এ বছরের বিশ্ব হার্ট দিবসের মূল আহ্বান হলো, ‘একটি সুযোগও হাতছাড়া করবেন না।’ এ কথাটির অর্থ হলো, আপাত সুস্থতার আড়ালেও হৃদ্রোগ থাকতে পারে; পরিচিত মনে হওয়া কোনো অস্বস্তির মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে সতর্কসংকেত। এ জন্য জরুরি হলো, হৃদ্রোগের সংকেত ও ঝুঁকি জানার পাশাপাশি সময়মতো ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এ জন্য দরকার হৃদ্রোগের বিপদ সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করার পাশাপাশি সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া নিশ্চিত করা। হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে রোগীর পরিণতি শুধু হাসপাতালের ভেতরের চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে না। উপসর্গ শনাক্ত করা, সাহায্য চাওয়া, পরিবহন পাওয়া, উপযুক্ত হাসপাতালে পৌঁছানো এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা—প্রতিটি ধাপ গুরুত্বপূর্ণ। ফলে হৃদ্রোগ মোকাবিলার পরিকল্পনা মানুষের ঘর থেকে শুরু হয়ে হাসপাতাল ও পরবর্তী পুনর্বাসন পর্যন্ত বিস্তৃত হতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে হৃদ্রোগ ও রক্তনালির রোগে বিশ্বে আনুমানিক ১ কোটি ৯৮ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৩২ শতাংশ। এসব মৃত্যুর তিন-চতুর্থাংশের বেশি ঘটেছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে। এই বৈষম্য দেখায়, হৃদ্স্বাস্থ্য একই সঙ্গে চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক ন্যায্যতার বিষয়। প্রতিটি অকালমৃত্যুর সঙ্গে একটি পরিবার তাদের উপার্জনক্ষম সদস্য, অভিভাবক কিংবা প্রিয়জনকে হারায়; দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতাও পরিবারের আর্থিক ও মানসিক স্থিতি দুর্বল করে।
হৃদ্রোগ প্রতিরোধের প্রথম শর্ত হলো আপাত সুস্থতা এবং প্রকৃত ঝুঁকির পার্থক্য বোঝা। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস কিংবা রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের বৃদ্ধি দীর্ঘদিন স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে। তাই ‘আমার কোনো অসুবিধা নেই’—এই অনুভূতি দিয়ে হৃদ্রোগের ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, তামাকের ব্যবহার, শারীরিক সক্রিয়তা এবং বিদ্যমান রোগ বিবেচনায় ব্যক্তির সামগ্রিক ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রয়োজন।
নিয়মিত হাঁটা কিংবা ধূমপান না করা অবশ্যই উপকারী। কিন্তু একটি ভালো অভ্যাস অন্য সব ঝুঁকির অনুপস্থিতি নিশ্চিত করে না। নিজের রক্তচাপ জানা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করা তাই গুরুত্বপূর্ণ। ঝুঁকি মূল্যায়নের উদ্দেশ্য মানুষকে রোগভীতিতে রাখা নয়; সময় থাকতে প্রতিরোধ ও চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করা। এ জন্য সবার একই ধরনের ব্যয়বহুল পরীক্ষার পরিবর্তে ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে মূল্যায়নকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সতর্কসংকেত সম্পর্কে জনসচেতনতাও হতে হবে স্পষ্ট ও ব্যবহারযোগ্য। বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী অনুভূত বা অস্বস্তি; বাহু, পিঠ কিংবা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা; শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম বা বমিভাব হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। সবার ক্ষেত্রে তীব্র বুকব্যথা হয় না। সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে ‘গ্যাস’ ভেবে অপেক্ষা করা কিংবা ঘরোয়া ব্যবস্থায় সময় কাটানো বিপজ্জনক হতে পারে। লক্ষণের কারণ নির্ধারণে দ্রুত চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রয়োজন।
জনসচেতনতামূলক বার্তার লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে নিরাপদ সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করা। কোন লক্ষণে জরুরি সাহায্য নিতে হবে, কোথায় যেতে হবে এবং কীভাবে যোগাযোগ করতে হবে—এসব তথ্য সহজ ভাষায় প্রচার করতে হবে। স্কুল, কর্মস্থল, গণমাধ্যম ও স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র এই শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। বার্তা যত সংক্ষিপ্ত ও বাস্তবসম্মত হবে, বিপদের মুহূর্তে তা কাজে লাগানোর সম্ভাবনাও তত বাড়বে।
তবে নাগরিককে শুধু ‘দ্রুত হাসপাতালে যান’ বললেই দায়িত্ব পূরণ হয় না। নিকটবর্তী কোন প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক মূল্যায়ন হবে, কোথায় সার্বক্ষণিক বিশেষায়িত চিকিৎসা পাওয়া যাবে এবং রোগীকে কীভাবে সেখানে নেওয়া হবে—এর উত্তর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেই দিতে হবে। অসুস্থ ব্যক্তির স্বজনেরা বিপদের মুহূর্তে হাসপাতালের সক্ষমতা যাচাই করে বেড়াবেন, এমন পরিস্থিতি কমানো জরুরি।
এ জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় জরুরি হৃদ্রোগসেবা নেটওয়ার্ক। জনসংখ্যা, ভৌগোলিক অবস্থান, যাতায়াতের সময় এবং বিদ্যমান সক্ষমতা বিবেচনায় আঞ্চলিক চিকিৎসাকেন্দ্র নির্ধারণ করা যেতে পারে। এসব কেন্দ্রের সঙ্গে জেলা হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং উপযুক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করতে হবে। কোথায় প্রাথমিক চিকিৎসা হবে, কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে এবং কোন রোগীকে দ্রুত উচ্চতর কেন্দ্রে পাঠাতে হবে—এসব বিষয়ে অভিন্ন কার্যপদ্ধতি থাকা প্রয়োজন।
ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া
অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান,
কার্ডিওলজি বিভাগ, পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল