১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই। চন্দ্রজয়ে যাত্রা শুরু হয় মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার অ্যাপোলো-১১ চন্দ্রযানের। তারপর ২০ জুলাই চাঁদের মাটিতে প্রথম মানুষ হিসেবে পা রাখেন নিল আর্মস্ট্রং। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মানুষের আরেক সফলতা ইতিহাস তৈরি হয়।
চাঁদের সঙ্গে মানুষের এই সখ্যতা বেড়েছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। ১৯৭২ সালে আবারও চাঁদের বুকে পা পড়ে মানুষের। এরপর পেরিয়ে গেছে বহু সময়। ৫৩ বছর পর চাঁদের উদ্দেশে মানুষের যাত্রা শুরু হয়েছে আবার।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য থেকে ‘আর্টেমিস-২’ মহাকাশ মিশনের সফল উৎক্ষেপণ সম্পন্ন হয়েছে। চারজন নভোচারী নিয়ে চাঁদের উদ্দেশে যাত্রা করেছে নাসার এই মহাকাশযান।
চাঁদে মানুষের প্রত্যাবর্তন এবং পরবর্তী সময়ে মঙ্গলে নভোচারী পাঠানোর যে পরিকল্পনা নাসার রয়েছে, তার পথে এটি একটি বড় পদক্ষেপ।
ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরালে নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে ৩২ তলা উচ্চতার রকেটটি যখন আকাশে ওড়ে, তখন সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে সেখানে জড়ো হয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ।
আর্টেমিস-২ মিশনে থাকা চার নভোচারী হলেন—নাসার রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন। চাঁদকে প্রদক্ষিণ করে ফিরে আসার ১০ দিনের এই যাত্রায় তাঁরা কয়েক দশকের মধ্যে মহাকাশের সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানে ভ্রমণ করবেন।
উৎক্ষেপণ পরিচালক চার্লি ব্ল্যাকওয়েল-থম্পসন বলেন, ‘এই ঐতিহাসিক মিশনে আপনারা সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন আর্টেমিস টিমের হৃদয়, মার্কিন জনগণের অদম্য সাহস এবং বিশ্বজুড়ে আমাদের অংশীদারদের প্রেরণা। সেই সঙ্গে একটি নতুন প্রজন্মের আশা ও স্বপ্নও আপনাদের সঙ্গে রয়েছে। শুভকামনা আর্টেমিস-২। এগিয়ে চলো।’
রকেট ওড়ার মাত্র পাঁচ মিনিটের মাথায় কমান্ডার ওয়াইজম্যান তাঁর লক্ষ্যবস্তু দেখতে পেয়ে ক্যাপসুল থেকে বলেন, ‘আমরা সুন্দর একটি চন্দ্রোদয় দেখছি, আমরা ঠিক সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছি।’
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে এই উৎক্ষেপণের সময়টি তুলে ধরা হয়েছে এভাবে, উৎক্ষেপণের আগের সময়গুলো ছিল চরম উত্তেজনার। রকেটে হাইড্রোজেন জ্বালানি ভরার সময় কিছুটা উদ্বেগ কাজ করছিল। কারণ চলতি বছরের শুরুতে একটি পরীক্ষা চলাকালীন বিপজ্জনকভাবে হাইড্রোজেন লিক হওয়ায় এই মিশনে দীর্ঘ বিলম্ব হয়েছিল।
তবে নাসাকে স্বস্তি দিয়ে এবার কোনো উল্লেখযোগ্য হাইড্রোজেন লিক পাওয়া যায়নি। উৎক্ষেপণ দল সফলভাবে ৭ লাখ গ্যালনেরও (২৬ লাখ লিটার) বেশি জ্বালানি স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এসএলএস) রকেটে লোড করে। পুরো প্রক্রিয়াটি নির্বিঘ্নে হওয়ায় আর্টেমিস-২-এর নভোচারীদের জন্য বোর্ডিং করার পথ প্রশস্ত হয়।
