আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে ১৭ মাস দূরে সাকিব আল হাসান। দীর্ঘ এই সময়ে তাঁর ফেরা নিয়ে অনেক কথাবার্তা শোনা গেছে। তবে সেই আলোচনা কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর সংবাদমাধ্যম পর্যন্তই থেকেছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নতুন প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমনের আশা, সাকিব ফিরলে দীর্ঘ সময়ের জন্য ফিরবেন।
এ বছরের ২৪ জানুয়ারি বিসিবির পরিচালনা পর্ষদের বোর্ড সভায় সাকিবের ফেরা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বিসিবির একাধিক পরিচালক পাকিস্তান সিরিজ দিয়ে তাঁর প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে আশাবাদী থাকলেও তা আর হয়ে ওঠেনি। সেই সাকিব আজ ৩৯ বছর পূর্ণ করেছেন। এই সময়ে অনেকেই প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট থেকে বিদায় নিয়ে কোচিং, ধারাভাষ্যকারের কাজ করেন।
সাকিব শুধু অবসর নিতেই বাংলাদেশের জার্সিতে ফিরবেন—এমনটা চান না সুমন। আজ সংবাদ সম্মেলনে এসে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত বিসিবির প্রধান নির্বাচক বলেন, ‘সাকিব এসে অবসর নেওয়া জন্য খেলুক আমি সেটা চাই না। সাকিব এসে দীর্ঘ সময় খেলুক। অন্তত ২০২৭ বিশ্বকাপ যেন খেলতে পারে।’
সাকিব যখন ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট শুরু করেন, তখন সুমনের ক্যারিয়ার শেষের দিকে। বাংলাদেশের জার্সিতে সাকিব-সুমন সতীর্থ হিসেবে খেলেছেন দুই বছর। সুমনের মতে সাকিব ফিরেই মাঠে নামার মতো ক্রিকেটার না। সংবাদ সম্মেলনে আজ বিসিবির প্রধান নির্বাচক বলেন, ‘আমি সাকিবকে যতটুকু চিনি সাকিব কাল আসবে আর পরশু মাঠে নামবে—ব্যাপারটা এমন না। তার প্রস্তুতির দরকার আছে।’
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে দূরে থাকলেও প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট থেকে বিচ্ছিন্ন নন সাকিব। ক্যারিবীয় প্রিমিয়ার লিগ (সিপিএল), পাকিস্তান সুপার লিগে (পিএসএল) খেলেছেন গত বছর। যার মধ্যে পিএসএলে তাঁর দল লাহোর কালান্দার্স চ্যাম্পিয়নও হয়েছিল। আর নিউজিল্যান্ড সিরিজ হচ্ছে ১৭ এপ্রিল। হাতে যখন এক মাসও বাকি নেই, সুমন তাই তাড়াহুড়ো করতে চাচ্ছেন না। বিসিবির নবনির্বাচিত প্রধান নির্বাচক বলেন, ‘নিউজিল্যান্ড সিরিজের বেশি সময় বাকি নেই। সাকিব ক্রিকেটের মধ্যে কতটুকু আছে, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত না।’
আইসিসির পরবর্তী সাদা বলের ইভেন্ট ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ। আগামী বছরের অক্টোবর-নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়ায় হবে আইসিসির এই ইভেন্ট। সাকিবের তখন বয়স ৪০ পেরিয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তন করলে যেন দীর্ঘ সময়ের জন্য খেলতে পারেন সুমনের চাওয়া সেটাই। বিসিবি নির্বাচক বলেন, ‘আমি লম্বা সময়ের কথা চিন্তা করছি। এটাও মনে করি না যে সাকিব একটা সিরিজ খেলে চলে যাবে। যদি সাকিবকে পাই, তাহলে অনেক দীর্ঘ সময়ের জন্য তার সার্ভিসটা পেতে চাইব। প্রস্তুতি কিন্তু অনেক বড় ব্যাপার।’
সুমনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ২০০৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে চমকে দিয়েছিল। এবার সেই সুমন বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে কঠিন চেয়ারে বসেছেন। দল ভালো করলে মেলে না তেমন একটা প্রশংসা। আর বাজে পারফরম্যান্সে প্রধান নির্বাচকের ওপর দিয়ে বয়ে যায় সমালোচনার ঝড়। অনেক কটূক্তিও হজম করতে হয়। সুমনের সেটা ভালো করেই জানা। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বিসিবির নবনির্বাচিত প্রধান নির্বাচক বলেন, ‘কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে গেলে কিছু কথা শুনতে হয়। একটা জিনিস আমিও চিন্তা করি যে আমারটাই সব সময় সঠিক নয়। আমারও ভুল হবে। কিন্তু হৃদয় যেটা বলে, সেটাই করব। সেটার জন্য কথা শুনতে হলে শুনব। কিছু মনে করব না। প্রধান নির্বাচক হয়েছেন বলে সমালোচনা সহ্য করতেই হবে।’
বিসিবি গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে সুমনের প্রধান নির্বাচক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার কথা জানিয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন হাসিবুল হোসেন শান্ত, নাঈম ও নাদিফ। ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ পর্যন্ত থাকছে এই নির্বাচক কমিটির মেয়াদ। আগামী বছরের অক্টোবর-নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়ায় হবে আইসিসির এই ওয়ানডে ইভেন্ট। যাঁদের মধ্যে শান্ত ২০২৫ সাল থেকে নির্বাচক কমিটিতে আছেন।
সুমনের মতে, দেশের ক্রিকেটের সামগ্রিক উন্নতিতে ঘরোয়া ক্রিকেট শক্তিশালী করা জরুরি। নাদিফ-নাঈমরা নির্বাচক কমিটিতে থাকায় কাজটা সহজ হবে বলে ধারণা সুমনের, ‘অভিজ্ঞ ও তারুণ্যের একটা মিশ্রণ আছে এখানে। হাসিবুল হোসেন শান্ত অনেক দিন ধরেই কাজ করছেন। বাকি যে দুজন এসেছেন, তাঁদের মধ্যে নাঈম ইসলাম অনেক অভিজ্ঞ। জাতীয় দলে লম্বা সময় ধরে খেলেছেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খেলেছেন। জাতীয় দল তৈরির ব্যাপারে আমার আগের অভিজ্ঞতা যা শেয়ার করতে পারি, সেখানে একটা হচ্ছে জাতীয় দলে যাঁরা খেলছেন, তাঁদের তো দেখতেই পাচ্ছি। তাঁরা কী করছেন, না করছেন সবই অনুসরণ করা হয়। কিন্তু তাঁদের বাইরে ঘরোয়া ক্রিকেটে যাঁরা খেলছেন, কাজ থেকে পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। নাঈম অনেক দিন ধরে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেছেন। তাঁর কাছ থেকে ভালো ইনপুট পেতে পারব। নাদিফ চৌধুরী জুনিয়র পর্যায়ে খেলেছেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খেলেছেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে কে কেমন করছেন, সেই ধারণাটা তাঁরা দিতে পারবেন। যাঁরা এসেছেন, তাঁরা ক্রিকেটের সঙ্গেই আছেন। এটা একটা ইতিবাচক দিক।’
দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট নিয়ে সমালোচনা অনেক দিন ধরেই। ‘পিকনিক-ক্রিকেট’ নামে পরিচিত এই ক্রিকেটে প্রতিযোগিতা তো দেখা যায়ই না, উপরন্তু ফিক্সিংসহ নানা নেতিবাচক কারণে খবরের শিরোনাম হয়ে থাকে। সুমন-নাঈমদের আগে দেশের ক্রিকেটের পাইপলাইন ঠিক করতে হবে। আপাতত এই দেড় বছরে কী করতে পারেন, সেটা সময়ই বলে দেবে।