বিশ্বের ৭০ শতাংশেরও বেশি ওয়েবসাইটের মূল ভিত্তি বা প্রোগ্রামিং ভাষা ‘পিএইচপি’। সম্প্রতি পিএইচপিতে এক দশক ধরে লুকিয়ে থাকা দুটি মারাত্মক নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের মাধ্যমে ধরা পড়া এই ত্রুটির কারণে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ ও ডিজিটাল সেবায় ব্যাপক সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে বিশ্বের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলো।
সাধারণ ব্যবহারকারীরা সরাসরি না দেখলেও ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যাকএন্ডে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ হলো পিএইচপি বা হাইপারটেক্সট প্রিপ্রসেসর। উইকিপিডিয়া, বিশ্বজুড়ে অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্ম এবং ওয়ার্ডপ্রেসের মতো জনপ্রিয় সিএমএসসহ কোটি কোটি ওয়েবসাইট পিএইচপির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। সার্ভারে তথ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করে ব্যবহারকারীর সামনে প্রদর্শন করার মূল কাজটি সম্পন্ন করে পিএইচপি।
চলতি সপ্তাহে সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা উইজ এবং ক্যালিফ-এর গবেষকেরা এআই প্রযুক্তির সহায়তায় পিএইচপির মূল কোডে গত ১০ বছর ধরে থাকা দুটি মারাত্মক নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত করেন, যাকে গবেষকরা ‘পিএইচপি২শেল’ নামে আখ্যায়িত করেছেন।
হ্যাকাররা এই ত্রুটি কাজে লাগিয়ে কোনো প্রকার পাসওয়ার্ড বা ইউজার ভেরিফিকেশন ছাড়াই সার্ভারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি করতে পারে। ফলে বিশ্বের কোটি কোটি ওয়েবসাইট বর্তমানে এমন ঝুঁকিতে রয়েছে। নিরাপত্তা সংস্থা উইজের মতে, এটি এআই দ্বারা শনাক্ত সর্বকালের সবচেয়ে মারাত্মক সাইবার ঝুঁকি।
ক্লাউডফ্লেয়ার জানিয়েছে, পিএইচপির মূল কোডে নিরাপত্তা ত্রুটির তথ্য প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাদের নেটওয়ার্কে লাখ লাখ হ্যাকিং চেষ্টার ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে।
পিএইচপির এই মহাঝুঁকি প্রকাশের পর বিশ্বের প্রধান প্রধান সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা এবং রাষ্ট্রপ্রধানেরা জরুরি নির্দেশনা জারি করেছেন।
মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) অবিলম্বে পিএইচপির ইমার্জেন্সি আপডেট বা প্যাচ ইনস্টল করার নির্দেশ দিয়েছে। দ্রুত আপডেট দেওয়া সম্ভব না হলে সরকারি ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে তারা।
জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এক বার্তায় জনগণকে তাদের বাণিজ্যিক ও সরকারি ওয়েবসাইট পরীক্ষা করে প্রয়োজন হলে সাময়িকভাবে ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন, ফিনল্যান্ড সরকার, যুক্তরাজ্যের এডিনবরা কাউন্সিলসহ বিশ্বের বহু সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা আগাম সতর্কতা হিসেবে তাদের সার্ভিস ও ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ করে রেখেছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
ওপেনএআই-এর এআই মডেল এবং আধুনিক অ্যালগরিদম ব্যবহার করে গবেষকরা কোটি কোটি লাইনের জটিল কোড দ্রুত বিশ্লেষণ করেন। ফলে মানব বিশেষজ্ঞদের নজর এড়িয়ে এক দশক লুকিয়ে থাকা ত্রুটিটি মুহূর্তেই ধরা পড়ে। ওপেনএআই জানিয়েছে, এটি হলো সাম্প্রতিক সময়ের স্মরণীয় এবং সবচেয়ে বড় সাইবার নিরাপত্তা ইস্যু।
ওয়েবসাইট মালিকদের জন্য কেবল ওয়ার্ডপ্রেস বা প্লাগইন আপডেট করলেই এই সমস্যার সমাধান হবে না। মূল পিএইচপি সার্ভারে ডেভেলপারের মাধ্যমে অবিলম্বে পিএইচপি ফাউন্ডেশনের অফিসিয়াল ‘ইমার্জেন্সি নিরাপত্তা প্যাচ’ বা আপডেট ইনস্টল করতে হবে।
অন্যদিকে ত্রুটিটি মূলত সার্ভার ব্যাকএন্ডের বিষয়। তাই সাধারণ ব্যবহারকারীদের সরাসরি আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে যেসব ওয়েবসাইটে অ্যাকাউন্ট রয়েছে, সেখান থেকে পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের কোনো অফিশিয়াল নোটিশ দেওয়া হলে তা অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সাইবার আতঙ্কের সুযোগ নিয়ে তৈরি ফিশিং মেসেজ বা লিংকে ক্লিক করা থেকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।