হোম > প্রযুক্তি

পর্যাপ্ত সাবমেরিন কেব্‌ল না থাকায় টেক জায়ান্টদের বিনিয়োগে পিছিয়ে বাংলাদেশ

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

রাজধানীর রাওয়া ক্লাব ভবনে টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত কর্মশালা ও আলোচনা সভা। ছবি: আজকের পত্রিকা

দেশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সাবমেরিন কেব্‌ল ও ল্যান্ডিং স্টেশন না থাকায় আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগে পর্যাপ্ত বিকল্প তৈরি হচ্ছে না। এতে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বা টেক জায়ান্টদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

তাঁদের মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে দুটি সাবমেরিন কেব্‌ল থাকলেও দুটির মালিকানা একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকায় আন্তর্জাতিক সংযোগে রুট ডাইভার্সিটি ও নির্ভরযোগ্যতার ঘাটতি রয়েছে। টেক জায়ান্টদের বিনিয়োগ আকর্ষণে একাধিক স্বাধীন আন্তর্জাতিক সংযোগ, নিয়ন্ত্রক স্থিতিশীলতা ও দ্রুত অনুমোদন নিশ্চিত করা জরুরি বলে জানান তাঁরা।

‘সবার জন্য সাশ্রয়ী ইন্টারনেট: টেক জায়ান্টদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে বাধা ও সমাধান কোথায়?’ শীর্ষক কর্মশালা ও আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

আজ মঙ্গলবার রাজধানীর মহাখালীতে রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া) ক্লাব ভবনে এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ (টিআরএনবি) এ কর্মশালা ও আলোচনা সভার আয়োজন করে।

কর্মশালায় মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রজেক্ট লিড মাহমুদ শাহেদ ও ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) কোষাধ্যক্ষ মঈন উদ্দিন আহমেদ দেশের ইন্টারনেট খাত নিয়ে দুটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন।

মাহমুদ শাহেদ বলেন, দেশে একাধিক সাবমেরিন কেব্‌ল ও ল্যান্ডিং স্টেশন না থাকায় আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগে পর্যাপ্ত বিকল্প তৈরি হচ্ছে না। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো দেশে বিনিয়োগের আগে আন্তর্জাতিক সংযোগ, সাবমেরিন কেবল, ল্যান্ডিং স্টেশন, বিদ্যুৎ, নিয়ন্ত্রক কাঠামোসহ শতাধিক বিষয় বিবেচনা করে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সংযোগের অন্যতম দুর্বলতা হলো—দেশে দুটি সাবমেরিন কেব্‌ল থাকলেও দুটির মালিকানা একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে।

মাহমুদ শাহেদ বলেন, বাংলাদেশে সাতটি আইটিসি থাকলেও এর মধ্যে কার্যত তিনটি আন্তর্জাতিক সাবমেরিন কেব্‌লের সঙ্গে যুক্ত। ফলে আন্তর্জাতিক সংযোগের ক্ষেত্রে আরও বিকল্প ও রুট ডাইভার্সিটি তৈরির সুযোগ রয়েছে। তিনি জানান, আইটিসি ও সাবমেরিন কেব্‌লকে একই ধরনের সংযোগ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। আন্তর্জাতিকভাবে সাবমেরিন কেব্‌লকে মূল সংযোগ এবং আইটিসিকে ব্যাকআপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মূল সংযোগে কোনো সমস্যা হলে আইটিসি বা স্থলভিত্তিক কেব্‌ল বিকল্প হিসেবে কাজ করে।

আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়লে দাম কমে—এর উদাহরণ হিসেবে ২০০৬ সাল থেকে ব্যান্ডউইথের দামের পরিবর্তনের তথ্য তুলে ধরেন মাহমুদ শাহেদ।

তিনি বলেন, ২০০৬ সালে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের বাজার কার্যত একক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তখন প্রতি এমবিপিএস ব্যান্ডউইথের দাম ছিল প্রায় ৭৫ হাজার টাকা। ২০০৮ সালে নতুন আইটিসি অপারেটর ও প্রথম সাবমেরিন কেব্‌ল চালুর পর দাম নেমে আসে প্রায় ২৭ হাজার টাকায়।

পরবর্তী সময়ে আরও আইটিসি ও আইআইজি লাইসেন্স দেওয়ার ফলে প্রতিযোগিতা বাড়ে। ২০১১ সালে প্রতি এমবিপিএসের দাম প্রায় ১২ হাজার টাকা থাকলেও ২০১২ সালে তা প্রায় ৪ হাজার টাকায় নেমে আসে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সাশ্রয়ী ও মানসম্মত ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে একাধিক সাবমেরিন কেব্‌ল ও ল্যান্ডিং স্টেশন স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেন আইএসপিএবির কোষাধ্যক্ষ মঈন উদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি বা দুটি সংযোগের ওপর নির্ভরশীলতা থাকলে আইএসপিগুলোর দর-কষাকষির সক্ষমতা কমে যায়। একাধিক আন্তর্জাতিক উৎস থাকলে ব্যান্ডউইথের দাম কমানোর পাশাপাশি সংযোগের নির্ভরযোগ্যতাও বাড়ানো সম্ভব।

