সাক্ষাৎকার

মশা নিয়ন্ত্রণে একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন

অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বাংলাদেশের অন্যতম মশা গবেষক ও কীটতত্ত্ববিদ। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক। মশা নিয়ে জাপানের কানাজাওয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন ‘জাপান সোসাইটি ফর দ্য প্রমোশন অব সায়েন্স’ (জেএসপিএস) পদক। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগসহ নানা বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার মাসুদ রানা।

কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি এবং ডেঙ্গুর মারাত্মক আকার ধারণ করার কারণ কী?

এডিস মশা যখন বাড়তে থাকে তখন যদি এটাকে নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তাহলে সেটা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের দেশে প্রথম ঢাকা শহর থেকে সারা দেশে বিস্তৃত হয়েছে। যখন যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে, তখন সেটা ঢাকা থেকে বিভিন্ন পরিবহনের মাধ্যমে এ মশা বিভিন্ন জেলা, উপজেলায় এমনকি গ্রাম পর্যায়ে চলে গেছে। উপযোগী পরিবেশ, গ্রামে বৃষ্টির পানি জমা হওয়া এবং মানুষ বিভিন্ন পাত্রে পানি জমিয়ে রাখার কারণে সেখানে ডিম পাড়ার সুযোগ পেয়েছে এবং সেখানেই তার বংশ বৃদ্ধি হয়েছে। এ কারণে কয়েক বছরের মধ্যে সারা দেশে এডিস মশার ঘনত্ব বেড়ে গেছে।

বিশ্বের অনেক দেশ সফলভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করলেও বাংলাদেশে মশকনিধন অভিযানে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না আসার মূল কারণ কী?

বিশ্বের অনেক দেশ মশা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে, কারণ সেসব দেশ সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার বিজ্ঞানভিত্তিক প্রয়োগ নিয়মিতভাবে করেছে। এডিস এবং কিউলেক্স—দুটি মশার প্রজাতিই আলাদা। তাদের প্রজনন আলাদা এবং তাদের আবাসস্থলও আলাদা। এ কারণে তাদের নিয়ন্ত্রণপদ্ধতিও আলাদাভাবে করতে হবে। যেটি পৃথিবীর অনেক দেশে করতে পেরেছে। ফলে তারা সফল হয়েছে। তারা কিন্তু আবার সারা বছর ধরে এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাটা সচল রেখেছে। ফলে তারা সফল হতে পেরেছে। যেটি হয়তো আমরা করতে পারিনি।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর বা সিটি করপোরেশনগুলোর গ্রহণ করা বর্তমান পদক্ষেপগুলোকে আপনি কতটুকু বৈজ্ঞানিক ও কার্যকর মনে করেন?

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে সিটি করপোরেশনগুলো চেষ্টা করছে, সেটা আমরা কিছুটা হলেও দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু সেই সঙ্গে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে, সেটাও দেখতে পাচ্ছি। তার মানে এটা প্রমাণ করে যে সিটি করপোরেশনসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যে কাজগুলো করছে, সেগুলো আসলে সঠিকভাবে হচ্ছে না। একজন গবেষক হিসেবে দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে এ বিষয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এডিস মশা যেসব জায়গায় জন্ম নিচ্ছে, বিশেষ করে নির্মাণাধীন ভবন, বহুতল ভবনের বেজমেন্ট, পার্কিং, বিভিন্ন মানুষের বাসাবাড়িতে পানি জমিয়ে রাখা পাত্রে, ওয়াসার মিটারের চৌবাচ্চায় এবং দুই বাড়ির মাঝখানের যে জায়গাটি থাকে, সেখানে আমরা প্রচুর এডিস মশার প্রজনন দেখতে পাই। এই জায়গাগুলোতে কি সত্যিকার অর্থে অভিযান পরিচালনা করা হয়? আমরা যখন অভিযান পরিচালনা করতে দেখি তখন দেখা যায় রাস্তাঘাট, ড্রেন বা নর্দমাকেন্দ্রিক জায়গাগুলোতে অভিযান করা হয়। কিন্তু অভিযানগুলো এডিস মশার প্রজননস্থল টার্গেট করে করা হয় না। যে কারণে ফলাফল আসছে না। আমি অনুরোধ করব, এডিস মশার প্রজননস্থলকে টার্গেট করে নজরদারির প্রাপ্ত ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে কাজগুলো করলে অবশ্যই ফলাফল পাওয়া যাবে।

সিটি করপোরেশনগুলোর নিয়মিত মশকনিধনে সঠিক কীটনাশক প্রয়োগ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি আছে কি? থাকলে সেটা কী রকম?

সিটি করপোরেশন যে কীটনাশকগুলো প্রয়োগ করে, তার মধ্যে অনেকগুলোই কার্যকরী। যেমন ম্যালাথিয়ন, টেমেফস ও নোভালুরন—এগুলো কার্যকরী। আবার অনেকগুলো কীটনাশক একেবারেই কার্যকরী না। যেমন ডেল্টামেথ্রিন অনেকে ব্যবহার করে, কিন্তু সেগুলো কোনোভাবেই কার্যকরী না।

আর কীটনাশক যতই কার্যকরী হোক না কেন, সেটা যদি সঠিক মাত্রায়, সঠিক স্থানে এবং সঠিক সময় পরপর প্রয়োগ না করা হয়, তাহলে সেটি কোনোভাবেই ভালো ফলাফল দেবে না। প্রত্যেকটি কীটনাশকের একটা মাত্রা আছে এবং সেটি নির্দিষ্ট সময় পরপর প্রয়োগ করতে হয়। এবং যে জায়গায় মশার প্রজননস্থল, সেখানেই প্রয়োগ করতে হবে। সেই জায়গা ও সেই বিষয়গুলোকে বিবেচনায় রেখে এবং যাঁরা কীটনাশক প্রয়োগ করেন, তাঁদের সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সঠিক প্রয়োগটা নিশ্চিত করা খুবই প্রয়োজন।

এডিস মশার প্রজাতিগত বিস্তার এবং আচরণগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের জাতীয় নিয়ন্ত্রণ নীতিমালাতে কী ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন?

আপনারা জানেন যে এডিস মশার দুটি প্রজাতি অন্যতম, যারা ডেঙ্গু ছড়ায়। একটি হলো এডিস এজিপ্টি, যারা ডেঙ্গুর প্রধান বাহক। এটি ৯৫ ভাগ ডেঙ্গু ছড়ানোর জন্য দায়ী। আর এডিস অ্যালবোপিক্টাস ডেঙ্গু ছড়ানোর জন্য দায়ী। এডিস এজিপ্টি মশাটি বাসাবাড়ি, বাসাবাড়ির আঙিনায় এবং আশপাশে প্রজনন করে। এটাকে অনেক সময় গৃহপালিত মশা বলা হয়ে থাকে। এটি মূলত বাড়ির আশপাশেই অবস্থান করে থাকে। আর তারা মানুষকে কামড়াতে খুব পছন্দ করে।

একটা সময় পর্যন্ত আমরা জানতাম যে এডিস মশা শুধু দিনে কামড়ায়। কিন্তু আমরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণা করে দেখেছি যে এডিস মশা রাতেও কামড়ায়। আমরা আরও জানতাম, এডিস মশা পরিষ্কার পানিতে জন্মায়। এটাও আমাদের গবেষণায় ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের গবেষণায় দেখতে পেয়েছি, এটা শুধু পরিষ্কার পানিতে নয়, নোংরা পানিতেও জন্মায়। নোংরা পানি যদি পাত্রে জমানো থাকে, তাহলে সেখানে এডিস মশা জন্মাতে পারে।

তাই এডিস মশা শুধু দিনে কামড়ায় ব্যাপারটি সঠিক নয়। এডিস মশা পরিষ্কার পানিতে জন্মায়, সেটাও সঠিক নয়। এ দুটি বিষয়কে মিলিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দিনে বা রাতে যখনই আমরা ঘুমাই না কেন, মশার কামড় থেকে দূরে থাকার জন্য মশারি ব্যবহার করতেই হবে।

গবেষণায় উঠে এসেছে যে সাধারণ জনগণ ডেঙ্গু প্রতিরোধে পুরোপুরি সম্পৃক্ত হচ্ছে না; জনগণকে এই লড়াইয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত করতে রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?

আমরা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিন বছর ধরে নজরদারি করছি মশা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। সেখানে আমরা দেখছি এডিশ মশা বাসাবাড়ির মধ্যে এবং আঙিনায় জন্মায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। তাই এখানে একটি জিনিস নিশ্চিত যে জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া অথবা কমিউনিটির সম্পৃক্ততা ছাড়া এডিস মশার নিয়ন্ত্রণ আসলেই কঠিন ব্যাপার। জনগণকে নিশ্চিত করতে হবে তাদের বাড়ি এবং বাড়ির আশপাশে এডিস মশা জন্মানোর জন্য পানি জমা যেন না থাকে সেটা নিশ্চিত করা। তবে এ কাজে সিটি করপোরেশন জনগণকে সম্পৃক্ত করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। তারা পুরস্কারের সঙ্গে জরিমানার ঘোষণাও দিতে পারে।

যদি কোনো ব্যক্তির বাসাবাড়িতে তিনবার অভিযান করার পরে সেখানে এডিস মশা পাওয়া যায়, তাহলে তাকে অবশ্যই জরিমানার আওতায় আনতে হবে। আবার কারও বাড়িতে তিনবার অভিযান করার পরে এডিস মশা পাওয়া না যায়, তাহলে তাকে পুরস্কৃত করতে হবে। এ বিষয়গুলো যদি মিডিয়ার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয় তাহলে জনগণ সম্পৃক্ত হবে বলে আমি মনে করি।

ডেঙ্গুকে কেবল বর্ষা বা নির্দিষ্ট মৌসুমের সমস্যা হিসেবে না দেখে বছরব্যাপী নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাষ্ট্রের কী ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার?

ডেঙ্গু এখন আমাদের সারা দেশের এবং সারা বছরের সমস্যা। তবে কয়েকটি মাস যেমন আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বেশ খারাপ থাকে। এর মধ্যে যখন ডেঙ্গু পরিস্থিতি কম থাকে, তখন যদি এডিস মশাকে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, তাহলে ডেঙ্গু যখন ভয়াবহ আকার ধারণ করে সেটি আর দেখা দেবে না। সেজন্য এপ্রিল, মে ও জুন—এই তিন মাস যদি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার কার্যক্রম গ্রহণ করা যায় এবং এটি যদি যথাযথভাবে কার্যকর করা যায়, তাহলে বাকি আগস্ট থেকে নভেম্বর—এই চার মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমে যাবে।

পাশাপাশি এডিস বা যেকোনো মশা নিয়ন্ত্রণে একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা দরকার। যার নেতৃত্বে থাকবেন একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ ব্যক্তি। যিনি মশা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ ও গবেষণা করেছেন, এমন একজন যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষকে নেতৃত্বে আনা দরকার। সেই প্রতিষ্ঠানটির নাম হতে পারে ‘ভেক্টর কন্ট্রোল রিসার্চ সেন্টার’। সেটার মাধ্যমে সারা দেশে মশা নিয়ন্ত্রণে কোন ধরনের কীটনাশক ব্যবহার হবে, সেগুলো কোনটি কত মাত্রায় ব্যবহৃত হবে, কত দিন পরপর ব্যবহৃত হবে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের একটি জাতীয় পরিকল্পনা, এডিস মশার নজরদারি, কীটনাশকের সহনশীলতা, নানা ধরনের পরীক্ষা ইত্যাদি নিয়ে বিস্তর গবেষণা করে রাষ্ট্রকে গাইড এবং পরামর্শ দেবে।

চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে এবং ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার সর্বনিম্নে নামিয়ে আনতে তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বত্র সরকার বা স্বাস্থ্য বিভাগের জরুরি ভিত্তিতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার?

ডেঙ্গু আক্রান্তের চাপ কমাতে হলে দরকার জনগণকে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে সম্পৃক্ত করা। এর সঙ্গে কমিউনিটির লোকজনকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। আবার দলীয় নেতা-কর্মীদেরও সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।

আর ডেঙ্গু থেকে মৃত্যু কমাতে প্রয়োজন পরীক্ষা। এ সময়টা যেহেতু ডেঙ্গুর মৌসুম, সেহেতু জ্বর হলেই ডেঙ্গুর পরীক্ষা করতে হবে। এবং একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে থাকতে হবে। কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। আর ডেঙ্গুর জন্য যেদিন থেকে জ্বর হবে, সেদিন থেকে হিসাব করে ৬, ৭ ও ৮ নম্বর দিনগুলো হলো ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় রোগীর জ্বর থাকে না, কিন্তু রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায় এবং রোগী মারা যায়। এজন্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রচুর তরল খাবার খেতে হবে এবং শরীরে তরলের ঘাটতি যাতে না হয়, সেজন্য নানা ধরনের তরল খেতে হবে, যাতে রোগীর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়।