আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) খাতের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের এআই মডেল ক্লদ ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএতে একটি নতুন ধরনের এনজাইম সিস্টেম আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই আবিষ্কারটি যুগান্তকারী জিন-এডিটিং প্রযুক্তি ‘ক্রিস্পার’ (CRISPR)-এর মতো কোনো জিন সম্পাদনা পদ্ধতি হতে পারে।
বুধবার অ্যানথ্রপিক জানায়, সান ফ্রান্সিসকোতে সম্প্রতি চালু করা তাদের বায়োলজি রিসার্চ ল্যাবের গবেষকদের নির্দেশনায় ক্লদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই সিস্টেমটি শনাক্ত করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, নতুন সিস্টেমটির মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে, যা এখন পর্যন্ত মাত্র অল্প কয়েকটি ‘প্রোগ্রামেবল’ জৈব কাঠামোর মধ্যে পাওয়া গেছে। এটি ব্যাকটেরিয়ায় থাকা জিনোম-এডিটিং মেকানিজম বা ক্রিস্পারের কথা মনে করিয়ে দেয়। উল্লেখ্য, সিকল সেল ডিজিজ এবং ক্যানসারসহ নানা জটিল ব্যাধির চিকিৎসার অগ্রগতিতে ক্রিস্পার প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, নতুন করে শনাক্ত হওয়া এই সিস্টেমটির কাজ কী, তা এখনো তারা নির্ধারণ করতে পারেনি। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ক্লদ বড় একটি ডিএনএ সিকোয়েন্সের ডেটাবেসে ২১ ঘণ্টা ধরে অনুসন্ধান চালানোর পর সিস্টেমটির সন্ধান পায়। এই নতুন সিস্টেমটির নাম দেওয়া হয়েছে ART (Array-associated Reverse Transcriptases)
অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী (সিইও) দারিও আমোদেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ এক পোস্টে জানান, এটি জিন সম্পাদনার নতুন একটি কৌশল হতে পারে বলে ধারণা করছেন তাঁরা। এআই চিকিৎসা বিজ্ঞানে যে যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলো আনতে চলেছে, এটি কেবল তার সূচনা মাত্র।
আমোদেই দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এআই অধিকাংশ রোগের চিকিৎসা করতে সাহায্য করতে পারে। বিশ্বের সব শীর্ষস্থানীয় এআই গবেষণাগার চিকিৎসায় নতুন আবিষ্কারের কাজে গুরুত্ব দিয়ে যুক্ত হোক, এমনটাই চাওয়া তাঁর। এ খাত থেকে কী ধরনের ফলাফল আসে, তা দেখার জন্যও তিনি আগ্রহী।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সহযোগী অধ্যাপক স্ট্যানলি চি এই আবিষ্কারের দাবিকে ‘অবিশ্বাস্য রকমের রোমাঞ্চকর’ বলে অভিহিত করেছেন।
তাঁর মতে, প্রকৃতিতে বিপুল বৈচিত্র্যের আণবিক ব্যবস্থা রয়েছে, যার খুব সামান্যই মানুষ এখনো বুঝতে পেরেছে। কিছু জৈবিক ধরন অত্যন্ত জটিল হলেও সেগুলোর অর্থ ও গুরুত্ব অনেক বেশি হতে পারে। এআই এসব নিয়ে আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে অনুসন্ধানের সক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে। এই ক্ষেত্রে মাত্র ২১ ঘণ্টায় এমন অনুসন্ধান চালানো তারই একটি উদাহরণ।
তবে এ আবিষ্কারের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের অণুজীববিজ্ঞানী কেভিন ব্লেক।
আল জাজিরাকে ব্লেক বলেন, শনাক্ত করা ডিএনএ বিন্যাসটিকে ক্রিস্পারের মতো বলে ধরে নিচ্ছেন অনেকে। কেউ কেউ দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাচ্ছেন যে অ্যানথ্রপিক হয়তো পরবর্তী নোবেলজয়ী জিন-এডিটিং প্রযুক্তি আবিষ্কার করে ফেলেছে। কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে থাকা ‘ক্রিস্পার’ আর প্রযুক্তির ‘ক্রিস্পার’ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রকৃতিতে ক্রিস্পার মূলত ব্যাকটেরিয়ার রোগপ্রতিরোধব্যবস্থার একটি অংশ। এরকম অজস্র ক্রিস্পার-সদৃশ সিকোয়েন্স রয়েছে যা আমাদের এখনো জানা নেই।
তিনি আরও বলেন, এই আবিষ্কারটি বর্তমান ক্রিস্পার প্রযুক্তির বিকল্প হবে কিংবা কোনো চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতে পারবে, এমন কোনো ইঙ্গিত এখনো মেলেনি।
প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া ক্রিস্পার ব্যবস্থাকে জীবন্ত প্রাণীর ডিএনএ সম্পাদনার কাজে ব্যবহারের পথ দেখিয়েছিলেন মাইক্রোবায়োলজিস্ট এমমানুয়েল শারপঁতিয়ে ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির বায়োকেমিস্ট জেনিফার ডাউডনা। এ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২০ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান তাঁরা দুজন।
ক্রিস্পার প্রযুক্তির চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহার নিয়েও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের চিলড্রেনস হসপিটাল অব ফিলাডেলফিয়া জানিয়েছিল, চিকিৎসকেরা প্রথমবারের মতো একজন রোগীর শরীরে বিশেষভাবে তৈরি ক্রিস্পার জিন সম্পাদনা থেরাপি প্রয়োগ করেছেন। বিরল মেটাবলিক রোগে আক্রান্ত এক শিশুকে প্রথমবারের মতো কাস্টমাইজড ক্রিস্পার থেরাপির মাধ্যমে সফলভাবে চিকিৎসা দেন তাঁরা।