হোম > রাজনীতি

দুই লক্ষ্য নিয়ে তৃণমূলে শক্তি বাড়াতে তৎপর এনসিপি

অর্চি হক, ঢাকা 

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থী দেওয়ার এবং মাঠের রাজনীতিতে সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রমাণের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের গড়া রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এ জন্য তৃণমূলে সংগঠন শক্তিশালী করতে তৎপর হয়েছে দলটি। এর অংশ হিসেবে দুই বিভাগে সমন্বয় সভা ও রাজনৈতিক কর্মশালা করা হয়েছে।

এনসিপির সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন গোছাতে জোর দেওয়া হয়েছে। দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তৃণমূলে ধাপে ধাপে সাংগঠনিক কাঠামো বিস্তারের পরিকল্পনা করেছেন দলের নীতিনির্ধারকেরা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মসূচি জোরদারের লক্ষ্যও রয়েছে। চলতি সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশের সব উপজেলায়, অক্টোবরের মধ্যে সব পৌরসভায় এবং নভেম্বরের মধ্যে ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি গঠনের কাজ শেষ করতে চায় এনসিপি। আগামী বছরের এপ্রিলের মধ্যে দেশের প্রতিটি ওয়ার্ডে কমিটি গঠনের লক্ষ্যও রয়েছে। গত ২৮ আগস্ট দেশের ইউনিটগুলোকে উপজেলা কমিটি গঠনের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে সাংগঠনিক নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এনসিপির দায়িত্বশীল নেতারা জানান, জেলা ও মহানগরের ৮০টি সাংগঠনিক ইউনিটের ৭৬টিতে আহ্বায়ক কমিটি রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ের ৫০০ ইউনিটের মধ্যে ৩৬৬টিতে কমিটি গঠন করা হয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাকি উপজেলাগুলোতেও আহ্বায়ক কমিটি গঠনের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ কমিটি সম্ভব না হলে ১১ থেকে ১৫ সদস্যের আংশিক আহ্বায়ক কমিটি করে পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে ৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন, অক্টোবরের মধ্যে ৩৩০টি পৌরসভায় আহ্বায়ক কমিটি গঠনের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। নভেম্বরের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ ইউনিয়নে সাংগঠনিক কমিটি গঠন এবং একই সময়ে এনসিপি-সমর্থিত ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী ঘোষণার কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

উপজেলা পর্যায়ে নেতৃত্ব বাছাইয়ের কিছু মানদণ্ড ঠিক করেছে এনসিপি। দলীয় নির্দেশনায় বলা হয়েছে, উপজেলা আহ্বায়কের বয়স ৪০ বছরের বেশি এবং সদস্যসচিবের বয়স ৩৫ বছরের বেশি হলে ভালো। তবে কোনোভাবেই ৩০ বছরের কম বয়সী কাউকে সদস্যসচিব করা যাবে না। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের আহ্বায়ক বা সদস্যসচিব পদে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি নিজ এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা, পরিচিতি, নেতৃত্বের সক্ষমতা, দলের প্রতি আনুগত্য ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিকে গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। কমিটিতে অন্তত ৫ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় ধর্মীয় ও জাতিগোষ্ঠীগুলোর আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের কথাও বলা হয়েছে।

তৃণমূলে সংগঠন শক্তিশালী করতে গত ২১ আগস্ট থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগের ২২টি সাংগঠনিক ইউনিটে সমন্বয় সভা ও রাজনৈতিক কর্মশালা করেছে এনসিপি। দলের পলিটিক্যাল কাউন্সিলের সদস্য ও মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার বলেন, এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের ১৫টি এবং বরিশাল বিভাগের ৭টি সাংগঠনিক ইউনিট রয়েছে।

এসব সমন্বয় সভা তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের চাঙা করেছে বলে মনে করেন এনসিপির শীর্ষ নেতারা। সারজিস আলম বলেন, কর্মসূচির ফল ইতিমধ্যে পাওয়া শুরু হয়েছে। যেসব জেলা ও উপজেলায় সাংগঠনিক কমিটি ছিল না অথবা কার্যক্রম কিছুটা স্থবির ছিল, সেসব জায়গায় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

এনসিপির নেতারা বলছেন, তৃণমূলকে শক্তিশালী করতে এই তৎপরতা শুধু স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নয়, একই সঙ্গে গণ-আন্দোলনের প্রাথমিক প্রস্তুতিও চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান, এনসিপি থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত যুগ্ম সদস্যসচিব গাজী সালাউদ্দিন তানভীরকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগসহ আরও কয়েকটি ইস্যুতে দলটির নেতারা সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সর্বশেষ গত শুক্রবার দলের আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম ‘গণ-আন্দোলনের’ ইঙ্গিত দেন।

জানতে চাইলে সারজিস আলম বলেন, বিএনপি সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তাঁদের আপত্তি রয়েছে এবং এ কারণে রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির শক্ত অবস্থান তৈরি করা প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করছেন। তবে এনসিপির সাংগঠনিক তৎপরতার মূল দুই দিক হিসেবে তিনি সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি ও স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির কথাই বলেন।

দলের নেতারা বলছেন, প্রায় দেড় বছর আগে আত্মপ্রকাশ করলেও জাতীয় রাজনীতিতে এনসিপি গুরুত্বপূর্ণ দলগুলোর একটি। ফলে পুরোনো ও প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাই তাঁদের সাংগঠনিক শক্তিবৃদ্ধির কাজের পাশাপাশি সমান্তরালভাবে স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির কাজও করতে হচ্ছে। কেউ সাংগঠনিক গতিশীলতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করছেন, কেউ রাজনৈতিক কর্মশালা নিয়ে কাজ করছেন, আবার কেউ স্থানীয় নির্বাচনের প্রার্থী বাছাইয়ের বিষয় নিয়ে কাজ করছেন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জে ১৮ আগস্ট ছয় মাস মেয়াদি আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন করেছে এনসিপি। গত বছরের ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় চারজন নিহত হওয়ার পর সেখানে সাংগঠনিক কাঠামো করাকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে মনে করছে এনসিপি।

এ বিষয়ে সারোয়ার তুষার বলেন, পলাতক ও পতিত লীগের অব্যাহত হুমকি থাকা সত্ত্বেও গোপালগঞ্জে আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন করেছে এনসিপি। শিগগির গোপালগঞ্জের উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি দেওয়া হবে। গোপালগঞ্জ মানেই আওয়ামী লীগ, এনসিপি এই মিথ ভেঙে দেবে। গোপালগঞ্জের সাধারণ জনগণের পাশে থাকবে এনসিপি।