বাড়িতে বসে কাজ করার অনুমতি নিয়েছিলেন কোম্পানি থেকে। কিন্তু দেখা গেল বাড়ি তো নয়, তিনি রীতিমতো দেশই ছেড়ে গিয়েছেন। এমন ঘটনা ঘটেছে অস্ট্রেলিয়ায়।
সিডনির এক মুদ্রা ব্যবসায়ী ‘হোম অফিস’ নিয়ে সিঙ্গাপুর ভ্রমণে চলে যান। এ সময় তাঁর কাজের ল্যাপটপের অবস্থান শনাক্ত করে বিষয়টি জানতে পারে প্রতিষ্ঠানটি। পরে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়। দ্য স্ট্রেইটস টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
চার্লস গ্রাহাম নামের ওই ব্যক্তি এইচআইএফএক্স অস্ট্রেলিয়ায় কর্মরত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি ‘এক্সই’ নামে ব্যবসা পরিচালনা করে। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর তাঁর সিডনিতে নিজের বাড়িতে বসে কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু তাঁর কাজের ল্যাপটপের অবস্থান সিঙ্গাপুরের একটি হোটেলে শনাক্ত হওয়ার পর একই বছরের ২ ডিসেম্বর তাঁকে চাকরিচ্যুত করে প্রতিষ্ঠানটি।
দ্য স্ট্রেইটস টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর আগেও ‘দূর থেকে কাজ’ করার নিয়মের সীমা লঙ্ঘন করেছিলেন গ্রাহাম নামের ওই ব্যক্তি। হোম অফিসের কথা বলে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে চলে গেছিলেন তিনি। তখন ব্যবস্থাপককে জানিয়েছিলেন, বাথরুমের সমস্যার সমাধানে একজন প্লাম্বারের জন্য বাড়িতে অপেক্ষা করছেন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এক বছরের জন্য সিঙ্গাপুর থেকে কাজ করার অনুমতি চেয়েছিলেন গ্রাহাম। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। তাদের যুক্তি ছিল, তাঁর কর্মস্থল সিডনিতে এবং সিঙ্গাপুরে ব্যবসা পরিচালনার লাইসেন্স তাদের নেই।
এরপর চোখে আঘাত পাওয়ার কথা জানিয়ে কয়েক সপ্তাহ বাড়ি থেকে কাজ করেন গ্রাহাম। পরে বার্ষিক ছুটিতে যান তিনি। ছুটি শেষে তাঁর কাজে ফেরার সময় হলে ব্যবস্থাপক তাঁর অবস্থান যাচাই করতে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগকে যোগাযোগ করেন।
৭ অক্টোবর গ্রাহামের অন্যায্যভাবে চাকরিচ্যুতির অভিযোগসংক্রান্ত মামলার রায় দেন অস্ট্রেলিয়ার ফেয়ার ওয়ার্ক কমিশন। কমিশন দেখতে পায়, গ্রাহাম মিথ্যা বলেছিলেন এবং তাঁকে চাকরিচ্যুত করার যথার্থ কারণ প্রতিষ্ঠানের কাছে ছিল। তবে চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। এ কারণে তাঁকে চার সপ্তাহের বকেয়া বেতন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
গ্রাহামের ব্যবস্থাপক এক ই-মেইলে লিখেছিলেন, ‘আমাদের লোকটির আজ অনলাইনে থাকার কথা, ছুটির পর আজই তার প্রথম কর্মদিবস। তাই তোমার এফবিআইয়ের মতো তদন্ত করার দক্ষতা লাগবে।’
তদন্তে দেখা যায়, গ্রাহামের সিডনিতে বাড়িতে বসে কাজ করার কথা থাকলেও তিনি আসলে সিঙ্গাপুরে ছিলেন।
নিজের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে গ্রাহাম বলেন, ছুটিতে থাকাকালে তাঁর সঙ্গী ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এ কারণে তাঁদের অস্ট্রেলিয়ায় ফেরার পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে হয়।
তিনি বলেন, বিষয়টি ব্যবস্থাপককে জানানোর ইচ্ছা ছিল তাঁর। কিন্তু অপঠিত ই-মেইল, আসা ফোনকল এবং একজন গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহকের অভিযোগ সামলাতে গিয়ে তিনি এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে বিষয়টি জানানো হয়নি।
এক্সই এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, গ্রাহাম যে নথিপত্র দিয়েছিলেন, তা দিয়ে তাঁর সঙ্গীর ভ্রমণে অক্ষমতার বিষয়টি যথাযথভাবে প্রমাণিত হয়নি। একই সঙ্গে তিনি কেন নিজের অবস্থান গোপন করেছিলেন, তারও ব্যাখ্যা মেলেনি।
সপ্তাহে বাধ্যতামূলকভাবে তিন দিন অফিসে উপস্থিত থাকার নিয়ম চালুর পর গ্রাহামের দেরিতে কাজে আসার কয়েকটি ঘটনার কথাও তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানটি। ওই সময় তিনি কখনো অসুস্থতা, কখনো বাড়ির কাজের কারণে দেরি হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
ফেয়ার ওয়ার্ক কমিশনের কমিশনার ম্যাথেসন বলেন, নিজের অবস্থান গোপন রাখার মধ্য দিয়ে গ্রাহাম বুঝিয়ে দিয়েছেন, বিদেশ থেকে কাজ করতে হলে তাঁর অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন—এ বিষয়টি তিনি জানতেন।
সিঙ্গাপুরে অবস্থানের কথা না জানানোর ঘটনাকে তিনি ইচ্ছাকৃত অসততা হিসেবে বর্ণনা করেন।
ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ডেইলি মেইলও। পত্রিকাটির কিছু পাঠকও গ্রাহামের প্রতি সহানুভূতি দেখাননি। একজন পাঠক লিখেছেন, ‘কাউকে সামান্য সুযোগ দিলে কেউ কেউ তার চেয়ে অনেক বেশি নিয়ে নেয়।’
তবে অন্য পাঠকেরা মনে করেন, কর্মীরা কোথা থেকে কাজ করছেন, তার চেয়ে তাঁদের কাজের ফলাফল মূল্যায়ন করা নিয়োগকর্তাদের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যেসব কাজ দূর থেকে করা সম্ভব, সেসব ক্ষেত্রে কর্মস্থলে উপস্থিতির ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়।
একজন পাঠক মন্তব্য করেন, ‘কাজ ঠিকমতো হলেই হলো, সে কোথা থেকে কাজ করছে, তাতে কার কী?’
তবে গ্রাহামকে চাকরিচ্যুত করার প্রক্রিয়ায় এক্সইয়েরও কিছু ত্রুটি ছিল বলে কমিশন মনে করে।
প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ বার্তায় ‘কৌশল’ নির্ধারণের কথা বলা হয়েছিল। পাশাপাশি গ্রাহামকে বৈঠকে উপস্থিত হতে ‘কিছুটা আশা দেখানোর’ কথাও ছিল। এসব বার্তা থেকে ধারণা পাওয়া যায়, তাঁর বক্তব্য যথাযথভাবে বিবেচনা করার আগেই চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
তা সত্ত্বেও কমিশনার ম্যাথেসন মনে করেন, গ্রাহামকে পুনর্বহাল করা যথাযথ হবে না। তাঁকে কোনো ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়নি। কমিশনারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চাকরিচ্যুতির প্রক্রিয়া ন্যায্য হলেও গ্রাহামের চাকরি রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা কম ছিল।
তবে নোটিশের পরিবর্তে চার সপ্তাহের বেতন পাওয়ার অধিকারী ছিলেন গ্রাহাম। শেষ পর্যন্ত তাঁকে সেই অর্থই দেওয়া হয়।