এখন আর যন্ত্র নয়, শরীরের একটি অঙ্গ যেন হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোন। ঘুম থেকে উঠে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত এটি এখন আমাদের সঙ্গে যুক্ত থাকে; যেন হাতের কাছে থাকলে মন ভালো থাকে, না থাকলে মন খারাপ হয়। তবে এর প্রকৌশল ব্যবস্থা সম্পর্কে খুব না জানলেও এই ছোট্ট ডিভাইস আমাদের সম্পর্কে জানে অনেক কিছু। কী কী জানে আমাদের সম্পর্কে?
তবে হ্যাঁ, এটিও জানিয়ে রাখা জরুরি, মোবাইল ফোন নিজে সব তথ্য জানে না; বিভিন্ন অ্যাপ, অপারেটিং সিস্টেম, অনলাইন সেবা এবং তৃতীয় পক্ষের ডেটা কোম্পানি আলাদাভাবে তথ্য সংগ্রহ বা প্রক্রিয়া করতে পারে। তা থেকে তৈরি হতে পারে একজন মানুষের ডিজিটাল চিত্র।
আপনার মোবাইল ফোনের সবচেয়ে সংবেদনশীল তথ্যগুলোর একটি হলো লোকেশন।
জিপিএস, ওয়াই-ফাই, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও অন্যান্য সেন্সরের সাহায্যে মোবাইল ফোন আপনার অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে। আপনি কোনো অ্যাপকে লোকেশন ব্যবহারের অনুমতি দিলে সেটি প্রয়োজন অনুযায়ী আনুমানিক বা আরও নির্ভুল অবস্থান পেতে পারে।
গুগল ম্যাপসের টাইমলাইন চালু থাকলে গুগল নামের অ্যাপটি চালু থাক আর না থাক, আপনার ডিভাইস নিয়মিতভাবে আপনার অবস্থান সংরক্ষণ করতে পারে। গুগল জানিয়েছে, টাইমলাইন এখন ডিফল্টভাবে বন্ধ থাকে এবং ব্যবহারকারীকে এটি চালু করতে হয়।
অর্থাৎ, আপনার মোবাইল ফোনটি চাইলে এখন বলতে পারে, আপনি কোথায় আছেন। শুধু তা-ই নয়, নির্দিষ্ট সেটিংস এবং অনুমতি থাকলে আপনার চলাফেরার একটি দীর্ঘ ইতিহাস তৈরি হতে পারে—কোথায় গেছেন, কোন পথে গেছেন, কোন জায়গায় বারবার গেছেন ইত্যাদি বিস্তারিত তথ্য দিয়ে।
তবে এখানেও একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, সব ফোন বা সব অ্যাপ একইভাবে এসব তথ্য সংগ্রহ করে না। আপনার অনুমতি, ফোনের অপারেটিং সিস্টেম এবং সংশ্লিষ্ট অ্যাপের নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ।
ফোন আপনার পছন্দের তালিকাটিও ধীরে ধীরে বুঝে ফেলতে পারে।
আপনি কোন অ্যাপ ব্যবহার করেন, কোন ওয়েবসাইটে যান, কোন ধরনের কনটেন্ট দেখেন বা পড়েন—এসব তথ্য বিজ্ঞাপন ও ব্যক্তিগতকরণের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।
অ্যান্ড্রয়েডের বর্তমান বিজ্ঞাপন-গোপনীয়তা ব্যবস্থায় ব্যবহার করা অ্যাপের ভিত্তিতে আপনার আগ্রহের বিষয়গুলোর তালিকা তৈরি হতে পারে। পরবর্তী সময়ে কোনো অ্যাপ এই তথ্য ব্যবহার করে তুলনামূলকভাবে প্রাসঙ্গিক বিজ্ঞাপন দেখাতে পারে।
ধরা যাক, আপনি কয়েক দিন ধরে ক্যামেরা, ভ্রমণ ব্যাগ কিংবা হোটেল খুঁজছেন। এরপর আপনার মোবাইল ফোনে একই ধরনের পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখা শুরু হলো। এর অর্থ এই নয় যে ফোন আপনার মনের কথা পড়ে ফেলেছে। বরং আপনার সার্চ, ওয়েবসাইট ভিজিট, অ্যাপ ব্যবহারের ধরন ও বিজ্ঞাপন-সংক্রান্ত শনাক্তকারক—বিভিন্ন সংকেত মিলিয়ে বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা আপনার আগ্রহ সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করেছে।
এতক্ষণে নিশ্চয় আপনার মনে এই প্রশ্ন এসে গেছে। জেনে রাখুন, কোনো অ্যাপকে মাইক্রোফোন ব্যবহারের অনুমতি দিলে সেই অ্যাপ মাইক্রোফোন ব্যবহার করতে পারে। তবে ‘আমরা কোনো কথা বললেই ফোন গোপনে তা শুনে বিজ্ঞাপন দেখায়’—এমন সাধারণ দাবি প্রমাণিত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
বর্তমান অ্যান্ড্রয়েডে কোন অ্যাপ কখন মাইক্রোফোন, ক্যামেরা বা লোকেশন ব্যবহার করেছে, তা প্রাইভেসি ড্যাশবোর্ডে দেখা যায়। ক্যামেরা বা মাইক্রোফোন ব্যবহারের সময় সিস্টেম ইন্ডিকেটরও দেখায়। তাই এখন নিজেকে প্রশ্ন করুন, কোন অ্যাপকে আপনি মাইক্রোফোন ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন এবং সেটি কখন ব্যবহৃত হচ্ছে?
