একসময় এটি ভাবা অসম্ভব ছিল। শিগগির হয়তো পৃথিবীর পথে পথে দেখা যাবে নতুন প্রজাতির চতুষ্পদী বা চার পাওয়ালা মানুষ। অর্থাৎ ভবিষ্যতে আমরা আর দুই পায়ে হাঁটব না। শরীরের সঙ্গে যুক্ত হবে আরও দুটি পা। সেগুলো অবশ্য যান্ত্রিক পা। চীনের গবেষক ও প্রযুক্তিবিদেরা সেই ভবিষ্যতের দরজায় জোরে কড়া নাড়ছেন।
মানুষ দ্বিপদী বা দুই পা-বিশিষ্ট প্রাণী। হাঁটতে শেখার পর থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দুটি পায়ের ওপর ভর করে তাকে চলতে হয়। আদিম থেকে আধুনিক মানুষ। সভ্যতার যত উত্থান, যত প্রযুক্তি, যত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সবকিছুর মধ্যে মানুষের পায়ের সংখ্যা সেই দুই-ই রয়ে গেছে।
মানুষের যদি শতপদী প্রাণীর মতো ১০০ পা থাকত। তবে কী হতো? ঢাকার যানজটে গাড়ি, বাস বা রিকশায় বসে ঘেমে-নেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো না। মানুষ হয়তো নিজের ১০০ পায়ের ওপর ভর করে যানজটের ফাঁক গলে এগিয়ে যেত।
অবশ্য ১০০ পায়ের প্রয়োজন নেই। আপাতত চার পা দিয়েই কাজ চালানো যাক। মানুষের শরীরের ভার যখন সেই আদি ও অকৃত্রিম দুটি পায়ের ওপর পড়ে, তখন দীর্ঘক্ষণ হাঁটা বা ভারী জিনিস বহন করা বেশ কষ্টকর হয়ে যায়। শরীরের সঙ্গে যদি আরও দুটি শক্তিশালী যান্ত্রিক পা যুক্ত করা যায়, তাহলে সেই চাপ চারটি পায়ের মধ্যে ভাগ হয়ে যেতে পারে। হাঁটাও হতে পারে তুলনামূলক স্বচ্ছন্দ, দ্রুত এবং কম পরিশ্রমের।
চীনের শেনঝেনের গবেষকেরা সেই ধারণাকে প্রযুক্তির বাস্তব পরীক্ষায় নিয়ে এসেছেন। শরীরের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে দুটি রোবোটিক পা, যেন মানুষের শরীরে সংযোজিত হলো এক জোড়া অতিরিক্ত পা। গবেষকদের দাবি, এই বাড়তি দুই পায়ের সাহায্যে শরীরের অনুভূত ওজন ৫২ শতাংশ পর্যন্ত কম মনে হতে পারে এবং চলাফেরার জন্য প্রয়োজনীয় পরিশ্রম ৩২ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। অর্থাৎ মানুষ তখন নিজের দুই পায়ে হাঁটবে আর প্রযুক্তি তাকে ধার দেবে আরও দুই পা।
তবে সাধারণ মানুষের চেয়ে উদ্ধারকর্মী, নির্মাণশ্রমিক এবং দুর্গম এলাকায় কাজ করা কর্মীদের মধ্যে এই প্রযুক্তি বেশি আগ্রহ তৈরি করেছে। কারণ, সেখানে মানুষের পা শুধু হাঁটার জন্য নয়, ভার বহনেরও প্রধান অবলম্বন। ভারী সরঞ্জাম নিয়ে পাহাড়ি এলাকা, ধ্বংসস্তূপ কিংবা নির্মাণস্থলে কাজ করতে হলে অতিরিক্ত যান্ত্রিক পা হতে পারে কার্যকর সহায়ক। বয়স বা শারীরিক কারণে হাঁটতে গিয়ে দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়েন—এমন মানুষের জন্য প্রযুক্তিটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। আর রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা সেনা ও পুলিশ নিশ্চয়ই এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে ভাববে।
প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, মানুষের শরীরও যেন ধীরে ধীরে তার পরীক্ষাগার হয়ে উঠছে। কৃত্রিম হাত, কৃত্রিম পা, এক্সোস্কেলেটন, রোবোটিক অঙ্গ—আজ যা অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে, কাল সেটি হয়তো দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে যাবে।
একদিন হয়তো রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমরা কাউকে দেখে আর অবাক হব না যে তার দুটি আসল পায়ের সঙ্গে দুটি রোবোটিক পা। অবাক হব সেই মানুষকে দেখে, যার মাত্র দুই পা।
সূত্র: দ্য ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব রোবোটিকস রিসার্চ