যেকোনো সংবাদ সম্মেলন কিংবা সাক্ষাৎকারে পিটার বাটলার ‘বাস্তবতা’ শব্দটা বলবেনই। বাস্তবতা আসলে কী?
১৬ বছর আগে আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রবেশ করা একটি দল আজ খেলবে এশিয়ার সর্বোচ্চ মঞ্চে। যে দলের অনেককে সমাজের বাঁকা দৃষ্টিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই পর্যায়ে আসতে হয়েছে। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও এটাই বাস্তবতা!
গত ১৬ বছরে এই দলের কাছে বাস্তবতার সংজ্ঞা বদলেছে। সাফের গণ্ডি টপকে আজ যখন তারা এশিয়ার মূল স্রোতে এসে মিশেছে, তখন কোচ পিটার বাটলারের বাস্তবতা শব্দটি সার্থকতা খুঁজে পায়। শূন্য থেকে শিখরে ওঠার এই যে অবিশ্বাস্য গল্প, এর চেয়ে বড় এবং রূঢ় বাস্তবতা ফুটবল বিশ্বে আর কীই-বা হতে পারে?
আজ মাঠে নামার সময় কিছুক্ষণের জন্য হলেও পুরোনো অতীত হয়তো মনে পড়বে ঋতুপর্ণা-আফঈদাদের। ছয় মাস আগে কজন ভেবেছিল, অস্ট্রেলিয়ায় প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপে নাম লেখাবে বাংলাদেশ। সেটাও র্যাঙ্কিংয়ে ঢের এগিয়ে থাকা বাহরাইন-মিয়ানমারের মতো দলকে টপকে। মেয়েরা আজ মাঠে লড়াই করবে ৯৫ ধাপ এগিয়ে থাকা নারী ফুটবলের পরাশক্তি চীনের বিপক্ষে। যারা এশিয়ান কাপেরই ৯ বারের চ্যাম্পিয়ন, আবার বর্তমান চ্যাম্পিয়নও। সিডনির ওয়েস্টার্ন স্টেডিয়ামে ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় বেলা ২টায়।
বাস্তবতার কথা ভাবলে আপনি হয়তো মনে করতে পারেন, এই ম্যাচে বড় ব্যবধানে হারবে বাংলাদেশ। এর সঙ্গে আরেকটি বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিই। এই মেয়েরা লড়তে জানে। বুকে আত্মবিশ্বাস নিয়ে নিজেকে উজাড় করে খেলতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক আফঈদা খন্দকারের বলা কথাটা একবার পড়ুন, ‘চীন সব দিক দিয়েই ভালো। এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন এবং শক্তিশালী দল হিসেবে তারা খেলছে। আমরা অনেক কিছু শিখব। তবে তারা ভালো দল বলে অবশ্যই মাঠের লড়াইয়ে ছেড়ে দেব না। আমরা অবশ্যই লড়াই করব। ইনশা আল্লাহ, ভালো কিছু হবে।’
এই দল হারলেও মন জেতার মতো ফুটবল খেলতে পারে। কোচ বাটলার বলেন, ‘আমাদের খেলোয়াড়েরা শারীরিক গঠনে ছোট হতে পারে, কিন্তু তাদের হৃদয় অনেক বড়। তারা দেশের জন্য ভালো কিছু করতে চায়। বাংলাদেশ খুবই গর্বিত একটি জাতি। তবে তাঁরা (সমর্থকেরা) বোঝেন এবং উপলব্ধি করেন, আমরা যে স্তরে খেলছি, তা অত্যন্ত কঠিন ও কষ্টসাধ্য। কিন্তু আমরা আমাদের ফুটবল খেলব এবং মানুষের মন জয় করার চেষ্টা করব।’
বাটলারের হাইলাইন ডিফেন্স কৌশলটা যেমন আলোচিত, তেমনি সমালোচিতও। তবে কৌশল বদলাচ্ছেন না বাটলার। সে চীন যত বড় দলই হোক না কেন। বাংলাদেশ কোচ তাঁর কৌশলে অনড় থাকার ব্যাখ্যায় বললেন, ‘হার, জিত বা ড্র—যা-ই হোক, আমি যেভাবে চাই, দল সেভাবেই খেলবে, ফল যা-ই হোক না কেন, আমরা রক্ষণাত্মক হয়ে বাস পার্ক করার মতো দল নই।’
চীনের (১৭) সঙ্গে বাংলাদেশের (১১২) লড়াইটি অনেকটা ডেভিড বনাম গোলিয়াথের মতো। র্যাঙ্কিংয়ের অবস্থান দেখে তো তাই ভাববে। কিন্তু ঠিক এমন লড়াইয়েই তো মাঝেমধ্যে জন্ম নেয় অঘটন শব্দটি। বাটলারও মনে করিয়ে দিলেন সেই কথা, ‘হয়তো আমরা তাদের একটি খারাপ দিনেও ধরতে পারি, কে জানে! কোনো আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখছি না, তবে বিশ্বাস করি, মাঝেমধ্যে অদ্ভুত বা অলৌকিক কিছু ঘটে যেতে পারে।’
গুলিস্তান থেকে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়া দলটি অলৌকিক কিছু যদি ঘটাতে না-ও পারে, আজ স্বপ্ন সত্যি করতে পারবে ঠিকই—এশিয়ার মঞ্চে যাত্রা শুরু বাংলাদেশের মেয়েদের।