সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটা হয়তো অনেকেই দেখেছেন। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক ম্যাজিস্ট্রেট একজন টয়লেট অ্যাটেনডেন্ট ও আরেকজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে ক্যামেরার সামনে শাস্তি দিচ্ছেন, কান ধরে ওঠবস করাচ্ছেন। টয়লেট অ্যাটেনডেন্ট, পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে জনপরিসরে এমন লাঞ্ছনা করাই যায়—এরা শ্রমিক-কর্মচারী নন, এদের কোনো সমিতি-সংগঠন নেই। সরকারি ভাষায় এরা হচ্ছেন আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় ‘ক্রয়কৃত’ সেবা। ‘নিয়োগ’ নয়, ‘ক্রয়’ করা হয়। এই ক্রয়ের জন্য আবার সরকারি নীতিমালাও আছে। ২০১৮ সালে প্রথম করা আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা বাতিল করে ২০২৫ সালে নতুন করে প্রণয়ন করা হয়। এই নীতিমালার আলোচনায় পরে যাচ্ছি, তার আগে বরং একজন আউটসোর্সিং সেবাদাতার গল্প শুনি।
মানুষটার নাম ধরা যাক আলম, বয়স চল্লিশের কোঠায়। সরকারি এক সেবা প্রতিষ্ঠানের জনৈক কর্তার পিয়ন হিসেবে কাজ করেন আলম। গত সরকারের সময়, পাঁচ বছরের জন্য তাঁর চুক্তি হয়েছিল। বেতন বেশ ভালোই। তবে পাঁচ, বারো, ষাট মাসের বেতন হিসাব করে তার ১০ শতাংশ, প্রায় এক লাখ টাকা তাঁকে আগেই দিতে হয়েছিল, এই আউটসোর্সিংয়ের যিনি ঠিকাদার তাঁকে। চলছিল ভালোই। শুধু ঠিকাদারের নির্দেশে প্রায়ই বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে যেতে হতো বাধ্য হয়ে। আলমের দুর্দিন শুরু হয় ৫ আগস্টের পর যখন ঠিকাদার পালিয়ে যান। সরকারি চুক্তির কী হয়েছে আলম জানেন না। কেউ তাঁকে কখনো কিছু বলেননি, জানাননি, শুধু বেতন বন্ধ গত ১৮ মাস। এই ১৮ মাস তিনি কাজ করেছেন। চলে যেতে পারছেন না। অনেকগুলো টাকা জমেছে। চেয়েচিন্তে, ধারকর্জে চলছে দিন। আশা—একদিন পাওনা টাকাগুলো পাবেন। এই আশা আমলাতন্ত্রের জটিলতা, রাজনৈতিক পক্ষপাত, ঠিকাদারের চুক্তি—এতসব বাধা পেরিয়ে কখনো পূরণ হবে কি না, আলম সেটাও জানেন না।
আলমের মতো এমন হাজারো ‘ক্রয়কৃত সেবা’ দাতা আমাদের আশপাশে আছেন। তাঁদের আমরা দেখি না। তাঁদের উপস্থিতি আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। মানুষ বা শ্রমিক হিসেবে তাঁদের কোনো মর্যাদা দূরে থাক, অধিকারই আমাদের সমাজ, সরকার বা রাষ্ট্রের কাছে নেই। ‘ক্রয়কৃত’ সেবাদাতাদের ক্ষেত্রে শ্রম আইন প্রযোজ্য হয় না বরং ‘ক্রয় নীতিমালা’ অনুযায়ী একজন ‘সেবাকর্মী প্রতি পঞ্জিকা বর্ষে ১৫ দিন ছুটি প্রাপ্য হবেন’ কিংবা একজন নারী সেবাকর্মী ‘৪৫ দিন মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রাপ্য হবেন’। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আউটসোর্সিং-কর্মীদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করা নেই, পাঁচজনের কাজ তিনজন দিয়ে করাতে পারলেই লাভের টাকা ঠিকাদার গোনেন।
