হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বিশ্ব শিশুশ্রমবিরোধী দিবস

শিশুশ্রম শুধু অর্থনৈতিক নয়, নৈতিক সংকটও

আল শাহারিয়া

আইনি কাঠামো থাকার পরও মূলত সদিচ্ছার অভাবে শিশুশ্রম বন্ধ হচ্ছে না। ছবি: সৈয়দ মাহামুদুর রহমান

সকালের মিষ্টি রোদে যখন একদল শিশু পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে হাসিমুখে স্কুলের পথে হাঁটে, ঠিক তখন হয়তো সেই পথেই অন্য একটি শিশু কোনো চায়ের দোকানে কয়লার ধোঁয়ায় চোখ কচলাচ্ছে। এই দৃশ্য আমাদের ভীষণ চেনা। এতটাই চেনা যে ইদানীং এমন ঘটনা আমরা আমলেই নিই না। এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা হাতে নিয়ে আমরা হয়তো দেশের অর্থনীতি, বিশ্বরাজনীতি বা মানবাধিকার নিয়ে তুমুল আড্ডা জুড়ে দিই। অথচ যে ছোট হাতটি সেই চা আমাদের দিকে এগিয়ে দিল, তার দিকে মনোযোগ দেওয়ার মতো সময় আমাদের নেই। আমরা ধরে নিয়েছি দারিদ্র্যের কারণে এই শিশুটি কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। আমরা নিজেদের এই বলে সান্ত্বনা দিই যে শিশুটি কাজ না করলে তার পরিবারের সদস্যরা হয়তো না খেয়ে মারা যাবে। এই সহজ সমীকরণটি আমাদের নাগরিক বিবেককে চমৎকারভাবে শান্ত রাখে। কিন্তু সত্যিই কি বিষয়টি এত সহজ? শিশুশ্রম যতটা একটি অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা বা দারিদ্র্যের উপজাত, ততটাই সামগ্রিক সমাজের এক ভয়াবহ নৈতিক স্খলন এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়।

দারিদ্র্য নিঃসন্দেহে শিশুশ্রমের একটি বড় কারণ। অভাবের তাড়নায় অনেক মা-বাবা তাঁদের সন্তানদের কাজে পাঠাতে বাধ্য হন। পেটের তীব্র ক্ষুধা কোনো আইন বা নিয়ম মানতে চায় না। কিন্তু এই কঠিন বাস্তবতাকে পুঁজি করে যাঁরা প্রতিনিয়ত ফায়দা লুটছেন, তাঁদের কথা আমরা কতবার ভেবেছি? একজন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকের বদলে একজন শিশুকে কাজে রাখলে মালিকপক্ষের অনেক সুবিধা হয়। শিশুকে খুব সামান্য মজুরি দিলেই চলে। তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে জানে না। শ্রম অধিকারের মতো বিষয়গুলো তাদের কাছে সম্পূর্ণ অজানা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অমানবিক পরিশ্রম চাপিয়ে দিলেও তারা মুখ বুজে সব সহ্য করে নেয়। এই যে সস্তা শ্রমের প্রতি আমাদের সমাজের একশ্রেণির মানুষের দুর্নিবার লোভ, একে কি কোনোভাবেই শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা বলা চলে? মোটেই না। এটি একটি বিশুদ্ধ নৈতিক অবক্ষয়। মানুষের চরম অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে নিজের পকেট ভারী করার এই যে প্রবণতা, তা আমাদের মানবিকতার ভিত্তিমূল ধরে টান দেয়।