রকেট ছাড়ার আগে নাসাকে বেশ কিছু কারিগরি ত্রুটিও মোকাবিলা করতে হয়েছে। তবে বড় কোনো বিলম্ব ছাড়াই সেগুলো সমাধান করা সম্ভব হয়। একটি সমস্যা ছিল রকেটের ‘ফ্লাইট টার্মিনেশন সিস্টেম’-এর কমান্ড পাওয়া নিয়ে। রকেটটি যদি দিক পরিবর্তন করে জনবসতিপূর্ণ এলাকার দিকে যাওয়ার উপক্রম হয়, তবে এই সিস্টেমটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রকেট ধ্বংস করে দেওয়ার সংকেত পাঠাতে সক্ষম।
নাসার তথ্য অনুযায়ী, সমস্যাটি দ্রুত সমাধান করা হয়। এছাড়া ওরিয়ন ক্যাপসুলের ‘লঞ্চ-অ্যাবোর্ট সিস্টেমে’র একটি ব্যাটারির তাপমাত্রা স্বাভাবিক সীমার নিচে নেমে যাওয়ায় প্রকৌশলীরা সেটিও মেরামত করেন। এসব ঝামেলার কোনোটিই শেষ পর্যন্ত উৎক্ষেপণে বাধা হতে পারেনি।
নভোচারীরা প্রথম এক থেকে দুই দিন পৃথিবীর উচ্চ কক্ষপথে অবস্থান করে রকেটের বিভিন্ন সিস্টেম পরীক্ষা করবেন। এর মধ্যে রয়েছে ওরিয়নের লাইফ-সাপোর্ট, চালিকাশক্তি, নেভিগেশন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। এই সিস্টেমগুলো গভীর মহাকাশ ভ্রমণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত কি না, তা যাচাই করাই এর লক্ষ্য।
সবকিছু ঠিক থাকলে ওরিয়ন রকেটের ইঞ্জিন সচল করবে, যা ‘ট্রান্সলুনার ইনজেকশন’ নামে পরিচিত। এটি মহাকাশযানটিকে পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে চাঁদের কক্ষপথের দিকে ঠেলে দেবে।
চাঁদের দিকে যাত্রায় কয়েক দিন সময় লাগবে। এ সময় নভোচারীরা পৃথিবী থেকে ক্রমে দূরে যাওয়ার পাশাপাশি মহাকাশযানের সিস্টেমগুলো পর্যবেক্ষণ করবেন।
এরপর ওরিয়ন চাঁদের পেছনের অংশ দিয়ে একটি ‘ফ্রি-রিটার্ন ট্রাজেক্টরি’ অনুসরণ করে উড়বে। এটি এমন এক পথ, যেখানে চাঁদ ও পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ব্যবহার করে জ্বালানি খরচ কমিয়ে মহাকাশযানটিকে প্রাকৃতিকভাবে পৃথিবীর দিকে ফিরিয়ে আনা হয়। এই ধাপেই নভোচারীরা পৃথিবী থেকে তাদের সর্বোচ্চ দূরত্বে পৌঁছাবেন।
চাঁদ প্রদক্ষিণ শেষে নভোচারীরা পৃথিবীতে ফিরে আসতে আরও কয়েক দিন সময় নেবেন। ফেরার পথেও বিদ্যুৎ সরবরাহ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণসহ গভীর মহাকাশে কাজ করার বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষা চালানো হবে।
ওরিয়ন যখন পৃথিবীর কাছাকাছি পৌঁছাবে, তখন বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় এর গতিবেগ থাকবে ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হাজার ২৩৩ কিলোমিটার (২৫ হাজার মাইল)। সবশেষে এটি প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ (স্প্ল্যাশ ডাউন) করবে, যেখান থেকে উদ্ধারকারী দল নভোচারীদের নিয়ে আসবে।
সবশেষ অ্যাপোলো মিশনের সময় বিশ্বের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক মানুষেরই জন্ম হয়নি। সে কারণে আর্টেমিসকে নতুন প্রজন্মের চন্দ্রাভিযান হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
নাসার সায়েন্স মিশন প্রধান নিকি ফক্স চলতি সপ্তাহের শুরুতে বলেন, “অনেকেই আছেন যাদের অ্যাপোলো অভিযানের কথা মনে নেই। এমন একটি প্রজন্ম এখন আছে, যারা অ্যাপোলোর সময় জন্মই নেয়নি। এটিই তাদের ‘অ্যাপোলো’।”