সাক্ষাৎকার

অনেকেই মনে করছেন জুলাই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছে: ফাহমিদুল হক

ফাহমিদুল হক চলচ্চিত্র সমালোচক, গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ ও গল্পকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বার্ড কলেজের ফ্যাকাল্টি মেম্বার। একসময় যুগ্মভাবে ‘যোগাযোগ’ পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। সম্প্রতি তিনি ঢাকায় এসেছেন। এ সময় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে এর অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতার কারণ নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার মাসুদ রানা।

আমরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উদ্‌যাপন করছি, কিন্তু জনমনে এখন বড় প্রশ্ন—এই অভ্যুত্থান কি তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছে? সামগ্রিকভাবে এই গণ-অভ্যুত্থানের বিফলতা বা সীমাবদ্ধতাগুলো আপনি কীভাবে দেখেন?

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল বৈষম্যবিরোধী তথা কোটা সংস্কারের দাবির আন্দোলনের মাধ্যমে, যা পরবর্তী সময়ে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। শেখ হাসিনার পতনের পর মানুষ ‘বাংলাদেশ ২.০’ বা একটি নতুন ধরনের বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু দুই বছর পর জনমনে প্রশ্ন জেগেছে যে এই অভ্যুত্থান কি তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছে? বর্তমানে সাধারণ মানুষ চরম হতাশ এবং অনেকেই মনে করছেন এই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছে।

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা জামায়াতে ইসলামীর একক আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছিল। ইউনূস সরকার নীরবে বা প্রত্যক্ষভাবে তাদের উগ্রতাকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে, যা আগে তার চরিত্রে দেখা যায়নি। এ ছাড়া ইউনূস সরকারের ওপর আমেরিকান লবির প্রভাব ছিল, সেটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

তবে এই ব্যর্থতার জন্য সাধারণ জনতাকে দায়ী করা যাবে না। কারণ, তারা ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নিয়ে আন্দোলন সফল করেছিল। এর দায় মূলত রাজনৈতিক দলসমূহ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের, যারা অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

যেকোনো গণ-অভ্যুত্থানের সাফল্য ও ধারাবাহিকতা রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকার ওপর নির্ভর করে। জুলাই অভ্যুত্থানের সুফল ধরে রাখতে এবং এর পরবর্তী রূপান্তরে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট শক্তির ভূমিকা কেমন ছিল?

আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা নতুন রাজনৈতিক শক্তি যেমন নাহিদ ইসলাম ও অন্যান্যরা, যাঁরা পরবর্তী সময়ে এনসিপি গঠন করেন। তাঁরা রাজনৈতিক দল গঠনের শুরুতে মধ্যপন্থী বাংলাদেশের অঙ্গীকার করলেও, শেষ পর্যন্ত ডানপন্থী রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। ক্ষমতায় আসার পরপরই তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। তাঁরা পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক লুটেরা কাঠামোর খপ্পরে পড়ে যান এবং অর্থের হাতছানি এড়াতে পারেননি।

গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই জামায়াত পুরো আন্দোলনের কৃতিত্ব নিজেদের বলে দাবি করতে শুরু করে। যদিও তারা আওয়ামীবিরোধী শক্তির অংশ ছিল। কিন্তু আন্দোলনের সময় তাদের একক পরিচয় সামনে এলে আন্দোলনের সাফল্য নিয়ে সংশয় ছিল। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তারা আমলাতন্ত্র ও রাজনীতিতে নিজেদের পেশিশক্তি ব্যবহার করে ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করে। তারা জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে সংকুচিত করে ধর্মভিত্তিক ডানপন্থী রাজনীতির দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সেটা আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়টাতে দেখতে পেয়েছি।

জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোটবদ্ধ হওয়া এবং আদর্শিক বিচ্যুতি এনসিপির ভেতরেও বিভেদ তৈরি করে। ফলে মাহফুজ আলম, তাসনিম জারা ও তাজনূভা জাবীনের মতো অনেকেরই তাঁদের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে এবং তাঁরা এ দল থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

একটি বড় গণ-অভ্যুত্থানের পর যে কাঠামোগত পরিবর্তনের আশা করা হয়েছিল, তা রাজনৈতিক দলগুলোর হীন অ্যাজেন্ডা এবং দুর্নীতির কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সাধারণ মানুষ যে স্বপ্ন নিয়ে রাজপথে নেমেছিল, তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় পুরো জাতি এখন হতাশায় ভুগছে।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে একধরনের অনীহা দেখাচ্ছে বলে সমালোচনা আছে। সরকার কেন এই জুলাই সনদ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারছে না বলে আপনি মনে করেন?

বিএনপির প্রধান লক্ষ্য ছিল সংস্কারের চেয়ে দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা। এ কারণে তারা পুরো অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে সেভাবে কথা বলেনি।

বিএনপি সরকারের বর্তমান অবস্থান আমেরিকার লবির প্রতি বেশ খানিকটা নতজানু হয়ে রাজনীতি করছে বলে মনে হয়। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দায়িত্ব পালন করা খলিলুর রহমান নামের এক কর্মকর্তা কীভাবে এ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান? অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে আমেরিকার সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ ঠিকমতো রক্ষিত হয়নি। এ ছাড়া বিএনপি চীন ও ভারতের সঙ্গেও ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

তারেক রহমানকে আগের চেয়ে অনেক বেশি ‘লিবারেল’ বা উদারপন্থী এবং মার্জিত মনে হলেও, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পলিসির ক্ষেত্রে তাঁর সরকার হাসিনা বা খালেদা জিয়ার সরকারের মতোই পুরোনো ধারা বজায় রাখছে বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে।

জুলাই সনদে বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণ ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের যে প্রস্তাব ছিল, বিএনপি তা বাস্তবায়নে আগ্রহী নয়। কারণ, এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করলে তাদের অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা চর্চায় বাধা সৃষ্টি হতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা না হলে, দেশ আবার পুরোনো স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে পড়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে আগের মতোই দলীয় সমর্থক মানে সাদা দলের শিক্ষকদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। যদিও সেই সাদা দলের শিক্ষকদের কখনোই শেখ হাসিনার পুরো শাসনামলে এবং জুলাই আন্দোলনের সময় মাঠে সক্রিয় থাকতে দেখা যায়নি। আর একটি সফল গণ-অভ্যুত্থানের পর যে কাঠামোগত পরিবর্তনের (জুলাই সনদ) প্রয়োজন ছিল, বিএনপি নিজস্ব ক্ষমতা টেকসই করার লক্ষ্যে তা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

জুলাই আন্দোলন নিয়ে সম্প্রতি কেউ কেউ বলছেন, পুরোটাই মেটিকুলাস ডিজাইন ছিল? এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

এটা তো আওয়ামী লীগের বক্তব্য। কিন্তু আমি এটাকে কোনোভাবেই একটি পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বা ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ বলতে চাই না।

আমাদের স্মরণে থাকার কথা যে গণ-অভ্যুত্থানের অনেক আগেই আমেরিকার ভিসা নীতি এবং র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যা বিরোধী দলকে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছিল। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই অঞ্চলে আমেরিকার কৌশলগত স্বার্থ ছিল।

আগে আওয়ামী লীগ সরকারের মাধ্যমে ভারতের যে ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব ছিল, বর্তমানে আমেরিকার প্রভাব সেই পর্যায়ের নেই। ভারত যেমন প্রতিবেশী দেশ হিসেবে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারত, আমেরিকার সেই সক্ষমতা বা প্রয়োজন নেই। এ ছাড়া ভারত আগে হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখার জন্য আমেরিকাকে অনুরোধ করেছিল। এভাবেই তো ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন হয়েছিল। তাতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত দলগুলো ছাড়া অন্য কোনো দলই নির্বাচনে যায়নি। এর কয়েক মাস পরেই তো জুলাই মাসে কোটা সংস্কারের আন্দোলন শুরু হলো।

