময় যে জায়গায় ছিল দোতলা বাড়ি, আজ সেখানে ধ্বংসস্তূপের ওপর টাঙানো একটি ছোট্ট তাঁবু। এটিই বর্তমানে আলা হেসির ঠিকানা। এই বাড়িতেই ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হয়েছিল তাঁর তিন সন্তান—১০ বছরের ওয়াসিম, ৭ বছরের মোহান্নাদ আর ৫ বছরের খাওলা। আর মাত্র এক মাস পর আলা আবার মা হবেন। কিন্তু নতুন সন্তানের অপেক্ষার আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে আতঙ্ক। তিনি আবারও কি সন্তান হারাবেন?

ধীরে ধীরে কাঠের অস্থায়ী সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠেন আলা। প্রতিটি পদেই সিঁড়ি কেঁপে ওঠে। আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা শরীর নিয়ে তিনি সাবধানে হাতল ধরে এগিয়ে যান ওপরে; যেখানে একসময় তাঁর সাজানো-গোছানো ঘর ছিল, সেখানে এখন শুধু একটি তাঁবু।

আলা বলেন, এই জায়গার প্রতিটি ইট তাঁকে তাঁর সন্তানদের কথা মনে করিয়ে দেয়। এখানেই তিনি তাদের বড় করেছেন, রান্না করেছেন, পড়িয়েছেন, খেলেছেন। আর এখানেই তারা প্রাণ হারিয়েছে।

প্রতিদিন সকালে আলার ঘুম ভাঙে তাঁবুর ভেতর মাছির ভনভন শব্দ এবং প্রতিবেশীদের কোলাহলে।

তাঁবুতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা নিরাপত্তা বলতে কিছু নেই। এখানে সবাই সবার কথা শুনতে পায়। এমনকি মানুষের শৌচাগারে যাওয়া কিংবা শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দও স্পষ্ট শোনা যায়। আলা বলেন, আমার তাঁবুর জানালাটি সরাসরি ইয়েলো লাইনের দিকে। এখান থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক অবস্থান পরিষ্কার দেখা যায় এবং তারা মাঝে মাঝে আমাদের দিকে গুলিও চালায়।

ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞার কারণে রান্নার গ্যাস দুর্লভ, ফলে রান্নাবান্না ও চা করার জন্য তাঁদের এখন কাঠের আগুনের ওপরই নির্ভর করতে হয়। সেই কাঠ জোগাড় করা এবং আগুন জ্বালানোতেই তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন। আলা বলেন, ‘যেখানে চিকিৎসা দেওয়া হয়, সেটাও আসলে একটি তাঁবু। কোনো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল নয়।’

ক্লিনিকে গিয়ে নার্সদের কাছে নিজের দুরবস্থা বা সন্তান হারানোর গল্প বলতে পারেন না আলা। স্বাস্থ্যকর্মীরাও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও ক্লান্ত। সান্ত্বনা বা মানসিক সমর্থন দেওয়ার মতো অবস্থা তাঁদের নেই। কারণ, এখানকার অধিকাংশ নারীই তাঁদের সন্তান হারিয়েছেন।

চিকিৎসকেরা তাঁকে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু যুদ্ধের কারণে খাবারের অভাব এতটাই তীব্র যে সেই পরামর্শ মানা প্রায় অসম্ভব। তাঁর স্বামী অল্প কিছু ফল ও সবজি কিনে আনেন। সেগুলো নিজে না খেয়ে স্ত্রীর হাতেই তুলে দেন। আলা বলেন, ‘ও নিজে খায় না, যাতে আমি খেতে পারি।’

গর্ভধারণের খবর জানার দিনটির কথা মনে পড়ে আলার। বলেন, ‘যখন আবার গর্ভবতী প্রথম জানতে পারি, তখন আমার মধ্যে দুটি বিপরীত অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল। একদিকে নতুন সন্তান আসার আনন্দে আমি সুখী ছিলাম, অন্যদিকে ওয়াসিম, মোহান্নাদ ও খাওলার কথা মনে করে অবিরাম কেঁদেছি। সবকিছুতে তাদের স্মৃতি ভেসে ওঠে। গর্ভাবস্থায় যখন বিশেষ কোনো খাবার খেতে ইচ্ছা করে, তখন বড় ছেলে ওয়াসিমের কথা মনে পড়ে। কারণ, ওয়াসিম যখন আমার পেটে ছিল, তখন ওই খাবারগুলো খুব ভালোবাসতাম।’

