জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) ও সংসদ সদস্য (এমপি) হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, বিএনপির মুখে জুলাই, কিন্তু অন্তরে আওয়ামী লীগ—এমন একটি সম্পর্ক দেশের রাজনীতিতে অস্বস্তি তৈরি করেছে। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে নির্যাতন, মামলা ও কারাবরণের শিকার বিএনপি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ৫ আগস্টের পর বিএনপিতে আসা নতুন অংশের পার্থক্য রয়েছে।
আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত ‘জুলাই গণহত্যার বিচার: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান’ শীর্ষক আলোচনা সভায় হাসনাত আবদুল্লাহ এ কথা বলেন। এনসিপির জুলাই গণহত্যা ও গুমের বিচার পর্যবেক্ষণবিষয়ক কমিটি এই সভার আয়োজন করে।
বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে হাসনাত বলেন, সরকারকে ফিটনেসবিহীন গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এই গাড়ির চাকা ও ইঞ্জিন নেই। দক্ষ চালক হলেও এই গাড়ি গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না।
হাসনাত আবদুল্লাহর মতে, বিএনপি সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের পরিবর্তে ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবসা, দুর্নীতি ও আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের পথে হাঁটছে।
এমপি হাসনাত বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম, রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তন হবে। সবাই ন্যায়সংগতভাবে সমান আচরণ পাবেন। কিন্তু আমরা দেখলাম, শুধু চেয়ার পরিবর্তন হয়েছে। কেউ এমপি হয়েছেন, কেউ মন্ত্রী হয়েছেন, কেউ প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে অনেকের অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তন হয়নি।’
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনায় করা মামলাগুলোর তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আলোচনা না করে অনেক মামলায় বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। পরে এসব মামলাকে অর্থ আদায় ও আপস-বাণিজ্যের উপলক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
হাসনাতের অভিযোগ, মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় ধীরগতির কারণে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। তাঁর মতে, এসব মামলার দ্রুত তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দেওয়া ও বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া জরুরি।
এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ও এমপি আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, জুলাই গণহত্যার বিচারের কাজটি একটা দায়সারা ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। দুবাইয়ে বেনজীর আটক হলেন, সংসদে দাঁড়িয়ে ক্রেডিট নিল সরকার। পরে যখন বেনজীর ছাড়া পেলেন, তখন আর সরকার কিছু বলে না, একদম চুপ।
এমপি আল আমিন আরও বলেন, বিএনপি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার কী করবে, চাঁদাবাজি সামলাতেই কূল পায় না। সরকার বলছে তার দলে চাঁদাবাজের স্থান নেই। অথচ দলটিতে এক কোটি চাঁদাবাজ দিয়ে ভরা। চাঁদাবাজ বাদ দিলে দলের কেউ থাকবে না।
এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব হুমায়রা নূর বলেন, কয়েকজন অসাধু পুলিশ জুলাই গণহত্যার মামলার তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে। তারা একেকজন গাদ্দার। আবার কয়েক দিন আগে দেখা গেল, একটি মামলার রায় হলো, সেখানে সাজাপ্রাপ্ত সাতজনই পলাতক।
জুলাই শহীদ মাহমুদুর রহমান সৈকতের বোন সাবরিনা আফরোজ সেবন্তী বলেন, ‘আমি আমার ভাইয়ের হত্যায় যারা জড়িত, তাদের শাস্তি নিশ্চিত হোক, সে রকম বিচার চাই। আমার ভাইকে মারার পর সাংবাদিকেরা জিজ্ঞেস করেছিল—আমরা মামলা করব কি না, আমরা করিনি। ৫ আগস্টের পর মামলা করেছি, কারণ, এখন বিচার চাওয়া যায়। যে আমার ভাইকে খুন করেছে, তার কাছে তো বিচার চাইতে পারি না।’
এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক অ্যাডভোকেট আরমান হোসাইনের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন, ন্যাশনাল লইয়ার্স অ্যালায়েন্সের সদস্যসচিব এরশাদুল বারী খন্দকার, জুলাই ওয়ারিয়র্স অ্যালায়েন্সের সভাপতি ও আহত জুলাই যোদ্ধা সালমান হোসেন প্রমুখ।