মোবাইল ফোন আপনার আচরণের একটি সূক্ষ্ম ছবি তৈরি করতে পারে।
কোন অ্যাপ কতবার খোলেন, কতক্ষণ ব্যবহার করেন, কোন ফিচারে চাপ দেন—এসব ব্যবহৃত ডেটা হিসেবে সংরক্ষিত বা বিশ্লেষিত হতে পারে। অ্যাপলের অ্যাপ প্রাইভেসি রিপোর্ট ব্যবহারকারীকে গত সাত দিনে কোন অ্যাপ কতবার লোকেশন, ফটো, ক্যামেরা, মাইক্রোফোন বা কনট্যাক্টসের মতো সংবেদনশীল তথ্য ও সেন্সরে প্রবেশ করেছে, তা দেখায়। একই রিপোর্টে অ্যাপগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা ওয়েব ডোমেইনের তথ্যও দেখা যায়।
অনেকে ভাবেন, ফোনের ভেতর একজন ব্যবহারকারীর সম্পূর্ণ ‘ডিজিটাল ফাইল’ তৈরি হয়ে আছে। কিন্তু বাস্তবতা তেমন নয়। আপনার ডিজিটাল ডেটার এক অংশ থাকতে পারে আপনার মোবাইল ফোনে। অন্য অংশ কোনো অ্যাপের সার্ভারে। কোনো তথ্য থাকতে পারে আপনার গুগল বা অ্যাপল অ্যাকাউন্টে। আবার কোনো অ্যাপের ব্যবহৃত তৃতীয় পক্ষের সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট কিটের মাধ্যমে তথ্য অন্য সেবার কাছেও যেতে পারে।
তাই ‘আমার ফোন কী জানে?’ প্রশ্নটির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ‘আমার কোন তথ্য পাচ্ছে কোন অ্যাপ বা সেবা?’
এখন স্বাভাবিকভাবে একটি প্রশ্ন এসে যায়, মোবাইল ফোন থেকে নিজেকে কতটা আড়াল করা সম্ভব? এর উত্তর, পুরোপুরি অদৃশ্য হওয়া কঠিন। কিন্তু তথ্যের প্রবাহ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
প্রথমত, অপ্রয়োজনীয় অ্যাপকে লোকেশন, ক্যামেরা, মাইক্রোফোন বা কনট্যাক্টস ব্যবহারের অনুমতি দেবেন না।
দ্বিতীয়ত, অ্যান্ড্রয়েডের প্রাইভেসি ড্যাশবোর্ড বা আইফোনের অ্যাপ প্রাইভেসি রিপোর্ট নিয়মিত দেখা যেতে পারে। এতে বোঝা যায়, কোন অ্যাপ কোন সংবেদনশীল তথ্য ব্যবহার করছে।
তৃতীয়ত, অ্যাপ ইনস্টলের আগে প্রাইভেসি লেবেল বা ডেটা সেফটি তথ্য দেখা যেতে পারে।
চতুর্থত, প্রয়োজন না থাকলে বিজ্ঞাপন-সংক্রান্ত ব্যক্তিগতকরণ ও ট্র্যাকিং নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এ জন্য অ্যান্ড্রয়েডে অ্যাডভারটাইজিং আইডি মুছে ফেলা বা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে।
পঞ্চমত, গুগল ম্যাপসের টাইমলাইন বা অনুরূপ লোকেশন-ইতিহাস চালু আছে কি না, সেটিও দেখে নিন। চালু থাকলে বন্ধ করে দিন। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো কিছুতে অ্যালাও বোতামে চাপ দেওয়ার আগে দ্বিতীয়বার ভেদে দেখুন।
আপনার মোবাইল ফোন হয়তো আপনার নাম, বয়স, পেশা বা প্রিয় খাবারের একটি সম্পূর্ণ তালিকা নিয়ে বসে নেই। কিন্তু আপনি কী করেন, তার অসংখ্য ছোট ছোট ডিজিটাল সংকেত তৈরি হতে থাকে আপনার মোবাইল ফোনে। যেমন কখন ফোন ধরেন, কোথায় যান, কী খোঁজেন, কী কেনেন, কোন ভিডিওতে থামেন, কোন অ্যাপে কতক্ষণ থাকেন, কোন বিজ্ঞাপনে ক্লিক করেন ইত্যাদি।
এই ছোট ছোট তথ্য আলাদা করে হয়তো তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু একসঙ্গে দেখলে এগুলো একজন মানুষের ডিজিটাল আচরণের একটি বেশ বিস্তারিত ছবি তৈরি করতে পারে।
তাই এবার জরুরি প্রশ্ন করুন নিজেকে, ‘আমি ফোনকে আমার সম্পর্কে কতটা জানার অনুমতি দিয়েছি?’
তথ্য: অ্যান্ড্রয়েড ডট কম, সাপোর্ট ডট অ্যাপল ডট কম, এফটিসি ডট জিওভি/নিউজ