হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

গবেষণার লক্ষ্য, বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা ও বাস্তব প্রয়োগ

মনিরুল ইসলাম 

মনিরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এখন শতাধিক। প্রতিবছর এখানে হাজারো গবেষণা হয়, যার বড় অংশের উদ্দেশ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ। নিঃসন্দেহে বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষকের মর্যাদা এবং বৈশ্বিক পরিচিতি বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই গবেষণাগুলোর কতগুলো দেশের অর্থনীতি, সমাজ বা মানুষের জীবনমান উন্নত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে?

গবেষণার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় এর প্রয়োগে। এমন গবেষণা, যা কৃষিতে নতুন জাতের ফসল এনে উৎপাদন বাড়ায়, শিল্পের মানোন্নয়ন ঘটায়, স্বাস্থ্যসেবাকে সাশ্রয়ী করে বা প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছে দেয়—এসবই দেশের জন্য প্রকৃত সম্পদ। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে সেতুবন্ধন আজও দুর্বল। ফলে অধিকাংশ গবেষণাই ল্যাব বা রিপোর্ট ফাইলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

বর্তমানে ব্যক্তিগত গবেষণায় অনুদান উৎসাহিত করা হয়, যার সুদূর প্রসারী প্রভাব কম এবং সমাজে যা খণ্ডিত প্রভাব ফেলছে। বরং বিভাগভিত্তিক বড় অর্থায়ন দিয়ে বছরে কয়েকটি উচ্চমানের, প্রয়োগযোগ্য গবেষণা প্রকল্প হাতে নেওয়া উচিত। এতে জুনিয়র–সিনিয়র শিক্ষক, গবেষক এবং শিক্ষার্থীরা যৌথভাবে কাজ করতে পারবেন, যা বাস্তবায়নযোগ্য ফলাফল মাঠ পর্যায়ে পর্যন্ত প্রয়োগ নিশ্চিত করবে, এমন গবেষণাকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত। এতে অর্থের অপচয় কম হবে এবং বাস্তবসম্মত কাজ হবে। গবেষণায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই কিছু প্রয়োগযোগ্য গবেষণার সফল উদাহরণ রয়েছে,যেমন, ধানের লবণাক্ততা সহনশীল জাত (BRRI dhan-67, dhan-97; BINA dhan-10,11,17): বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক এই উদ্ভাবন খুলনা ও সাতক্ষীরার লবণাক্ত উপকূলে ধানের উৎপাদন বাড়িয়েছে।

জুট পলিথিন ব্যাগ: বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জুট ফাইবার থেকে তৈরি এই ব্যাগ প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হয়েছে।

রোড কনস্ট্রাকশনে প্লাস্টিক বর্জ্যের ব্যবহার: কিছু প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাস্টিক বর্জ্য বিটুমিনের সাথে মিশিয়ে টেকসই রাস্তা নির্মাণ সম্ভব, যা ইতিমধ্যেই পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

কম খরচের সোলার চালিত সেচ পাম্প: কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় স্টার্টআপের যৌথ গবেষণায় তৈরি এই প্রযুক্তি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয় কমিয়ে দিচ্ছে।

এসব উদাহরণ প্রমাণ করে—গবেষণা যখন মাঠে পৌঁছায়, তখন তা অর্থনীতি ও সমাজে বাস্তব পরিবর্তন আনে।

বৈজ্ঞানিক গবেষণা পত্র প্রকাশ অবশ্যই জরুরি—এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপত্র এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মাধ্যম। তবে গবেষণাপত্র হবে গবেষণার স্বাভাবিক ফল, মূল লক্ষ্য নয়। আমাদের গবেষণার চূড়ান্ত গন্তব্য হওয়া উচিত দেশের সমস্যা সমাধান, মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা।

যেদিন বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি ও বাস্তব প্রয়োগ একসাথে চলবে—সেদিনই বাংলাদেশ গবেষণার প্রকৃত সুফল ভোগ করবে। আর সে পথ তৈরি হবে বিশ্ববিদ্যালয়, সরকার ও শিল্পখাতের সমন্বিত প্রচেষ্টায়।

আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। অনেক সময় গবেষণা ফান্ড বণ্টনে স্বজনপ্রীতি বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের প্রভাব দেখা যায়। প্রোপোজাল মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও পরিচিতজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, ফলে যোগ্য গবেষণা প্রকল্প প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পায় না।

গবেষণা সাধারণত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। একটি ধাপ শেষ হলে পরবর্তী ধাপের জন্য ফান্ডিং জরুরি; কিন্তু অনেক সময় ধারাবাহিক অর্থায়নের অভাবে গবেষণা মাঝপথে থেমে যায়। এ সমস্যার সমাধানে সরকারের উচিত—ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষককে নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গবেষণাগারে পর্যাপ্ত ফান্ড বরাদ্দ করা। সেখান থেকে ডিপার্টমেন্টের লক্ষ্য ও স্থানীয় সমস্যার ভিত্তিতে প্রকল্পে অর্থায়ন করা হবে।

গবেষণার মান বাড়াতে প্রতিটি ডিপার্টমেন্টের উচিত স্থানীয় সমস্যার সমাধানের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা, যা ধাপে ধাপে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রতিটি ধাপ সফলভাবে শেষ হলে পরবর্তী ধাপের জন্য নিশ্চিত ফান্ডিং প্রয়োজন।

নতুন ও সৃজনশীল গবেষণার ফলাফল পেটেন্ট করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা একটি দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউনিট থাকা দরকার। কারণ, একজন শিক্ষক তার নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি গবেষণা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং পেটেন্ট সংক্রান্ত কাজ একা করা বাস্তবসম্মত নয়।

এভাবে পরিকল্পিতভাবে গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ গড়ে তুললে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব কিছুর মধ্যে সমন্বয় হবে এবং আমরা সত্যিকার অর্থে একটি মানসম্পন্ন জাতি গঠনে অগ্রসর হতে পারব।

লেখক: মনিরুল ইসলাম

অধ্যাপক

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় দেশের জ্বালানি খাতকে ধ্বংস করা হয়েছে

নির্বাচন বড় মজার জিনিস

জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কি অস্বস্তিগুলো কাটল

প্রশ্নপত্র ফাঁস ও মেধাবীদের দীর্ঘশ্বাস

সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে কিছু কথা

পথের শেষ কোথায়, খেয়াল নেই

জাতীয় নির্বাচন এবং দুটি কথা

বিশ্ব কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে

অনেক কিছুই নির্ভর করছে সেনাবাহিনীর ওপর

আজকের জগৎটি অবিশ্বাস আর অনাস্থার