সোশ্যাল মিডিয়ার বৈশ্বিক প্রবণতা
বর্তমান বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়া জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে বিশ্বজুড়ে এর ব্যবহারের ধরন পর্যালোচনা করলে একটি চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসে। দুটি ভিন্ন জরিপের দিকে নজর দিলে কোথাও ব্যবহারকারীর সংখ্যা, আবার কোথাও স্ক্রিনের সামনে কাটানো সময়ের অবিশ্বাস্য পার্থক্য চোখে পড়ে।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু আড্ডা দেওয়ার জায়গা নয়। এটি তথ্য আদান-প্রদান ও যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ দশমিক ১৭ বিলিয়ন মানুষ এখন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছে। এই সংখ্যা বৈশ্বিক মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৪ শতাংশ। ২০১৯ সালের তুলনায় ব্যবহারকারী প্রায় ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার বেশির ভাগ দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার মতো মোবাইল-ফার্স্ট অঞ্চলগুলোর অধিবাসী। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউর জরিপে বিশ্বজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর মোট সংখ্যা ও শতকরা হার নির্ধারণ করা হয়েছে কোনো দেশের মোট জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে; যেমন চীন ও ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশগুলোতে কোটি কোটি লোক ফেসবুক, ইউটিউব বা ইনস্টাগ্রামের সঙ্গে যুক্ত। অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত দেশ জাপানে প্রায় ৯৯ মিলিয়ন মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ দশমিক ৫ শতাংশ। আবার আফ্রিকা মহাদেশের কেনিয়ায় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৮ দশমিক ৪ মিলিয়ন, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ। এই হিসাব থেকে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, জাপানের মতো দেশে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
বিশ্বের মোট সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের আঞ্চলিক বণ্টন পর্যালোচনা করলে এশিয়ার একচ্ছত্র আধিপত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশ্বের মোট সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর ৬০ শতাংশ এই অঞ্চলের বাসিন্দা। অঞ্চলটির বার্ষিক বৃদ্ধির হার ১৪ দশমিক ১ শতাংশ, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ।
বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের স্ক্রিন টাইমের একটি বড় অংশ দখল করে নিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো। সামগ্রিকভাবে একজন মানুষ প্রতিদিন গড়ে ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট বা ১৫০ মিনিট সোশ্যাল মিডিয়ায় পার করে। তবে কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে স্ক্রিন টাইম বিশ্ব গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম প্রকাশিত তথ্য থেকে মানুষের দৈনিক গড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সময় সম্পর্কে জানা যায়। এখানে ব্যবহারকারীর সংখ্যার চেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে মানুষ প্রতিদিন কত ঘণ্টা বা মিনিট ডিজিটাল পর্দায় স্ক্রল করে কাটাচ্ছে। এই জরিপে উঠে এসেছে বিপরীত এক চিত্র। দেখা গেছে, যেসব দেশে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বা শতকরা হার কম, সেখানকার মানুষ প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক বেশি সময় ব্যয় করে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি সময় ব্যয়কারী দেশগুলোর শীর্ষে রয়েছে বিকাশমান অর্থনীতি ও তরুণ জনসংখ্যার দেশগুলো। জরিপ অনুযায়ী, কেনিয়ার জনগণ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ ঘণ্টা ১৩ মিনিট সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটায়। সংখ্যাটি বিশ্ব গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। নাইজেরিয়া ও ব্রাজিলের চিত্রও একই রকম। সেখানে কমসংখ্যক মানুষ ইন্টারনেটে যুক্ত হলেও যারা যুক্ত, তারা দিনের একটা বড় অংশ ডিজিটাল দুনিয়ায় কাটিয়ে দেয়। অন্যদিকে জাপানে ৮০ শতাংশের বেশি লোক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করলেও, তারা প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৪৬ মিনিট সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকে। একইভাবে ডেনমার্ক বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে এই দৈনিক গড় সময় বেশ কম। যেসব দেশে বয়সে তরুণ বা জেন-জি জনসংখ্যার হার বেশি, সেখানে টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবের মতো ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বেশি। আবার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মূলধারার সংবাদ ও যোগাযোগের জন্য পৃথক মাধ্যম ব্যবহারের বদলে সোশ্যাল মিডিয়া একমাত্র অনলাইন হাব হিসেবে কাজ করে।
উভয় জরিপ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, কর্মসংস্কৃতি, বয়স এবং বিনোদনের বিকল্প সুযোগের ওপর ভিত্তি করে এই পার্থক্য তৈরি হয়। জাপানের মতো উন্নত দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেশি এবং তাঁদের কাজের কঠোর শৃঙ্খলা ও বিনোদনের বিকল্প মাধ্যম থাকায় সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কম অপচয় করেন। পক্ষান্তরে কেনিয়া বা নাইজেরিয়ার মতো বিকাশমান দেশগুলোতে তরুণদের সংখ্যা বেশি। সেখানে সোশ্যাল মিডিয়া শুধু বিনোদন নয়, যোগাযোগ, তথ্য খোঁজা এমনকি ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপ্তি ও ব্যবহারের গভীরতা এক নয়। প্রথম জরিপটি জানিয়েছে, কতজন যুক্ত আছে। আর দ্বিতীয় জরিপ স্পষ্ট করেছে, মানুষ সেই প্ল্যাটফর্মে কতটা সময় অপচয় বা ব্যয় করছে। এ দুটি ভিন্ন তথ্য মিলে বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল জীবনযাত্রার একটি বাস্তব ছবি ফুটিয়ে তোলে।
সূত্র: দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম, ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