পৃথিবীর নিকট প্রতিবেশী মঙ্গলের চাঁদ ফোবোস থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে বিশ্বের প্রথমবার মহাকাশযান পাঠাচ্ছে জাপান। এই মিশন চলবে ৫ বছর ধরে। এই মিশনটি কীভাবে আলুর মতো গঠনের ফোবোস ও এর ছোট সঙ্গী ডিমোস গঠিত হয়েছিল সে বিষয়ে ক্লু দেবে এবং সৌরজগতে জীবনের উৎপত্তি সম্পর্কেও আলোকপাত করবে বলে বিজ্ঞানীরা আশা করছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, জাপান অ্যারোস্পেস এক্সপ্লোরেশন এজেন্সি (জাক্সার) নতুন রকেট এইচ৩–এর মাধ্যমে আগামী মঙ্গলবার এই মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
এই বিষয়ে মার্শিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন (এমএমএক্স) মিশনের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ইয়াসুহিরো কাওয়াকাতসু বলেছেন, ফোবোস থেকে পাওয়া নমুনাগুলো বিজ্ঞানীদের মঙ্গলে ভবিষ্যতের কোনো মানববাহী মিশনের জন্য গ্রহটির একটি চাঁদকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করার বিষয়টি বিবেচনা করতে উপযোগী ডেটা সরবরাহ করবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও অন্যান্য দেশ মঙ্গলে মহাকাশচারী পাঠানোর আশা করছে। কাওয়াকাতসু বলেন, ‘এত সব সম্ভাব্য গুরুত্ব সত্ত্বেও মঙ্গল গ্রহের চাঁদগুলো নিয়ে কখনোই পুরোপুরি গবেষণা করা হয়নি। এগুলো সৌরজগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অজেয় পাহাড় হিসেবে পরিচিত।’
জাপান এই আন্তর্জাতিক মিশনটির নেতৃত্ব দিচ্ছে। তবে এই মিশনে নাসা এবং অন্যান্য জাতীয় মহাকাশ সংস্থার সরঞ্জাম ও যোগাযোগের সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ১৯৬০-এর দশক থেকে মঙ্গলে ডজন ডজন মিশন পাঠানো হয়েছে, কিন্তু এর চাঁদগুলো মূলত রহস্যই রয়ে গেছে। ২০১১ সালে শুরু হওয়া একটিসহ ফোবোসে অবতরণের একাধিক রুশ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
একটি মূল প্রশ্ন হলো এগুলো কীভাবে গঠিত হয়েছে এবং কী দিয়ে তৈরি। কিছু বিজ্ঞানীর মতে, এই দুটি অনিয়মিত ও খাদে ভরা বস্তু মঙ্গল গ্রহে কোনো বড় মহাজাগতিক বস্তু আছড়ে পড়ার পর তৈরি হওয়া ধ্বংসাবশেষের অবশিষ্টাংশ হতে পারে। অন্যরা বলছেন, চাঁদগুলো অন্য কোথাও থেকে আসা গ্রহাণু হতে পারে।
জাক্সার কর্মকর্তারা মনে করেন ফোবোস থেকে পাওয়া নমুনাগুলো এর উত্তর দেবে। মিশনের প্রধান গবেষক কিয়োষি কুরামোতো বলেছেন, ‘আমরা মাটি বিশ্লেষণ করে প্রায় নিশ্চিতভাবেই একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারব।’ বিজ্ঞানীরা মূলত ডিমোসের চেয়ে ফোবোসকে মঙ্গলের কাছাকাছি থাকার কারণে নমুনা সংগ্রহের জন্য বেছে নিয়েছেন, যার ফলে এই চাঁদটিতে গ্রহটি সম্পর্কে আরও বেশি তথ্য থাকতে পারে। জাক্সার কর্মকর্তাদের মতে, ফোবোস থেকে সংগৃহীত উপাদানের প্রায় শূন্য দশমিক ১ শতাংশ মঙ্গল গ্রহের উপাদান হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
ফোবোসের প্রশস্ততম বিন্দুতে এর ব্যাস প্রায় ২৭ কিলোমিটার (১৭ মাইল) এবং এটি প্রতিদিন তিনবার প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার (৩ হাজার ৭০০ মাইল) দূরত্বে মঙ্গল গ্রহকে প্রদক্ষিণ করে। কুরামোতো বলেন, ফোবোস থেকে সংগৃহীত নমুনা ডিমোসের উৎপত্তি সম্পর্কেও আলো ফেলতে পারে, কারণ দুটি চাঁদের উৎস একই বলে বিশ্বাস করা হয়। এই মিশনে ডিমোসের পাশ দিয়ে উড়ে গিয়ে তা পর্যবেক্ষণ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
লাল গ্রহে পৌঁছানো একটি দীর্ঘ যাত্রা হবে, যা পৃথিবী থেকে এর নিকটতম বিন্দুতে ৫৫ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। প্রকৃত ফ্লাইট দূরত্ব হবে ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন কিলোমিটার। এইচ ৩ রকেটে উৎক্ষেপণের পর মহাকাশযানটি ২০২৭ সালের আগস্টের কাছাকাছি সময়ে মঙ্গল অঞ্চলে পৌঁছাবে। এরপর এটি ডেটা এবং নমুনা সংগ্রহের জন্য তিন বছর ধরে ফোবোসের কাছাকাছি এবং চারপাশে উড়বে, এবং ২০৩১ সালে বাড়ি ফিরে আসবে।
এমএমএক্স তিনটি মডিউল নিয়ে গঠিত—প্রোপালশন (চালিকাশক্তি), এক্সপ্লোরেশন (অন্বেষণ) এবং রিটার্ন (প্রত্যাবর্তন)। কেবল তৃতীয় মডিউলটিই নমুনা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসবে। মহাকাশযানটিতে ১৩টি যন্ত্র থাকবে, যার মধ্যে ফ্রান্স ও জার্মানির যৌথভাবে তৈরি একটি রোভার রয়েছে যা চাঁদে অবতরণ করবে, পাশাপাশি একটি নাসা স্যাম্পলিং ডিভাইস ও গামা রশ্মি পরিমাপের যন্ত্র এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ডিপ স্পেস কমিউনিকেশন ডিভাইস থাকবে। একটি জাপানি রেডিয়েশন মনিটর এমন ডেটা সংগ্রহ করবে যা ভবিষ্যৎ মানববাহী মঙ্গল অভিযানকে সাহায্য করতে পারে।
ফরাসি-জার্মান রোভার আইডফিক্স প্রথমে ফোবোসে অবস্থান করবে। ২০২৯ সালের দিকে ১০০ দিনের একটি মিশনে, এটি জাপানিদের পরবর্তী মাটি সংগ্রহের কাজে সাহায্য করার জন্য পৃষ্ঠভাগ অন্বেষণ করবে। রোভার কর্তৃক প্রদত্ত টপোগ্রাফিক্যাল ডেটার ওপর ভিত্তি করে মহাকাশযানটি অবতরণের জন্য অপেক্ষাকৃত মসৃণ ও সমতল জায়গা বেছে নেবে।
একবার এমএমএক্স মিশন অবতরণ করলে, জাক্সার বিজ্ঞানীরা মার্কিন ও জাপানি পদ্ধতি ব্যবহার করে দুটি স্যাম্পলিং প্রচেষ্টার মাধ্যমে চাঁদ থেকে অন্তত ১০ গ্রাম (শূন্য দশমিক শূন্য ৩৫ আউন্স) মাটি সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন।
নাসার স্যাম্পলিং ডিভাইসটি পৃষ্ঠের ধূলিকণা একটি পাত্রে তুলতে উত্তপ্ত গ্যাস ব্যবহার করে এবং জাক্সার কোরিং পদ্ধতি প্রায় ২ সেন্টিমিটার গভীরতা থেকে নমুনা সংগ্রহ করবে। প্রথম প্রচেষ্টায়, এমএমএক্স উভয় পদ্ধতি ব্যবহার করে ভূপৃষ্ঠ এবং ভূগর্ভস্থ নমুনা সংগ্রহ করবে এবং দ্বিতীয় অবতরণে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ নমুনা নেবে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, একাধিক স্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ করলে মঙ্গল গ্রহ থেকে অতীতে অণুজীবের জীবনের কোনো সম্ভাব্য চিহ্ন পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
খাদে ভরা এই চাঁদে অবতরণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যার মাধ্যাকর্ষণ শক্তির পরিমাণ পৃথিবীর মাত্র দুই-হাজারী অংশ। স্পর্ষ করার সময় বাউন্সিং বা লাফিয়ে ওঠা কমানোর জন্য, এমএমএলের অন্বেষণ মডিউলটি শক অ্যাবজর্ভেশন বৈশিষ্ট্যযুক্ত চার পায়ের ল্যান্ডিং গিয়ার দিয়ে সজ্জিত।
জাক্সার মতে, রোভারটির এমন চাকা রয়েছে যা কম মাধ্যাকর্ষণে ট্র্যাকশন পেতে পারে, উল্টে গেলে নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যেতে পারে এবং ‘শামুকের গতিতে’ চলতে পারে। নমুনাগুলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ সহ্য করার জন্য ডিজাইন করা তাপ-সুরক্ষিত ক্যাপসুলে সংরক্ষণ করা হবে। মডিউলটি জাপানে ফেরত পাঠানোর আগে অস্ট্রেলিয়ায় অবতরণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।