এই প্রতিবেদন তৈরির কিছুদিন পর আলা একটি সুস্থ পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। মৃত বড় ছেলের নামানুসারে তিনি নতুন সন্তানের নাম রেখেছেন ‘ওয়াসিম’।

দুপুরবেলা আবারও সেই ঝুঁকিপূর্ণ সিঁড়ি বেয়ে আলা ওপরে ওঠেন। নীল রঙের একটি ব্যাকপ্যাক টেনে নিয়ে যান তাঁবুতে। সেটার ভেতর তাঁর নিহত সন্তানদের কিছু জামাকাপড় রাখা আছে। নতুন সন্তান হয়তো কোনো একদিন পরবে, সেই আশায় এগুলো তিনি রেখে দিয়েছেন। বোমার আঘাতে পোশাকগুলোর বেশির ভাগই ছিঁড়ে গেছে, কোনোটা সামান্য পুড়ে গেছে। তবে এখনো পরার উপযোগী। তিনি যত্ন করে স্নোই কার্টুন আঁকা একটি টি-শার্ট এবং একটি টুপি খুলে মেলে ধরেন। ভেতর থেকে বের করেন আয়ারল্যান্ডের কর্ক শহরের ছোট ফুটবল ক্লাব ক্যাসলভিউ এএফসির একটি স্কার্ফ। এই স্কার্ফ তাঁর ছেলে ওয়াসিমের প্রিয় ছিল। আলা বলেন, গ্রীষ্মকালেও ও এটা পরে থাকত। আমি বলতাম, ওয়াসিম, অনেক গরম, এটা খুলে ফেলো! সে বলত, ‘না, এটা আমার খুব পছন্দের।’

বিকেলটা ভাইয়ের সঙ্গে গল্প করে কাটান আলা। তিনি বলেন, ‘আমার ভাই একটি কাঠের বাক্স বানানোর কথা বলেছে। কিন্তু আমাদের চিন্তা হলো ইঁদুর। চারপাশে ইঁদুরের এত উপদ্রব! প্রতিদিন তাঁবুর ভেতরে ইঁদুর ঢুকে পড়ে। ইঁদুর ঢোকার একটা ফুটো আমি সেলাই করে বন্ধ করেছিলাম; অন্যদিকে কেটে নতুন পথ বানিয়ে নিয়েছে।’

আলার বড় দুশ্চিন্তা হলো, তাঁর অনাগত সন্তানকে কোথায় শোয়াবেন। তিনি একটি ছোট্ট দোলনা কিনতে চান। কিন্তু গাজায় এখন দোলনা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। আর তাঁবুর ভেতরেও জায়গার সংকট। তিনি বলেন, ‘আমি এমন একটি নিরাপদ জায়গা চাই, যেখানে ইঁদুর আমার শিশুর কাছে পৌঁছাতে পারবে না।’

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার মুখে আলা তাঁর পুরোনো স্মার্টফোনে হারানো সন্তানদের ছবিগুলো স্ক্রল করে করে দেখেন। গাজার আর দশটি ফোনের মতো আলার ফোনটিও পুরোনো। ফাটা স্ক্রিন। দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থাকার পর বর্তমানে নতুন স্মার্টফোন বাজারে এলেও তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা কেনার সামর্থ্য বেশির ভাগ পরিবারের নেই। ফোনের ছোট স্পিকার থেকে স্পষ্ট ভেসে আসে বাচ্চাদের খুনসুটি ভরা কণ্ঠ।

আলার চোখ ছলছল করছিল। তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো ভয় আমাকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলে। এখানে আমার সন্তানদের হারিয়েছি। অনাগত সন্তানকে হারানোর ভয়ে আমি শিউরে উঠি। আমি শুধু প্রার্থনা করি, আমার নতুন সন্তান যেন একটি ভালো জীবন পায় এবং সে যেন সুরক্ষিত ও নিরাপদে থাকে।’ গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত