ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা না হলেও ইতিমধ্যে অধিকাংশ ইউপির চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে সংসদে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। এই নির্বাচনে ভালো ফল করতে কয়েক মাস আগে থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের পক্ষে স্থানীয় পর্যায়ে প্রচার চালাচ্ছেন দলটির নেতা-কর্মীরা। তবে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে এবং নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ থাকা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে দলের নীতিনির্ধারকদের। এরপরও মাঠ গোছাচ্ছে দলটি।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ গতকাল মঙ্গলবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, নির্বাচন কমিশন একভাবে আগায়, সরকার আরেক দিকে আগায়।’
দলটির আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেভাবে দলীয় লোক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তা সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বড় অন্তরায়। তাঁরা এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সুবিধা নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। এসব বিষয় সুষ্ঠু নির্বাচন, নিরপেক্ষতা এবং ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বজায় রাখার ক্ষেত্রে বড় হুমকি।
অবশ্য নেতারা এসব শঙ্কা জানালেও নির্বাচনের মাঠ গোছাচ্ছে জামায়াত। দলটির সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সময় থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয়েছে।
জাতীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের প্রচারে তাঁদের সামনে রাখা হয়েছিল, যাঁদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বাছাই করা হয়েছিল। জাতীয় নির্বাচনের পরপরই এসব সম্ভাব্য প্রার্থীর পক্ষে প্রচার শুরু করেন দলের নেতা-কর্মীরা। সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডকে প্রচারের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে অধিকাংশ জায়গায় প্রার্থী চূড়ান্ত করার কাজ শেষ হয়েছে। বাকিগুলোর প্রার্থীও শিগগির চূড়ান্ত হবে।
সূত্র আরও জানায়, স্থানীয় পর্যায়ে উঠান বৈঠক, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বাজার ও জনবহুল এলাকায় পথসভা, গণজমায়েত এবং লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে প্রচার চালানো হচ্ছে। এ ছাড়া প্রীতি ফুটবল ম্যাচ আয়োজন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা এবং নারীদের মধ্যে সেলাই মেশিন বিতরণের মতো কর্মসূচিও পালন করছেন দলটির নেতা-কর্মীরা। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা চলছে। তবে ইউনিয়নভেদে প্রার্থী চূড়ান্তকরণ ও প্রচার কার্যক্রমের গতিতে পার্থক্য রয়েছে।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, প্রায় চার-পাঁচ মাস আগেই জেলা ও মহানগরগুলোকে স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে প্রার্থী বাছাই করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে ৬০-৭০ ভাগ জায়গায় প্রার্থী ঘোষণা হয়ে গেছে এবং স্থানীয়ভাবে তাঁরা কাজও করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামায়াতের উপজেলা পর্যায়ের একজন নেতা আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমাদের উপজেলার প্রায় সব ইউপির চেয়ারম্যান ও মেম্বার প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে। দুই-এক জায়গায় এখনো আলোচনা চলছে। সেটাও আশা করি শিগগির চূড়ান্ত হয়ে যাবে। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী প্রচারকাজ চালাচ্ছি। এর মধ্যে প্রতিটি ইউনিয়নে বেশ কয়েকটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ আয়োজন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা, নারীদের মধ্যে সেলাই মেশিন বিতরণসহ নানা কর্মসূচি সম্পন্ন করেছি।’
জামায়াত সংসদ নির্বাচন জোটবদ্ধ হয়ে করলেও ইউপি নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনা রয়েছে। দলটির নেতাদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক শক্তি, প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা এবং ভোটারদের সমর্থনের পরিসর যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হবে। চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে নিজস্ব প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতির মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় অবস্থান আরও সুসংহত করতে চান তাঁরা।
এ বিষয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে হাজার আসনের বিষয়। কাজেই এখানে জোটের নির্বাচন সম্ভব নয়।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন পাওয়ার পেছনে দলের নারী কর্মীদের ভূমিকা ছিল বলে মনে করেন দলটির নেতারা। এ জন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতিতেও নারী কর্মীদের সক্রিয় রেখেছে জামায়াত। বিশেষ করে গ্রাম ও মহল্লায় ঘরে ঘরে গিয়ে নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ, সম্ভাব্য প্রার্থীদের পরিচিতি তুলে ধরা এবং তাঁদের পক্ষে প্রচার-প্রচারণা চালানোর কাজ করছেন তাঁরা।
জামায়াতের মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নুরুন্নিসা সিদ্দিকা আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের বোনেরা সারা বছরই মানুষের সঙ্গে আছেন, তাঁদের সুখ-দুঃখে পাশে থেকেছেন। জাতীয় নির্বাচনের মতো করে এখনো ঘরে ঘরে কাজ করছেন।’
সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘আসলে নির্বাচনের আবহ তৈরি হলেই তখন সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। এর আগে তো দলীয় প্রস্তুতির ব্যাপার থাকে, সেটা আমাদের চলছে। বাকিটা তো জনগণের সম্পৃক্ততার বিষয়।’