এআই চ্যাটবট ক্লদকে ‘মানুষের’ মতো করে দেখতে চায় এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। এমনই ভাবনা থেকে প্রতিষ্ঠানটি ঘোষণা দিয়েছে, ক্লদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে অপ্রয়োজনীয় ও অপমানজনক আচরণ করলে ব্যবহারকারীকে নিষিদ্ধ করা হবে।
বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটি জানায়, হালনাগাদ ব্যবহারের নীতিমালার আওতায় এমন ব্যবহারকারীর সঙ্গে কথোপকথন বন্ধ করতে পারবে।
প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম দ্য ভার্জ প্রথম এ পরিবর্তনের খবর প্রকাশ করে। ব্যবহারের নীতিমালা নিয়ে বার্ষিক পর্যালোচনার পর এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে অ্যানথ্রপিক।
ক্লদের নির্মাতা অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর আগেও এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবে নতুন নীতিমালায় এ ধরনের আচরণ নিষিদ্ধ কাজের তালিকায় যুক্ত করা হচ্ছে। নিষিদ্ধ কাজের তালিকায় অন্যদের হয়রানি, নিজের ক্ষতিসাধনে উৎসাহ দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া অন্তরঙ্গ ছবি তৈরির বিষয়ও রয়েছে।
অ্যানথ্রপিকের ভাষ্য, বারবার অপমানজনক আচরণের চরম ঘটনার ক্ষেত্রেই শুধু নতুন নীতি প্রয়োগ করা হবে। ব্যবহারকারীর সাধারণ বিরক্তি প্রকাশ, পাল্টা যুক্তি দেওয়া, সৃজনশীল কাজে অন্ধকার বা অস্বস্তিকর বিষয়বস্তু ব্যবহার এবং মডেল পরীক্ষা বা গবেষণার ক্ষেত্রে এ নীতি প্রযোজ্য হবে না।
প্রতিষ্ঠানটি ইঙ্গিত দিয়েছে, স্পষ্টভাবে ইচ্ছাকৃত কিছু আচরণের ক্ষেত্রেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কোন ধরনের আচরণকে অ্যানথ্রপিক অপমানজনক বা নিষ্ঠুর হিসেবে বিবেচনা করবে, তা এখনো স্পষ্ট করেনি প্রতিষ্ঠানটি।
নতুন নীতিমালার স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কেউ পদক্ষেপটির প্রশংসা করে বলেছেন, এটি ভালো আচরণ বা এআই মডেলের ‘কল্যাণ’ নিশ্চিত করার পথে অগ্রগতি।
সমালোচকেরা অবশ্য পরিকল্পনাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। একজন একে ‘গভীরভাবে ভুল’ বলে মন্তব্য করেছেন। আরেকজনের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ মানুষ ও প্রাণীর প্রতি অপমানজনক আচরণের বিষয়টিকেও খাটো করে দেখার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আয়ারল্যান্ডের আইন প্রতিষ্ঠান উইলিয়াম ফ্রাইয়ের প্রযুক্তিবিষয়ক অংশীদার ব্যারি স্ক্যানেল লিংকডইনে লিখেছেন, ‘সংখ্যা ও গণিতের প্রতি নিষ্ঠুর হওয়া যায় না।’
ব্যারি স্ক্যানেল আরও লিখেছেন, ‘এআইকে এভাবে মানুষের মতো করে দেখানো ক্ষতিকর। এর ফলে মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে, এআই আসলে যা নয়, সেটিই।’
মাইক্রোসফটের এআই বিভাগের পরিচালক মুস্তাফা সুলেইমান গত সেপ্টেম্বরে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের সমালোচনা করে বলেছিলেন, প্রতিষ্ঠানটি এআইকে মানুষের মতো বিবেচনা করছে। অ্যানথ্রপিকের নতুন নীতিমালা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে তিনি গলে যাওয়া মুখের ইমোজি ব্যবহার করেছেন।
নতুন বা উদীয়মান ঝুঁকি মোকাবিলায় নীতিমালার অন্য অংশও হালনাগাদ করা হয়েছে। প্রতারণামূলক প্রচারণা চালাতে ক্লদ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ভোটারদের বিভ্রান্ত করা বা নির্বাচনে বিঘ্ন ঘটানোর কাজে ক্লদ ব্যবহার করা যাবে না বলেও স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে।
অ্যানথ্রপিক বৃহস্পতিবার আরও জানিয়েছে, তাদের আগের ব্যবহারের নীতিমালাতেই অস্ত্র তৈরির কাজে এআই সরঞ্জাম ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল।
নীতিমালার বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্যে চ্যাটবটের সঙ্গে অপমানজনক আচরণ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তটিই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ ও যাচাই-বাছাইয়ের মুখে পড়েছে। সিদ্ধান্তটির মধ্য দিয়ে জেনারেটিভ এআই সরঞ্জাম ব্যবহারের সময় সংক্ষিপ্ত ও রূঢ় ভাষা ব্যবহার করা উচিত, নাকি ভদ্রতা বজায় রাখা উচিত—সেই বহুল আলোচিত প্রশ্নও সামনে এসেছে।
কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, চ্যাটজিপিটির মতো এআই সরঞ্জামকে ‘প্লিজ’ বা ‘থ্যাংক ইউ’ বলা অপ্রয়োজনীয় এবং এতে টোকেনের অপচয় হয়। জেনারেটিভ এআই সরঞ্জামকে শক্তি জোগানো বৃহৎ ভাষা মডেল ব্যবহারকারীর প্রশ্ন প্রক্রিয়াকরণ ও উত্তর দেওয়ার কাজে এসব টোকেন ব্যবহার করে।
কয়েকজনের যুক্তি, ভদ্রভাবে কথা বললে এআইয়ের কাছ থেকে আরও উন্নত মানের উত্তর পাওয়া যেতে পারে।
গত বছরের নভেম্বরে কলিন্স অভিধান এআই সরঞ্জামকে অবজ্ঞা করে বোঝাতে ‘ক্ল্যাঙ্কার’ শব্দটির পুনরুত্থানের বিষয়টি তুলে ধরে। ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ‘স্টার ওয়ার্স’ গেম ও চলচ্চিত্রে রোবট বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে আসছে।
গত বছরের জুলাইয়ে এআইচালিত যন্ত্রপাতি নিয়ে হতাশা জানাতে অনেকে টিকটকে পোস্ট দেওয়া শুরু করলে ২০২৫ সালের সামগ্রিক মনোভাবের প্রতিফলন ঘটানো শব্দের সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা করে নেয় ‘ক্ল্যাঙ্কার’।
কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এআই চ্যাটবটের সঙ্গে রূঢ় আচরণ মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, এ ধরনের আচরণ অন্যদের সঙ্গে কথা বলা ও তাঁদের সঙ্গে ব্যবহারের ধরনেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।