কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ও এর সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগের মুখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীরা একটি স্বেচ্ছাধীন চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। ‘জয়েস কমেন্টমেন্ট অন ফ্রন্টিয়ার রেসপন্সিবিলিটিজ’ নামের এই চুক্তির মাধ্যমে এআই প্রযুক্তির নিরাপত্তা ও তদারকি জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) হোয়াইট হাউসে শীর্ষ প্রযুক্তি নেতাদের নিয়ে আয়োজিত এক মধ্যাহ্নভোজ সভায় ট্রাম্প এই চুক্তির ঘোষণা দেন। অনুষ্ঠানে প্রযুক্তি খাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণের প্রতি তার প্রশাসনের অনাস্থা পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
ট্রাম্প বলেন, ‘পণ্য বা প্রযুক্তির স্ব-নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়া উচিত বলে মনে করা হয়। তা ছাড়াও বিচার বিভাগ ও এফবিআইয়ের মতো সরকারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে আমাদের নিজস্ব তদারকি তো এমনিতেই রয়েছে।’
সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে বিশ্বের ছয়টি শীর্ষস্থানীয় এআই ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। এতে স্বাক্ষর করেন অ্যানথ্রোপিকের দারিও আমোদেই, ওপেনএআই-এর গ্রেগ ব্রকম্যান, গুগলের সুন্দর পিচাই, মেটার মার্ক জাকারবার্গ, এক্সএআই-এর ইলন মাস্ক, এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং।
এই চুক্তির অধীনে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের এআই মডেল তদারকিতে অভ্যন্তরীণ দল গঠন এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ছাড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাইয়ে তারা স্বতন্ত্র বা স্বাধীন বহিরাগত নিরীক্ষকদের সঙ্গে কাজ করতে এবং নিয়মিত বৈঠক করে নিরাপত্তার নতুন মানদণ্ড নির্ধারণে সম্মত হয়েছে।
যদিও চুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক আইনগত শর্ত রাখা হয়নি, তবে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে এটিকে আইন বা আনুষ্ঠানিক নীতিমালায় রূপ দেওয়া ‘যৌক্তিক হতে পারে’ বলে উল্লেখ করা হয়।
সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এআই নিয়ন্ত্রণে একটি বিশ্বব্যাপী তদারকি সংস্থা গঠনের আহ্বান উঠে এসেছে। প্রায় ২০টি দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এআই প্রযুক্তিকে মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সমন্বিত বৈশ্বিক পদক্ষেপের পক্ষে মত দিয়েছে।
তবে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির উদ্যোগকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। জাতিসংঘে তিনি স্পষ্ট জানান, বৈশ্বিক কোনো কাঠামোর মাধ্যমে মার্কিন প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হলে তাঁর প্রশাসন সেটির বিরোধিতা করবে। চীনের সঙ্গে এআই প্রতিযোগিতায় আধিপত্য বজায় রাখাকে অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়ন ধীরগতির করার প্রস্তাবও তিনি নাকচ করে দেন।
নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে গত সোমবারই ওপেনএআই ঘোষণা করেছে, তাদের নতুন এআই মডেল পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিরাপত্তা ত্রুটি ধরা পড়ায় সেটি আপাতত বাজারে ছাড়া হচ্ছে না। একই সঙ্গে অস্ট্রেলীয় সরকারের ওয়েবসাইট ও স্বাস্থ্যসেবা ডেটাবেইসে অননুমোদিত প্রবেশের ঘটনার জন্য সংস্থাটি প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছে।
হোয়াইট হাউসের এই সমঝোতা চুক্তি নিয়ে বিভিন্ন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
সিলিকন ভ্যালির বিনিয়োগকারী এবং ট্রাম্পের সাবেক এআই বিষয়ক উপদেষ্টা ডেভিড স্যাক্স এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লেখেন, আন্তর্জাতিক চুক্তির চেয়ে এটি অনেক বেশি কার্যকর পদক্ষেপ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকানদের স্বার্থ রক্ষা করে মার্কিন প্রযুক্তি নেতৃত্ব বজায় রাখছেন।
অন্যদিকে বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা চুক্তির মধ্যে কোনো বাধ্যবাধকতার বিষয় না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক আলভিন ওয়াং গ্রেলিন বলেন, ‘সবচেয়ে বড় ঝুঁকি চীনা এআই নয়, বরং অ-রাষ্ট্রীয় কোনো গোষ্ঠীর হাতে থাকা ছোট এআই মডেল, যা জৈব বা সাইবার হামলার কাজে ব্যবহার হতে পারে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের এক টেবিলে আনা ইতিবাচক, তবে মূল সমস্যা হলো এখানে কোনো স্বাধীন তদারকি বা আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।’
সিডনির ইউএনএসডব্লিউ এআই ইনস্টিটিউটের প্রধান টবি ওয়ালশ এই স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘ট্রিলিয়ন ডলারের কোনো শিল্প কি নিজের মূল্যায়ন নিজে করতে পারে? তারা আগেও নিজেদের ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। এআইয়ের কারণে কোনো ক্ষতি হলে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীদের সরাসরি জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।’