শহুরে জীবনে নীরবতা এখন সোনার হরিণ। বাসার বাইরে গাড়ির হর্ন, নির্মাণকাজের শব্দ, রাস্তায় মানুষের কোলাহল—সব মিলিয়ে দিনের ব্যস্ততা শেষ হওয়ার পরও শব্দ থেকে মুক্তি মেলে না। অথচ ঘুম, বিশ্রাম কিংবা মনোযোগ দিয়ে কাজ করার জন্য প্রয়োজন নীরবতা। পুরো শহর নীরব করা সম্ভব না হলেও প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে নিজের ঘরেই তৈরি করা যায় শান্ত পরিবেশ।
বাইরের বিরক্তিকর শব্দ কমানোর পরিচিত প্রযুক্তিগুলোর একটি হলো নয়েজ ক্যানসেলিং। অ্যাকটিভ নয়েজ ক্যানসেলেশন বা এএনসি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হেডফোন ও ইয়ারবাডে ছোট মাইক্রোফোন থাকে, যা আশপাশের শব্দ শনাক্ত করে। এরপর যন্ত্রটি সেই শব্দের বিপরীতধর্মী শব্দতরঙ্গ তৈরি করে। দুটি তরঙ্গ একে অপরের সঙ্গে মিশে বাইরের শব্দের তীব্রতা কমিয়ে দেয়। ফলে বাস, ট্রেন, বিমান কিংবা ব্যস্ত সড়কের একটানা গুঞ্জন কম শোনা যায়। তবে হঠাৎ তৈরি হওয়া তীব্র শব্দ বা মানুষের কথাবার্তার মতো অনিয়মিত শব্দ পুরোপুরি বন্ধ করা সব সময় সম্ভব হয় না।
ঘুম বা পড়াশোনার সময় পুরো ঘর সাউন্ডপ্রুফ করা সম্ভব না হলে নয়েজ ক্যানসেলিং হেডফোন বা ইয়ারবাড শব্দ কমানোর একটি উপায় হতে পারে। আবার অনেকে হোয়াইট নয়েজ বা পিংক নয়েজ ব্যবহার করেন। স্মার্টফোন, স্মার্ট স্পিকার কিংবা বিশেষ সাউন্ড মেশিনের মাধ্যমে এসব নিরবচ্ছিন্ন শব্দ চালানো যায়। এগুলো বাইরের হঠাৎ আসা শব্দ পুরোপুরি বন্ধ করে না; বরং একটি স্থির শব্দের আবরণ তৈরি করে বিরক্তিকর শব্দকে আড়ালে করতে সহায়ক।
ঘরে বাইরের শব্দ ঢোকার অন্যতম পথ জানালা। তাই শব্দ নিয়ন্ত্রণে জানালার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভালোভাবে সিল করা জানালা এবং ডাবল বা ট্রিপল-গ্লেজড কাচ বাইরের শব্দ প্রবেশের পথে বাধা তৈরি করতে পারে। জানালার চারপাশে ছোট ফাঁক থাকলেও সেখান দিয়ে শব্দ ঢুকতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী শব্দপ্রতিরোধী আবরণ বা সিলিং ব্যবহার করা যেতে পারে।
প্রযুক্তির পাশাপাশি ঘরের সাজসজ্জার কিছু উপাদান শব্দ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। মোটা পর্দা জানালার সামনে অতিরিক্ত একটি স্তর তৈরি করে। কার্পেট, রাগ, মোটা কাপড়ের সোফা ও নরম আসবাব ঘরের ভেতরের শব্দ শোষণে সাহায্য করে। শক্ত মেঝে বা খালি দেয়ালে শব্দ প্রতিফলিত হয়ে প্রতিধ্বনি তৈরি করতে পারে, নরম উপকরণ সেই প্রতিফলন কিছুটা কমিয়ে ঘর আরামদায়ক রাখায় সহায়ক।
শুধু জানালা নয়, দরজার নিচের ফাঁক দিয়েও শব্দ ঢুকতে পারে। দরজার নিচে ডোর সুইপ বা উপযুক্ত সিলিং ব্যবহার করলে এই পথ কিছুটা বন্ধ করা যায়। দেয়ালে পর্যাপ্ত আস্তরণ থাকলেও বাইরের শব্দ ঘরে প্রবেশের পরিমাণ কমতে পারে। বিশেষ করে শোয়ার ঘর বা কাজের জায়গা যদি রাস্তার দিকে হয়, এসব ব্যবস্থা বেশ কার্যকর।
নাম শুনে মনে হতে পারে, নয়েজ ক্যানসেলেশন চালু করলে চারপাশের সব শব্দ একেবারে উধাও হয়ে যাবে। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। এএনসি মূলত আশপাশের শব্দ শনাক্ত করে তার বিপরীত তরঙ্গ বা অ্যান্টি-নয়েজ তৈরি করে। এই দুই তরঙ্গ পরস্পরের সঙ্গে মিশে শব্দের তীব্রতা কমিয়ে দেয়। ফলে বাইরের শব্দ অনেকটাই মৃদু হয়ে আসে, কিন্তু সম্পূর্ণ নীরবতা তৈরি হয় না।
এএনসি ভালো কাজ করে একটানা ও নিচু কম্পাঙ্কের শব্দে। যেমন বিমান বা বাসের ইঞ্জিনের গুঞ্জন, ট্রাফিকের একটানা শব্দ কিংবা এসির আওয়াজ। এসব শব্দের ধরন স্থির হওয়ায় প্রযুক্তিটি সহজে তা শনাক্ত করে বিপরীত তরঙ্গ তৈরি করতে পারে। তবে মানুষের কথা, শিশুর কান্না, দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ, থালাবাসনের শব্দ বা হঠাৎ তৈরি হওয়া শব্দ পুরোপুরি কমানো কঠিন। উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দে এনসির কার্যকারিতা কম হতে পারে। তাই ভালো নয়েজ ক্যানসেলিং হেডফোনেও বাইরের কিছু শব্দ শোনা স্বাভাবিক।
এ কারণে আধুনিক এএনসি ডিভাইসে শুধু সক্রিয় নয়েজ ক্যানসেলিং নয়, কানের চারপাশে ভালোভাবে বসে থাকা ইয়ারকাপ বা ইয়ারটিপের প্যাসিভ নয়েজ আইসোলেশনও গুরুত্বপূর্ণ। দুটি পদ্ধতি একসঙ্গে কাজ করলেই বাইরের শব্দ আরও কার্যকরভাবে কমানো সম্ভব।
সূত্র: উইন্ডোওয়ার্ল্ড