কিছু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এমন থাকে, যা একবার শুনলে আর কখনোই ভোলা যায় না। এটিও ঠিক তেমনই একটি। পিয়ার রিভিউড একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, নারীদের ত্যাগ করা বায়ু বা পাদের গন্ধ পুরুষদের তুলনায় বেশি দুর্গন্ধযুক্ত হয়। আওয়াজ বেশি বা বারবার হওয়ার কথা বলা হচ্ছে না, শুধু গন্ধটা...তুলনামূলক বেশি তীব্র। শুনলে একটু অদ্ভুত লাগলেও বিজ্ঞান কিন্তু নিজস্ব গবেষণার ভিত্তিতেই এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
মানুষ গড়ে দিনে ২৩ বার পর্যন্ত গ্যাস ত্যাগ করে। তাই ১৯৯৮ সালে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ড. মাইকেল লেভিট—যাঁকে আদর করে ‘পাদের রাজা’ (King of Farts) বলা হয়—গবেষণা শুরু করেন যে কেন কিছু পাদে গন্ধের মাত্রা এত তীব্র হয়। গাট (Gut) সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণার জন্য ১৬ জন সুস্থ স্বেচ্ছাসেবককে যুক্ত করা হয় এবং তাদের মলাশয়ে একটি নল ও ব্যাগযুক্ত বিশেষ ‘গ্যাস সংগ্রহের ব্যবস্থা’ স্থাপন করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের পিন্টো শিম বা শিমজাতীয় খাবার খাওয়ানো হয়, সঙ্গে দেওয়া হয় জোলাপ বা পেট পরিষ্কার করার ওষুধ। বাকিটা প্রকৃতির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়।
ড. লেভিট ও তাঁর সহকর্মীরা গ্যাস ক্রোম্যাটোগ্রাফি এবং মাস স্পেক্ট্রোমেট্রি ব্যবহার করে প্রতিটি নমুনার বিশ্লেষণ করেন। এরপর তাঁরা আরও এক ধাপ এগিয়ে যান। তারা দুজন বিচারককে নিয়ে আসেন প্রতিটি গ্যাসের গন্ধ শুঁকে ১ থেকে ৮ মাত্রার স্কেলে রেটিং দেওয়ার জন্য। সেই বিচারকেরা কিন্তু জানতেন না তাঁরা কিসের গন্ধ শুঁকছেন! সেই কাজের অভিজ্ঞতা যে কেমন ছিল, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
গবেষণার ফলাফল ছিল একদম স্পষ্ট। পুরুষরা বেশি পরিমাণে গ্যাস তৈরি করেছিল, কিন্তু নারীদের গ্যাসে হাইড্রোজেন সালফাইডের মাত্রা ছিল অনেক বেশি। এই হাইড্রোজেন সালফাইডই পচা ডিমের মতো তীব্র দুর্গন্ধের জন্য দায়ী। বিচারকেরাও এর সঙ্গে একমত হন এবং ধারাবাহিকভাবে নারীদের গ্যাসের গন্ধকে বেশি তীব্র হিসেবে রেটিং দেন। বিজ্ঞান তাঁর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছিল এবং উপসংহারটি ছিল অস্বীকার করার উপায়হীন।
সামাজিকভাবেও এই বিষয়টি অন্যান্য গবেষণার সঙ্গে মিলে যায়। ২০০৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিষমকামী (heterosexual) পুরুষরা নিজেদের গ্যাসের শব্দ বা গন্ধ নিয়ে সবচেয়ে কম চিন্তিত থাকেন, অন্যদিকে বিষমকামী নারীরা এই বিষয়ে সবচেয়ে বেশি সংকোচ বোধ করেন। এই জৈবরাসায়নিক বিষয়টি তাই আরও মজার রূপ নেয়—যে বিষয়টি নিয়ে নারীরা সাধারণত বেশি বিব্রত বোধ করেন, সেটিই হয়তো তাঁদের একটি বিশেষ উপকার করছে!
হাইড্রোজেন সালফাইড অতিরিক্ত পরিমাণে বিষাক্ত হলেও শরীরের ভেতরে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সালফহাইড্রেশন নামক একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এটি মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করতে সাহায্য করে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শরীরে এর মাত্রা কমতে থাকে এবং আলঝেইমার্সে আক্রান্ত রোগীদের শরীরে এর পরিমাণ থাকে খুবই কম।
এর আগে, ২০২১ সালে জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় মানুষের আলঝেইমার্স বৈশিষ্ট্যের মতো জীনগত পরিবর্তন করা ইঁদুরের ওপর একটি পরীক্ষা চালানো হয়। সেখানে দেখা যায়, হাইড্রোজেন সালফাইড নিসৃত করে এমন একটি উপাদান ১২ সপ্তাহের মধ্যে ইঁদুরগুলোর স্মৃতিশক্তি ও পেশির কর্মক্ষমতা প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে।
গবেষকেরা অবশ্য এখনই নিশ্চিত করে বলছেন না যে মানুষের ক্ষেত্রেও এটি হুবহু একই কাজ করবে, তবে বিষয়টির ইঙ্গিত কিন্তু চমৎকার। অপেক্ষাকৃত বেশি দুর্গন্ধযুক্ত পাদে উচ্চ মাত্রার হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি থাকতে পারে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের সুস্থ বার্তা আদান-প্রদানের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তাই পরের বার কোনো নারী যদি চোখ দিয়ে পানি আসার মতো তীব্র গন্ধযুক্ত গ্যাস ত্যাগ করেন, তবে মনে রাখবেন—আপনি হয়তো তাঁর মস্তিষ্কের সেরা রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়ার সাক্ষী হচ্ছেন!
তথ্যসূত্র: ভাইস