হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত

সেঁজুতি মুমু

বাংলাদেশে কয়েক বছর ধরে আবহাওয়ায় রদবদল দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনার তথ্যে উল্লেখ আছে যে দেশটির গড় তাপমাত্রা প্রতি দশকে বাড়ছে। এবং যদি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো না হয় তাহলে ২১০০ সাল নাগাদ তা আরও বাড়বে, যার ফলে শীতের গড় তাপমাত্রা ও শীতের সুবিশাল প্রভাব (যেমন শৈত্যপ্রবাহ) কমে যেতে পারে। জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। শীতকালে কখনো বৃষ্টি হচ্ছে, কখনো তীব্র ঠান্ডা পড়ছে, কখনোবা শীতকালে শীত পড়ছে না বললেই চলে।

বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের ঋতুচক্র অনিয়মিত হয়ে পড়ছে। আগে শীত ছিল স্থিতিশীল, শুকনো ও ঠান্ডা। এখন শীতকালে উষ্ণ বাতাস ঢুকে পড়ছে, আবার হঠাৎ ঠান্ডা ঢেউ আসছে। ফলে কখনো শীত বেশি, কখনো কম, কখনো শীতই বোঝা যায় না। শীতকালে ভারত ও মধ্য এশিয়া থেকে আসা পশ্চিমা লঘুচাপ বাংলাদেশে ঢুকলে শীতকালে বৃষ্টি হয়, আকাশ মেঘলা থাকে, রাতের তাপমাত্রা কমে যায়। এ জন্য শীতকালে বৃষ্টি হওয়া এখন আর অস্বাভাবিক নয়।

কখনো কখনো হিমালয় অঞ্চল থেকে অত্যন্ত ঠান্ডা বাতাস নেমে আসে—উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তীব্র শীত পড়ে। তাপমাত্রা হঠাৎ অনেক কমে যায়। তখনই আমরা অতিরিক্ত ঠান্ডা অনুভব করি। আর্দ্রতা বেশি থাকলে শীত কম লাগে। বাংলাদেশে শীতকালে অনেক সময় বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকে। কুয়াশা থাকলেও প্রকৃত ঠান্ডা কম হয়। ফলে তাপমাত্রা কম হলেও শীত তেমন অনুভূত হয় না।

শহরাঞ্চলে কংক্রিট, রাস্তা, দালান তাপ ধরে রাখে। গাছপালা কম, তাই শহরে শীত কম লাগে, গ্রামে বেশি লাগে। এ কারণে একই সময়ে কোথাও শীত, কোথাও শীত নেই বলে মনে হয়। গাছপালা কমে যাওয়ায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা নষ্ট হচ্ছে। আবহাওয়া দ্রুত বদলে যাচ্ছে। শীতের স্বাভাবিক চরিত্র হারিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশগুলোর মধ্যে নয়, অথচ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘন ঘন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, তীব্র দাবদাহ ও শীতের অনিয়ম—সবকিছুই প্রমাণ করে জলবায়ু পরিবর্তন এখন বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতের নয়, বরং বর্তমানের সংকট। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তি—সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

প্রথমত, পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে, যা কার্বন নিঃসরণ বাড়ায়। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ ও জলবিদ্যুৎ ব্যবহারে জোর দিতে হবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ালে পরিবেশ রক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন একসঙ্গে নিশ্চিত করা সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, বন সংরক্ষণ ও ব্যাপক বনায়ন কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। বন উজাড় জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ। সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঢাল। উপকূলীয় বনায়ন বৃদ্ধি, পাহাড়ে নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ এবং শহরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। গাছ পরিবেশের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে জলবায়ু ভারসাম্য রক্ষা করে।

তৃতীয়ত, নদী, জলাশয় ও জলাভূমি রক্ষা করতে হবে। নদী দখল ও দূষণের ফলে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা নষ্ট হচ্ছে, যা বন্যা ও জলাবদ্ধতা বাড়াচ্ছে। নদী খনন, জলাশয় সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক খাল পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে জলবায়ু সহনশীল পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

চতুর্থত, নগরায়ণকে পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব করতে হবে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরে তাপমাত্রা বেশি থাকে, যা ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ সৃষ্টি করে।

পঞ্চমত, কৃষিতে জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। খরা সহনশীল ফসল, লবণাক্ত সহনশীল ধান, উন্নত সেচব্যবস্থা ও আধুনিক কৃষি পদ্ধতি প্রয়োগ করলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এতে খাদ্যনিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।

ষষ্ঠত, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব না হলেও ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, টেকসই বেড়িবাঁধ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

সপ্তমত, জনসচেতনতা ও শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে স্কুল-কলেজে পাঠদান, গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রচার এবং সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে হবে। ব্যক্তিপর্যায়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয়, প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, গাছ লাগানো—এসব ছোট উদ্যোগও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

সবশেষে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশকে বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিল পেতে কূটনৈতিকভাবে আরও সক্রিয় হতে হবে, কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের দায় উন্নত দেশগুলোর বেশি হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলো।

বাংলাদেশের অর্থনীতি: বর্তমান সমস্যা ও ভবিষ‍্যৎ অন্তরায়

‘কলি’র ক্রীতদাস

স্টারমার ও ৫০ ব্যবসায়ীর চীন সফরের অর্থনীতি

সুস্থ, সৎ ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা দরকার

আর কবে জামায়াত এমন সুযোগ পাবে

বন্ধ মুখ খোলার জন্য নির্বাচনের প্রয়োজন ছিল

যেমন বাংলাদেশ চাই

শিল্পকারখানার বর্জ্যদূষণ বন্ধ করা দরকার

অপরাপর ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি বাঙালিদের উপেক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি আছে

বামদের রাজনীতি কি মুমূর্ষু