তরুণেরা উদ্ভাবনী নানা ধারণা নিয়ে এলেও সেগুলো বাস্তবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহাবুব আনাম।
আজ শনিবার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বাংলাদেশ আইসিটি অ্যান্ড ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডস’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ আইসিটি অ্যান্ড ইনোভেশন নেটওয়ার্ক (বিন) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
ফকির মাহাবুব আনাম বলেন, ‘আমরা ইনোভেটিভ আইডিয়াগুলো দেখছি। কিন্তু এসবের বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ছেলেরা আইডিয়া নিয়ে আসছে, কিন্তু আমরা ইমপ্লিমেন্ট (বাস্তবায়ন) করতে পারছি না।’
তরুণদের উদ্ভাবনী ধারণায় অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে আইসিটিমন্ত্রী বলেন, স্টার্টআপ কোম্পানিগুলোর জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতায় উদ্ভাবনী উদ্যোগে অর্থায়নের জন্য একই ধরনের তহবিল নেই।
মন্ত্রী বলেন, ‘আজকে যে তরুণ ছেলেমেয়েরা এত সুন্দর উদ্ভাবনী ধারণা নিয়ে এসেছে, শুধু আইডিয়ার মধ্যে থাকলেই হবে না, বাস্তবায়নে যেতে হবে।’
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার ও এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও কথা বলেন আইসিটিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে এআই নিয়ে ব্যাপক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকতে পারে না।
ফকির মাহাবুব আনাম বলেন, ‘একদিকে আমরা এআই নিয়ে দৌড়াচ্ছি, অন্যদিকে আমাদের ভাবতে হবে—এই তরুণ ছেলেমেয়েরা চাকরি পাবে কি না। তা না হলে তাদের মধ্যে কী ধরনের হতাশা তৈরি হবে, সেটাও আমাদের ভাবতে হবে।’
অনুষ্ঠানে উদ্ভাবনকে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে চলতি বাজেটেই গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। তিনি বলেন, ‘এই বিষয় নিয়ে আমরা কথা বলেছি। আগামী বাজেটে না, এই বাজেটেই গবেষণায় আমাদের বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে চাই।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, উদ্ভাবনকে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে নিতে সরকার, ব্যবসা ও একাডেমিয়ার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করতে হবে। এ তিন পক্ষের সমন্বয়ে একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা জরুরি।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যদি সত্যি সত্যি এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হতে চাই কিংবা তার চেয়েও বড় অর্থনীতি হতে চাই, তাহলে এখনই ভাবতে হবে—এই উদ্ভাবন ও গবেষণাকে কীভাবে তার উপযোগী করে তোলা যায়।’
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচকে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ২৯ সেপ্টেম্বর বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচক প্রকাশ হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা দরকার। ১৩৯ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৫তম। অবকাঠামোর ক্ষেত্রে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও মানবসম্পদ ও ব্যবসায়িক সক্ষমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দেশ পিছিয়ে রয়েছে।
মানুষের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে প্রযুক্তিকে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এমদাদ উল বারী বলেন, নদীতে সারা রাত মাছ ধরার সময় একজন জেলে মোবাইলে নাটক বা ভিডিও দেখতে পারেন। কিন্তু তাঁর মূল প্রয়োজন এটি নয়। তাঁর প্রয়োজন সহজে ঋণ পাওয়া, কোথায় মাছের ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে তা জানা এবং মাছ পরিবহনের ব্যবস্থা। এসব সেবা আলাদা আলাদা খাতে থাকায় মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বিত সমাধান তৈরি হচ্ছে না। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আর্থিক সেবা—প্রতিটি খাতকে আলাদা করে পরিচালনা করার ফলে এক খাতের সঙ্গে অন্য খাতের সংযোগের জায়গায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
বিনের চেয়ারম্যান সৈয়দ আলমাস কবীর জানান, এবারের ‘বাংলাদেশ আইসিটি অ্যান্ড ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডস’-এ সারা দেশ থেকে প্রায় ৪৫০টি আইডিয়া জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে ৩৫৫টি এন্ট্রি চূড়ান্ত করা হয়। পরবর্তী বিচার প্রক্রিয়ায় সেখান থেকে ১১৮টি প্রকল্প বাছাই করা হয়। এসব প্রকল্পের বিচার করতে বিচারকেরা প্রায় ৪০ ঘণ্টা সময় দেন। যাচাই বাছাই শেষে ৪৪টি প্রকল্পকে পুরস্কার দেওয়া হয়।
আয়োজকেরা জানান, প্রতিযোগিতার মানদণ্ড তৈরি করা হয়েছে এশিয়া প্যাসিফিক আইসিটি অ্যালায়েন্সের (এপিক্টা) বার্ষিক প্রতিযোগিতার মানদণ্ড অনুসরণ করে। এবারের বিজয়ীরা আগামী ডিসেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় অনুষ্ঠেয় এপিক্টা অ্যাওয়ার্ডসে অংশ নিয়ে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করবেন।