একপর্যায়ে সেই আন্দোলনে পুরো দেশের জনগণ যুক্ত হয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতন চায়। তারা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত হয়েছিল। জনগণের বিক্ষুব্ধতার কারণে হাসিনা সরকারের পতন অবশ্যম্ভাবী ছিল। আবার জুলাই আন্দোলনের পর তিনি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরেও তাঁর এই আন্দোলনের জন্য কোনো অনুশোচনা নেই এখন পর্যন্ত। শুধু কি হাসিনা, তাঁদের দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যেও কোনো ধরনের অনুশোচনা দেখা যাচ্ছে না।

কেউ কেউ ড. ইউনূসকেও এই আন্দোলনের নেপথ্যের নায়ক বলে থাকেন। কিন্তু ইউনূসের এই আন্দোলনে কোনো সক্রিয়তা দেখা যায়নি। তিনি বিদেশে তাঁর কাজ নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। আবার পুরো শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে তাঁকে বেশি ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে নিজের মামলা-মোকদ্দমার হাজিরা দিতে। তিনি সেই সময়ও মূলধারার রাজনীতির বাইরে ছিলেন।

আমার কাছে মনে হয়, জুলাই আন্দোলন সফল হওয়ার পেছনে একটি ভালো পরিকল্পনা ছিল। আন্দোলনের সময় বিশেষ করে, প্রথম সারির নেতারা (নাহিদ, আসিফ প্রমুখ) গ্রেপ্তার হওয়ার পর দ্বিতীয় সারির নেতারা যেভাবে আন্দোলন চালিয়ে নিয়েছেন, তা ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। এই স্তরে স্তরে নেতৃত্ব তৈরি রাখার ক্ষেত্রে জামায়াতের গাইডেন্স থাকতে পারে, সেটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৫২, ১৯৭১, ১৯৯০ কিংবা ২০২৪—প্রতিটি বড় আন্দোলনে দেশের মানুষ রক্ত ঢেলে দিয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই রক্তক্ষয়ী রাজপথের পর সাধারণ মানুষের কাঙ্ক্ষিত গুণগত ও কাঠামোগত পরিবর্তন আসে না কেন?

যেকোনো গণ-অভ্যুত্থানের পর দুটি পথ থাকে—হয় নতুন কোনো ভালো সময়ের সূচনা হবে, অথবা হতাশাজনক পরিস্থিতির তৈরি হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যক্রমে আমরা বারবার দ্বিতীয়টিই দেখে আসছি। তবে প্রতিটি আন্দোলনই জাতিকে কিছু শিক্ষা দিয়ে যায়।

এত হতাশার পরেও কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা তো বলতেই হবে। যেমন বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল এখন জানে যে আয়নাঘর বা গোপন বন্দিশালা আর কখনোই ফিরিয়ে আনা যাবে না। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে যেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে বাংলাদেশে সামরিক শাসন আর টিকবে না, তেমনি এই আন্দোলনও স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে একটি শক্ত বার্তা দিয়েছে। হাসিনার শাসনামলের শেষের দিকে মাত্রাতিরিক্ত লুটপাটের কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবারও যদি দেশে সামান্যতম গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসে, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াবে বলে আমি মনে করি।

শেষ পর্যন্ত আমি এ আন্দোলন নিয়ে পুরোপুরি হতাশ নই। আমি বিশ্বাস করি, যদিও আমরা যা পেয়েছি তা আমাদের প্রাথমিক আকাঙ্ক্ষার চেয়ে অনেক দূরে, তবু প্রতিটি অভ্যুত্থান আমাদের জাতীয় চিন্তা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কিছু না কিছু পরিবর্তন আনে, যা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

প্রাকৃতিক কৃষি বাঁচাতে পারে প্রকৃতির আত্মা

জ্ঞানচর্চার বিভিন্ন দিক

বিনিয়োগ হোক মানুষের সম্ভাবনায়

আল মাহমুদের কাব্য-উপলব্ধির সীমানা

একটি স্বপ্নের মৃত্যু

প্রাণবৈচিত্র্য, সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার

বিশ্বকাপ খেলার মাঠে ভূ-রাজনীতির কৌশল

সাম্বার ছন্দপতনে রাজনৈতিক মেরুকরণের দায়

বিশ্বকাপ ফুটবল সমাচার

ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার