তুরস্কের পূর্বাঞ্চলে প্রস্তর যুগের এক প্রাচীন জনপদে সন্ধান মিলেছে প্রায় ১১ হাজার বছর আগের মানুষের জীবনযাপন, বিশ্বাস, মৃত্যু ও সামাজিক রীতিনীতির নানা নিদর্শন। পাথরের স্তম্ভ, চিতাবাঘ ও ষাঁড়ের অবয়ব, মানুষের কঙ্কাল এবং মুখ বন্ধ করা অবস্থায় খোদাই করা একটি ক্ষুদ্র মূর্তি প্রত্নতাত্ত্বিকদের সামনে তুলে ধরেছে প্রাগৈতিহাসিক সমাজের বহু অজানা অধ্যায়।
বুধবার (২১ অক্টোবর) সিএনএন জানায়, তুরস্কের পূর্ব তুরস্কের তাওরাস পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত সায়বুরচ গ্রামে ২০২০ সালে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোর সন্ধান পাওয়া যায়। গ্রামের বাসিন্দারা নিজেদের বাগানের দেয়াল নির্মাণে ব্যবহার করছিলেন টি-আকৃতির কিছু পাথর। পরে সানলিউরফা জাদুঘরের কর্মীরা শনাক্ত করেন, পাথরগুলো আসলে প্রাচীন মানুষের তৈরি স্তম্ভ। এগুলো প্রায় ১১ হাজার বছর আগে কৃষিপূর্ব যুগে শিকারি-সংগ্রাহক কোনো জনগোষ্ঠীর নির্মিত স্থাপনার অংশ।
২০২১ সালে সেখানে পুরোদমে খননকাজ শুরু হয়। ২০২৬ সাল পর্যন্ত সায়বুরচে প্রায় ৭০টি নিওলিথিক স্থাপনার সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে বসবাসের ঘর ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহৃত সামষ্টিক ভবন। পাথরের পাত্র ও শস্য পেষার সরঞ্জাম থেকে ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে বুনো শস্য প্রক্রিয়াজাত করা হতো এবং সম্ভবত বিয়ারও তৈরি করা হতো।
তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় আবিষ্কারগুলোর একটি হলো, একটি সামষ্টিক ভবনের পাথরের বেঞ্চে খোদাই করা পাঁচটি অবয়ব। সেখানে দেখা যায় একটি ষাঁড়, দুই পুরুষের অবয়ব ও দুই পাশে দুটি চিতাবাঘ। একটি পুরুষের চোখ বড়, ঠোঁট মোটা ও তার দুই পাশে থাকা চিতাবাঘগুলোর দাঁত বের করা। অন্য পুরুষটির বাঁ হাতে ছয়টি আঙুলের মতো অবয়ব দেখা যায়।
২০২২ সালে প্রত্নতত্ত্ববিষয়ক সাময়িকী অ্যান্টিকুইটিতে (Antiquity) প্রকাশিত গবেষণায় ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক ও খননকাজের প্রধান আইলেম ওজদোগান এটিকে পাথরে খোদাই করা বিশ্বের প্রাচীনতম বর্ণনাধর্মী দৃশ্যগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, অন্যান্য প্রাচীন স্থানে প্রাণী ও মানুষের পৃথক অবয়ব দেখা গেলেও সায়বুরচের খোদাইয়ে একাধিক চরিত্রকে একই কাহিনির অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
দৃশ্যটির প্রকৃত অর্থ অবশ্য এখনো অজানা। কেউ মনে করেন, এটি মানুষ ও হিংস্র প্রাণীর সংঘাতের চিত্র। অন্যদের ধারণা, এতে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আনুষ্ঠানিকতা, উর্বরতা কিংবা টিকে থাকার সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে। তবে ওজদোগানের মতে, এর নির্দিষ্ট কাহিনি নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব নয়। বরং এসব চিত্র প্রাচীন জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত স্মৃতি, বিশ্বাস ও সামাজিক নিয়ম বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
মরদেহ সমাহিত করার রীতিও গবেষকদের আগ্রহের বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে বসতঘরের মেঝের নিচে মরদেহের কবর দেওয়া হতো। কোথাও মানুষের হাড়ের সঙ্গে পাওয়া গেছে প্রাণীর হাড়। অন্যদিকে, মুখ বন্ধ বা সেলাই করা অবস্থায় দেখানো একটি ক্ষুদ্র মানবমূর্তি আবিষ্কারের পর প্রাচীন মানুষের মৃত্যু-সম্পর্কিত বিশ্বাস নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
এই অঞ্চলের অন্যান্য প্রত্নস্থলে শকুনের পাশে মস্তকবিহীন মানুষের চিত্র পাওয়া যাওয়ায় গবেষকদের কেউ কেউ মরদেহ খোলা স্থানে রেখে পাখির মাধ্যমে মাংস অপসারণের বিশেষ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছেন। তবে এ ধারণা এখনো নিশ্চিত নয়।
সায়বুরচের স্তম্ভগুলোতেও মানুষের মুখ, বাহু, বেল্ট ও বিভিন্ন প্রাণীর অবয়ব খোদাই করা রয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, লিখিত ভাষার প্রচলন না থাকায় এসব প্রকাশ্য শিল্পকর্ম গল্প, ঐতিহ্য ও সামাজিক নিয়ম পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে ভূমিকা রাখত।
প্রাচীন এই জনপদের নিদর্শন সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এর ইতিহাস তুলে ধরতে সায়বুরচকে উন্মুক্ত জাদুঘরে রূপান্তরের পরিকল্পনা চলছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের আশা, উদ্যোগটি মানবসভ্যতার প্রাচীন ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে আরও গভীরভাবে জানার সুযোগ তৈরি করবে।