প্রতিষ্ঠিত শ্রম আইনের সঙ্গে অসংগত সরকারি নীতিমালা কী করে হতে পারে? সেই প্রশ্ন সাধারণের দূরে থাক, আজ পর্যন্ত কোনো সংবাদকর্মী, অধিকারকর্মী বা রাজনৈতিক কর্মীর নজরে পড়ল না। অনেকেই যৌনকর্মী, গৃহকর্মীসহ নানান ধরনের কর্মীদের অধিকার নিয়ে কাজ করেন, কিন্তু তাঁদের নিজেদের অফিসে নিয়োজিত আউটসোর্সিং-কর্মীর অধিকার তাঁদের নজর এড়িয়ে যায়। আউটসোর্সিং-কর্মীরা অফিসে, প্রতিষ্ঠানে অদৃশ্য থেকে সেবা দিয়ে যান।
কলিকালের এই ক্রীতদাসদের এই গল্প শুধু অফিসের করিডর বা টয়লেটের ভেতরে আটকে নেই। অদৃশ্য শ্রমের নতুন আরেক রূপ—গিগ অর্থনীতির শ্রমিকেরা। অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ার চালক, ফুড ডেলিভারি রাইডার, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কুরিয়ার, ফ্রিল্যান্স ডেটা এন্ট্রি অপারেটর—এরা কেউই ‘কর্মচারী’ নন, সবাই ‘পার্টনার’, ‘ডেলিভারি অ্যাসোসিয়েট’, ‘ইনডিপেন্ডেন্ট কন্ট্রাক্টর’। কী নিদারুণ স্বাধীনতা! কোনো নোটিশ নেই, আপিল নেই, ক্ষতিপূরণ নেই, স্থায়ীতা নেই, নিরাপত্তা নেই, সংগঠন নেই, নেই দর-কষাকষির শক্তি। আছে শুধু ‘প্রফিট শেয়ারিং’—কী চমৎকার শব্দবন্ধ!
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাস্তায় ছুটে বেড়ানো রাইডারটি নিজের মোটরসাইকেল, নিজের তেল, নিজের মোবাইল ডেটা, নিজের দুর্ঘটনার ঝুঁকি—সব নিজে বহন করে। কোম্পানি শুধু অ্যাপ দেয়, আর দেয় রেটিং। রেটিং কমে গেলে বা অজানা কোনো কারণে অ্যাকাউন্ট ‘সাসপেন্ড’ হলে—কাজ শেষ। একজন রাইড শেয়ারচালক যখন রাস্তায় দুর্ঘটনায় পড়েন, তখন অ্যাপ কোম্পানিটির কোনো দায় থাকে না, কারণ তিনি তো ‘স্বাধীন ঠিকাদার’। একজন ফুড ডেলিভারিম্যান যখন ঝড়ের মধ্যে খাবার পৌঁছে দিতে গিয়ে অসুস্থ হন, তখন তাঁর চিকিৎসার খরচ কোম্পানি দেয় না। উল্টো একটু দেরি হলেই অ্যালগরিদমের নির্দেশে তাঁর রেটিং কমে যায়, এমনকি আইডি ব্লক করে দেওয়া হয়। এখানে কোনো মানবিক বস বা সুপারভাইজার নেই, যার কাছে মিনতি করা যায়; এখানে আছে এক অদৃশ্য ‘অ্যালগরিদম’, যা কেবল ডেটা আর পারফরম্যান্স বোঝে, মানুষ বোঝে না।
অ্যালগরিদমের দাস এরা মানুষ নয়, ক্লিক-বাটন। আউটসোর্সিং কর্মীকে যেমন ‘ক্রয়’ করা হয়, গিগ কর্মীকে তেমনি ‘লগইন’ করা হয়। কর্মচারী বা শ্রমিক হলে নিয়োগকর্তার আইনি দায়বদ্ধতা থাকে—ন্যূনতম মজুরি, চিকিৎসা ভাতা, বিমা বা ছাঁটাইয়ের নোটিশ। এত ঝামেলা-হ্যাঁপায় কি ব্যবসা হয়? তার চেয়ে এই ভালো—‘পার্টনার’—সকল দায় থেকে মুক্তি। নাম বদলে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার ‘স্মার্ট বিজনেস স্ট্র্যাটেজি’!
সরকার বাহাদুরও ব্যাপক উৎসাহ দেন এই গিগ অর্থনীতির বিজনেস স্ট্র্যাটেজির। প্রণোদনা দেন উদ্যোক্তাদের, বিদেশি বিনিয়োগের। করেন না শুধু কোনো আইন—লগইন কর্মীদের নিরাপত্তার, অধিকারের। না সরকারি, না বেসরকারি; না কর্মচারী, না উদ্যোক্তা। মাঝখানে ঝুলে থাকা এক শ্রেণি—মানুষ হিসেবে, নাগরিক হিসেবে কারও কোনো দায়িত্ব নেই কলিযুগের এই ক্রীতদাসদের প্রতি।