শহরের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই আরও বেশি ভয়াবহ। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই হয়তো চাকরি করেন। তাই ঘরের কাজ এবং নিজেদের সন্তানদের দেখাশোনার জন্য তাঁরা অত্যন্ত সচেতনভাবে গ্রাম থেকে ৮-১০ বছরের একটি ছোট মেয়েকে নিয়ে আসেন। নিজেদের আদরের সন্তানের দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে এমন একজনকে, যার নিজেরই এখন মায়ের উষ্ণ কোল প্রয়োজন। আমরা সেই গৃহকর্মী শিশুটিকে আমাদের পুরোনো জামাকাপড় বা উদ্বৃত্ত খাবার দিয়ে নিজেদের খুব দয়ালু ভাবতে শুরু করি। আমরা অবচেতনভাবেই মেনে নিয়েছি যে কিছু মানুষের জন্মই হয়েছে শুধু অন্যের সেবা করার জন্য। এই প্রবল বৈষম্যমূলক চিন্তা আমাদের নৈতিক দেউলিয়াত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

২০২৫ সালের জুন মাসে প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রায় ৩৫ লাখ শিশু শ্রমিক রয়েছে এবং ১০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। এই শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টিতে হাড়ভাঙা খাটুনিতে যুক্ত করা হয়। কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া, রাসায়নিক পদার্থের সরাসরি সংস্পর্শ কিংবা ভারী বোঝা টানার কারণে তারা খুব অল্প বয়সেই নানা রকম দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। তাদের শৈশবের আনন্দ, স্বাভাবিক কৌতূহল এবং সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নগুলো কারখানার অন্ধকূপে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাদের কাছ থেকে শৈশবের সরলতা খুব নির্মমভাবে কেড়ে নেয়। একটি রাষ্ট্র বা সমাজ যখন তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এত বড় একটি অংশকে এভাবে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়, তখন সেই সমাজের নৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা কেবল স্বাভাবিক নয়, বরং অপরিহার্য।

ক্রমাগত বঞ্চনা এবং শোষণের শিকার হওয়া এই শিশুদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে আমরা কজন মাথা ঘামাই? যখন তারা দেখে সমবয়সী অন্য শিশুরা সুন্দর সুন্দর পোশাক পরে গাড়িতে চড়ে স্কুলে যাচ্ছে, তখন তাদের ছোট্ট মনে ঠিক কী ধরনের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়? এই আকাশ-পাতাল বৈষম্য তাদের ভেতরে একধরনের চাপা ক্ষোভ ও তীব্র হতাশার জন্ম দেয়। এই ক্ষোভ কখনো কখনো তাদের অপরাধজগতের দিকে ঠেলে দেয়। আমরা তখন তাদের সমাজচ্যুত করার আয়োজন করি। কিন্তু একবারও ভেবে দেখি না যে এই সমাজই তাদের অপরাধী হওয়ার বীজ বপন করে দিয়েছিল তাদের চুরি যাওয়া শৈশবের দিনগুলোতে। আমরা তাদের হাতে কলমের বদলে হাতুড়ি তুলে দিয়েছিলাম।

শিশুশ্রম বন্ধ করার জন্য দেশে আইনের কোনো অভাব নেই। আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদে আমরা অনেক আগেই স্বাক্ষর করেছি। আমাদের একটি চমৎকার জাতীয় শিশুনীতি রয়েছে। সংবিধানেও শিশুদের অধিকার সুরক্ষার কথা খুব স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। এত সব আইনি কাঠামোর পরও কেন শিশুশ্রম বন্ধ হচ্ছে না? কারণ, আইন প্রয়োগের জন্য যে অটুট নৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন, আমাদের সেই সদিচ্ছার চরম অভাব রয়েছে। যাঁরা আইন প্রয়োগ করবেন, তাঁরাও এই সমাজ নামক কাঠামোরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিশুশ্রমকে যখন সামাজিকভাবে একধরনের প্রচ্ছন্ন গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে দেওয়া হয়, তখন শুধু পুলিশ বা প্রশাসন দিয়ে তা কখনোই বন্ধ করা সম্ভব হয় না।

অনেকেই যুক্তি দেখান সরকার তো বিনা মূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে। বছরের প্রথম দিনে নতুন বই দিচ্ছে। উপবৃত্তি দিচ্ছে। তাহলে কেন শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের ত্রুটিপূর্ণ আর্থসামাজিক কাঠামোর গভীরে। শুধু বই আর স্কুলভবন দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। একটি শিশুর সারা দিনের ন্যূনতম আহারের সংস্থান না হলে তার কাছে বইয়ের সুন্দর অক্ষরগুলো সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। তাই শিশুশ্রম বন্ধ করতে হলে সবার আগে প্রাপ্তবয়স্কদের কর্মসংস্থান এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তির আয় যদি সম্মানজনক হয়, তবে কোনো মা-বাবা তার সন্তানকে হাড়ভাঙা খাটুনিতে পাঠাতে চাইবেন না।

একটি সভ্যতার প্রকৃত মাপকাঠি আসলে কী? বড় বড় ইমারত, ঝকঝকে রাস্তাঘাট, উড়ালসেতু নাকি উন্নত প্রযুক্তি? একটি সমাজ ঠিক কতটা সভ্য, তা মূলত নির্ভর করে তারা তাদের সবচেয়ে দুর্বল এবং অসহায় অংশকে কীভাবে মূল্যায়ন করছে তার ওপর। সেই মানদণ্ডে বিচার করলে আমাদের মাথা নিচু হয়ে আসে লজ্জায়। আমরা এমন এক উন্নয়ন মডেল নির্মাণ করেছি, যেখানে পুঁজির দাপটে মানবিকতা প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছে। এই সংকটের সুদূরপ্রসারী প্রভাব আরও অনেক বেশি ভয়ংকর। শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত এই বিপুলসংখ্যক শিশু যখন বড় হয়, তখন তারা অদক্ষ শ্রমিক হিসেবেই থেকে যায়। তারা দেশের অর্থনীতিতে তেমন কোনো গুণগত অবদান রাখতে পারে না।

শিশুশ্রমকে কেবল দারিদ্র্যের অনিবার্য ফলাফল হিসেবে দেখার ভুল দৃষ্টিভঙ্গি অবিলম্বে বদলাতে হবে। এটিকে একটি মারাত্মক সামাজিক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। প্রতিটি শিশুর যথাযথ শিক্ষা এবং সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠার অধিকার নিশ্চিত করা কেবল রাষ্ট্রের নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। চায়ের দোকানে, গ্যারেজে বা বাসাবাড়িতে কাজ করা শিশুটির বিষণ্ন চোখের দিকে তাকিয়ে আমাদের ভাবতে শিখতে হবে, এই শিশুটির জায়গায় আমার নিজের সন্তান থাকলে আমি ঠিক কী করতাম। নয়তো আমাদের সব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং উন্নয়নের বড় বড় গল্প ওই অসহায় শিশুদের ঘামে এবং দীর্ঘশ্বাসে ভিজে এক চরম প্রহসন হয়েই থাকবে। শিশুশ্রমের অবসান কোনো দয়া নয়। এটি প্রতিটি শিশুর জন্মগত এবং ন্যায্য অধিকার। আর এই অধিকার সসম্মানে ফিরিয়ে দেওয়াই হোক আজ ১২ জুন, বিশ্ব শিশুশ্রমবিরোধী দিবসে আমাদের নৈতিক অঙ্গীকার।

সুখবর কি আছে কোনো

বাজেটের হিসাব নয়, মানুষ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা চায়

তেলাপোকাদের বিদ্রোহ কি ভারতে নতুন রাজনীতির জন্ম দিচ্ছে

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোন পথে

কী দেখেছি, আরও কী দেখব

স্কুল অ্যান্ড কলেজগুলোর গুণগত ‘অর্জন’

পাহাড় কাটা ও সজলদের জীবন

তেলাপোকার উত্থান ও তারুণ্যের ক্ষোভ

টিকার ট্রায়াল ও আফ্রিকার বিপন্ন শৈশব

এক্সপার্ট রিটায়ার্ড পিপলস পুল