ডারউইনের স্মৃতি এখনো সতেজ। গত আগস্টে যে ডারউইনে যাঁর দুর্দান্ত বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে রূপকথার জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ; দ্যুতি ছড়ানো সেই হাসান মাহমুদকে দেখা গেল কাল মরুতেও। আবুধাবি টেস্টের তৃতীয় দিনের দুপুরে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক স্পেলে বাংলাদেশের প্রথম পেসার হিসেবে শুধু টেস্টে হ্যাটট্রিকই করলেন না, পেলেন ৫ উইকেট। বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে টেস্টে দ্রুততম ৫০ উইকেটের মাইলফলকও স্পর্শ করলেন।
আবুধাবির পড়ন্ত বিকেলে আজ যখন ধারাভাষ্যকার হাসানের বোলিং বিশ্লেষণ করছিলেন, ক্যামেরা তাঁর দিকে তাক করতেই কেমন এক লাজুক হাসিতে মুখটা সরিয়ে নিতে চাইলেন। এই লাজুক হাসানই বাংলাদেশকে সাফল্যের হাসিতে হাসান। আর সেটা বিদেশেই বেশি। ১৭ টেস্টের ক্যারিয়ারে যে চারবার ৫ উইকেট পেলেন, প্রতিটিই বিদেশে। প্রথমটি রাওয়ালপিন্ডিতে, দ্বিতীয়টি চেন্নাইয়ে, তৃতীয় ডারউইনে আর চতুর্থ ‘ফাইফার’ আজ আবুধাবিতে।
সময়ের সঙ্গে হাসানের পরিণতবোধ বাড়ছে। তাসকিন আহমেদ, নাহিদ রানার মতো বোলারদের অনুপস্থিতিতে দারুণ নেতৃত্ব দিচ্ছেন পেস বোলিং আক্রমণকে। হাসান আগের চেয়ে অনেক বেশি স্থির এবং লাইন ও লেন্থ নির্ভর হয়েছে। ধারাবাহিকতা ধরে রাখছেন। ধারাভাষ্যকার পারভেজ মাহারুফ বলেন, ‘ধীরে ধীরে হাসান টেস্টে বাংলাদেশের এক নম্বর ফাস্ট বোলার হয়ে উঠেছে।’
আজ তৃতীয় দিনের খেলা শুরুর সময় আফগানিস্তান বেশ ভালো অবস্থানে ছিল। ৮০ ওভার পর্যন্তও আফগান ব্যাটাররা ভালোই জবাব দিচ্ছিলেন বাংলাদেশকে। নতুন বল হাতে নিতেই দৃশ্য বদলে যেতে শুরু করল। ইবাদত হোসেন শুরুটা করলেও মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে হাসানের স্পেলটা। ৮৩তম ওভারের তৃতীয় বলে ইসমত আলমকে বোল্ড করে শুরু। পরের বলেই কায়েস আহমেদকে লিটন দাসের হাতে দারুণ এক ক্যাচে পরিণত করে হ্যাটট্রিকের সুযোগ তৈরি। তৃতীয় বলে জিয়া-উর-রহমানের বিপক্ষে এলবিডব্লিউর আবেদন। আম্পায়ার সাড়া দিলেন না। রিভিউ নিয়ে পূর্ণ হলো হাসানের হ্যাটট্রিক। হাসানের দুর্দান্ত বোলিংয়ে আফগানিস্তান গুটিয়ে গেল ২৪০ রানে। তাতে বড় লিড পেল বাংলাদেশ।
যে তৃতীয় বলটিতে আউট হবে, নিশ্চিত ছিলেন হাসান। দিনের খেলা শেষে বাংলাদেশ দলের তরুণ পেসার সম্প্রচারকারী চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘‘হ্যাঁ, বল সরাসরি প্যাডে লেগেছিল এবং এটা একেবারে সোজা ছিল। এরপর আমি লিটনের (দাস) সঙ্গে কথা বলি। ও বলল, ‘হ্যাঁ, এটা হয়তো উইকেটে লাগবে। এটা ব্যাকফুটের মতো ছিল।’ তাই হ্যাঁ, আমরা রিভিউ নিয়েছিলাম।’’
হ্যাটট্রিক বলের সময়ে মাথায় কী কাজ করছিল—এ প্রশ্নে হাসান বললেন, ‘আমার শুধু মনে হয়েছিল যে আমার সোজা বল করা উচিত। ব্যস, এটুকুই। এবং বলকে তার কাজ করতে দেওয়া। আমি শুধু স্টাম্পের লাইন ধরে রেখেছি। এটা নিজে থেকেই কাজ করেছে।’
সিম ও সুইং বোলিংয়ের দৃষ্টিনন্দন প্রদর্শনীতে আলো ছড়িয়েছেন হাসান। সারা দিনে যে লেংথে বোলিং করেছেন, সেটির বিশ্লেষণে বলেছেন, ‘বাঁহাতিদের জন্য একটু অ্যাঙ্গেল তৈরি করে অফ স্টাম্পের বাইরে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। আর নতুন বলের সর্বোচ্চ ব্যবহার করার চেষ্টা ছিল, স্টাম্প বরাবর সোজা এবং অফ স্টাম্প লাইনে বল করে ফোর্থ ও ফিফথ স্টাম্প লাইনে আঘাত করা।’
হ্যাটট্রিক পূর্ণ হওয়ার অনুভূতিটা সব সময় দারুণই হয়। হাসানেরও হয়েছে, ‘অনুভূতিটা দারুণ ছিল, আপনারা দেখেছেন প্রথম ইনিংসে আমরা দুটো ডিআরএস হারিয়েছিলাম। সবাই ডিআরএস নিয়েই ভাবছিল যে এটা উইকেটে লাগবে কি না। এর কৃতিত্ব অধিনায়ক এবং লিটন দাসের। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলে আমাকে আশ্বস্ত করেছিল যে হ্যাঁ, এটা উইকেটে লাগবে। রিভিউ নিতে পারো।’
টেস্ট ক্যারিয়ারের নিজের লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে হাসান বলেছেন, ‘সব সময় এভাবেই খেলে যেতে চাই। আর সামনে ঘরের মাঠে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচ রয়েছে এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় দুটি টেস্ট খেলতে যাব। সেগুলোর অপেক্ষায় আছি।’
বোলার হাসান সফল হলেও ব্যাটার হিসেবে করতে পেরেছেন মোটে ১ রান। তবে ব্যাটার হিসেবেই বুঝেছেন, চতুর্থ দিনে সুখবর আছে স্পিনারদের। হাসানের কথায় সেটারই ইঙ্গিত মিলেছে। আজ তৃতীয় দিনের খেলা শেষে ২৬ বছর বয়সী বাংলাদেশের পেসার বলেন, ‘বল এখন বেশ টার্ন করছে। আগামীকাল এটা আমাদের স্পিনারদের জন্যও সহায়ক হতে পারে।’