মঈন উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আজকে দুইটা সাবমেরিন, চারটা, ছয়টা সাবমেরিন যখন হবে, তাদের সঙ্গে আমরা নেগোশিয়েট করতে পারব—প্রাইসিং আরও কম দাও, একই দামে আরও বেশি ব্যান্ড দাও।’

মঈন উদ্দিন আহমেদ বলেন, সবার জন্য সাশ্রয়ী ও অর্থবহ ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক কানেকটিভিটি, দেশীয় ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক এবং লাস্ট মাইল—এই তিন স্তরে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ আইএসপিগুলোর জন্য কাঁচামালের মতো। এরপর ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছায় এবং শেষ পর্যন্ত লাস্ট মাইলের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে যায়। ফলে শুধু আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের দাম কমালেই হবে না, দেশীয় ট্রান্সমিশন ও লাস্ট মাইলের ব্যয়ও কমাতে হবে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে দেশটিকে আঞ্চলিক ইন্টারনেট ও ডেটা হাব হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন মঈন উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, একাধিক ল্যান্ডিং স্টেশন স্থাপন করা গেলে বাংলাদেশ থেকে ভারত, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমারসহ আশপাশের অঞ্চলে আন্তর্জাতিক সংযোগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

সাশ্রয়ী ও অর্থবহ ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে দেশে একাধিক আন্তর্জাতিক সংযোগের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি এ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান, বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশনের (বিএনএনআরসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম বজলুর রহমান। সরকারি খাতের একচেটিয়া ব্যবস্থার কারণে অতীতে টেলিযোগাযোগ খাতে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইন্টারনেট অবকাঠামোতেও প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে বলে মনে করে তিনি।

দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বজলুর রহমান। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যের উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের প্রায় ৫৮ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। তাঁর মতে, এর অর্থ এখনো বড় একটি জনগোষ্ঠী ইন্টারনেট ব্যবহারের বাইরে রয়েছে। এই জনগোষ্ঠীকে ইন্টারনেটের আওতায় আনতে একাধিক ব্যবস্থা ও বিকল্প অবকাঠামো প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সংযোগ ও ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে বেসরকারি খাতকে আরও সুযোগ দেওয়া উচিত বলে জানান তিনি।

সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন টিআরএনবি সভাপতি এস এম মাসুদুজ্জামান রবিন। সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাবেক সভাপতি সমীর কুমার দে। আরও বক্তব্য দেন আইএসপিএবি সভাপতি মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম, সিডিনেট কমিউনিকেশন্স লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মশিউর রহমান প্রমুখ।

কর্মশালায় জানানো হয়, বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট কানেকটিভিটির ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ সাবমেরিন কেবলের ওপর নির্ভরশীল। অথচ বাংলাদেশে মাত্র দুটি সাবমেরিন কেবল ও দুটি ল্যান্ডিং স্টেশন রয়েছে এবং এ খাতে কোম্পানি মাত্র একটি। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা। এ ছাড়া আইটিসি ও টেরেস্ট্রিয়াল কেবল থাকলেও এগুলো মূলত ব্যাকআপ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য ও বিকল্প সাবমেরিন কেবল সংযোগ বাড়ানো জরুরি। দেশে বর্তমানে মোট ১৩ দশমিক ৫ টেরাবাইট ব্যান্ডউইথ ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে ২৮-২৯ শতাংশ ব্যবহার করে গুগল, ২৬-২৭ শতাংশ মেটা, ১৪-১৫ শতাংশ আকামাইন এবং ৬-৭ শতাংশ ক্লাউডফ্লেয়ার ও অ্যামাজন। এসব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ডেটা সেন্টার স্থাপন করলে দেশের ইন্টারনেট অবকাঠামো ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে বাড়বে স্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ।

খাত সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে বলেন, বেসরকারি সাবমেরিন কেব্‌লসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে অনুমোদনের জন্য প্রায় ১০টি মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। এতে ৭ থেকে ৮ মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায় বলে জানানো হয়। তাতেও আটকে রয়েছে বেসরকারি সাবমেরিন কেব্‌লের অনুমতি। অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ ব্যবস্থা চালু করা গেলে সময় ও জটিলতা দুটোই কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে নীতিমালার ধারাবাহিকতা ও আইনি নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।