কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে থেমে নেই। ভ্রমণ পরিকল্পনা করিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে গবেষণার কাজ—সব ক্ষেত্রে এর ব্যবহার বাড়ছে বহুমাত্রিকভাবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এআইয়ের ব্যবহারও নতুন নয়। যা এখন চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন প্যাড ও রোগীদের ডিজিটাল পর্দা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তবে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই অনুপ্রবেশ সবখানে সমান গতিতে ঘটছে না। একদিকে এআইয়ের সহায়তা গ্রহণে অবিশ্বাস্য গতি দেখাচ্ছে বিকাশমান অর্থনীতির দেশগুলো। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশ আবার কিছুটা ধীরগতি ও উদ্বেগের সঙ্গে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে।
‘এলসেভিয়ার্স ক্লিনিশিয়ান অব দ্য ফিউচার-২০২৫’ জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বের ১০৯টি দেশের ২ হাজার ২০৬ জন চিকিৎসকের মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশই পেশাগত কাজে এআই ব্যবহার করছেন। এই সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এ ক্ষেত্রে বড় চমক দেখিয়েছে চীন। সেখানকার প্রায় ৭১ শতাংশ চিকিৎসক চিকিৎসাসেবায় এআই ব্যবহার করছেন। ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা গেছে প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে উন্নত দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে। যুক্তরাষ্ট্রে ৩৬ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে ৩৪ শতাংশ চিকিৎসক এআই ব্যবহার করেন। অর্থাৎ সেখানে ব্যবহারের হার সবচেয়ে কম। এআই ব্যবহারকারী প্রায় ৯৭ শতাংশ চিকিৎসক চ্যাটজিপিটির মতো সাধারণ মডেল প্রয়োগ করছেন। বিশেষজ্ঞদের প্রত্যাশা, এআই চিকিৎসকদের কাজের সময় বাঁচানোর পাশাপাশি দ্রুত ও নিখুঁত রোগনির্ণয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।
চিকিৎসকদের গণ্ডি পেরিয়ে যদি রোগীদের দিকে নজর দেওয়া হয়, তবে সেখানে শীর্ষ স্থান দখল করেছে ভারত। অর্থাৎ ভারতে চিকিৎসকের চেয়ে রোগীরা এআইয়ের ব্যবহার বেশি করেন। বোস্টন কনসালটিং গ্রুপ ১৩ হাজার মানুষের ওপর এই বিষয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করেছে। সেখানে উঠে এসেছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫৭ শতাংশ মানুষ নিজস্ব স্বাস্থ্যের পরিচর্যায় এআই ব্যবহার করছেন। এ ক্ষেত্রে সবার ওপরে আছে ভারত। দেশটিতে ৮৫ শতাংশ রোগী এআই ব্যবহার করে। এরপরই ৬৭ শতাংশ ব্যবহারকারী নিয়ে আছে ব্রাজিল আর ৬২ শতাংশ নিয়ে আছে চীন। অথচ জাপানে এই হার মাত্র ৩৪ শতাংশ।
প্রজন্মভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এআই হেলথ টুলের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ৭৮ শতাংশ জেন-জি এবং ৭১ শতাংশ মিলেনিয়ালস এআই হেলথ টুল ব্যবহার করেন। সিংহভাগ রোগী অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিং ও রেফারেল ম্যানেজমেন্টের কাজে এটি ব্যবহার করতে স্বচ্ছন্দবোধ করলেও হার্ট অ্যাটাকের মতো জরুরি স্বাস্থ্যগত সিদ্ধান্তে এআইয়ের ওপর ভরসা করার হার মাত্র ২২ শতাংশ।
ফিলিপাইনের ফিউচার হেলথ ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী, চিকিৎসকেরা মূলত প্রাত্যহিক প্রশাসনিক ও সময়সাপেক্ষ কাজ সহজ করতেই এআই ব্যবহার করছেন। এগুলোর মধ্যে আছে,
এর ফলে কাজের দক্ষতা বাড়ার পাশাপাশি চিকিৎসকেরা সপ্তাহে গড়ে অতিরিক্ত ৫ জন রোগী দেখার বাড়তি সময় পাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ ইতিমধ্যে ১ হাজার ৬১৪টি এআই-চালিত মেডিকেল ডিভাইসের অনুমোদন দিয়েছে, এগুলোর মধ্যে ৭৬ শতাংশই আছে রেডিওলজি (এক্স-রে, সিটি স্ক্যান) সংক্রান্ত। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ বছর পর্যন্ত অনুমোদিত কোনো ডিভাইসে জেনারেটিভ এআই বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ব্যবহার করা হয়নি। অন্যদিকে, ইউরোপের সুইডেন ও যুক্তরাজ্য স্তন ক্যানসার (ম্যামোগ্রাম) পরীক্ষায় এআই ব্যবহার করে অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছে। সুইডেনের এমএএসএআই ট্রায়ালে ১ লাখের বেশি নারীর ম্যামোগ্রাম পরীক্ষায় এআই ব্যবহারের ফলে চিকিৎসকদের কাজের চাপ ৪৪ শতাংশ কমেছে এবং ২৯ শতাংশ বেশি ক্যানসার শনাক্ত হয়েছে। একই ভাবে যুক্তরাজ্যের এনএইচএস গ্রাম্পিয়ানে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে ক্যানসার ধরা পড়ার হার ১০ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে এবং ফলাফল জানানোর সময় ১৪ দিন থেকে কমে মাত্র ৩ দিনে নেমে এসেছে।
আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ সালের জরিপ বলছে, দেশটির ৮১ শতাংশ চিকিৎসক এখন প্র্যাকটিসে এআই ব্যবহার করছেন। এই সংখ্যা ২০২৩ সালে ছিল ৩৮ শতাংশ। প্রায় ৭৫ শতাংশের বেশি চিকিৎসক মনে করেন, এটি স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াচ্ছে। তবে এই দ্রুত অগ্রগতির মাঝেও ৮৮ শতাংশ চিকিৎসক একটি বড় দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছেন। তাঁরা মনে করছেন, এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার ফলে বিশেষ করে নবীন চিকিৎসকদের পেশাগত দক্ষতা ও মেধা লোপ পেতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবায় এআই বিপ্লব শুধু কোনো নির্দিষ্ট দেশের দৌড় নয়। এটি কোন দেশ কীভাবে এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে সেটিই এখন আসল বিষয়। প্রযুক্তি যেখানে রোগনির্ণয় ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ কমাচ্ছে, সেখানে মানবিক স্পর্শ ও চিকিৎসকদের নিজস্ব মেধার ভারসাম্য বজায় রাখাটাই ভবিষ্যতের মূল চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ নিউজলেটার