হোম > জাতীয়

জলবায়ু সংকটে বাড়ছে মেয়েদের বাল্যবিবাহ ও কিশোরী গর্ভধারণের ঝুঁকি

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও অতিরিক্ত তাপপ্রবাহের মতো জলবায়ু সংকট মেয়েদের বাল্যবিবাহ, অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ ও সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারগুলোতে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের নতুন বৈশ্বিক গবেষণা ‘চেঞ্জ হার ফরকাস্ট: দ্য স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ডস গার্লস ২০২৬’-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে। সোমবার গণমাধ্যমে গবেষণা প্রতিবেদনটি পাঠানো হয়।

৫২টি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে তিন দশকের জলবায়ু ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি বাংলাদেশ, কেনিয়া, পেরু, সেনেগাল ও জিম্বাবুয়ের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৫ হাজার মেয়ে ও তরুণীর ওপর জরিপ চালিয়ে গবেষণাটি করা হয়েছে।

গবেষণায় অংশ নেওয়া ১০ জনের একজন মেয়ে জানিয়েছেন, জলবায়ু-সম্পর্কিত কোনো ঘটনার পর তিনি অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। ৩৩ শতাংশ বলেছেন, তাঁদের এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ বেড়েছে। ১০ জনের একজন জানিয়েছেন, তিনি ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ে করেছেন। আর ৩৬ শতাংশ বলেছেন, দুর্যোগের পর তাঁদের এলাকায় ১৮ বছরের আগে মেয়েদের বিয়ে বা দাম্পত্য সম্পর্কে জড়ানোর ঘটনা বেড়েছে।

এ ছাড়া ২৮ শতাংশ মেয়ে জলবায়ু-সম্পর্কিত ঘটনার পর নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন। ১০ জনের ৯ জন বলেছেন, জলবায়ু দুর্যোগ তাঁদের পরিবারের টিকে থাকা, স্বাস্থ্য ও স্থিতিশীলতার ওপর গুরুতর চাপ তৈরি করছে।

বাংলাদেশে বন্যার পর বিয়ের চাপ

গবেষণায় বাংলাদেশের মেয়েদের অভিজ্ঞতাও উঠে এসেছে। বাংলাদেশি ১৯ বছর বয়সী শাহিনা গবেষকদের বলেছেন, বন্যার পর পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়লে আর্থিক সংকটের কারণে মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর অর্থনৈতিক সংকট বাল্যবিবাহের অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে মেয়েরা পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে এবং স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও সংকুচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও দেশটিতে জলবায়ু অভিঘাতের সঙ্গে বাল্যবিবাহের যোগসূত্রের বিষয়টি উঠে এসেছে।

স্কুল বন্ধ হলে ঝুঁকি দ্বিগুণ

গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু বিপর্যয়ে সবচেয়ে বড় পরোক্ষ প্রভাবগুলোর একটি হলো মেয়েদের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়া। স্কুল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে মেয়েরা শোষণ, সহিংসতা, বাল্যবিবাহ ও অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের ঝুঁকিতে বেশি পড়ে।

গবেষণা অনুযায়ী, যেসব মেয়ের পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে, তাদের অল্প বয়সে বিয়ে অথবা অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণ। ৫০টির বেশি দেশে তিন দশকের তথ্য বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে ও সহিংসতা থেকে সুরক্ষার ক্ষেত্রে অব্যাহত শিক্ষা সবচেয়ে ধারাবাহিক সুরক্ষামূলক ভূমিকা রাখে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে শুধু স্কুল নয়, স্বাস্থ্যসেবাও ব্যাহত হয়। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৭৬ শতাংশের বেশি মেয়ে জানিয়েছেন, তাঁদের এলাকার আরও বেশি মেয়ে ও তরুণী অন্তত একটি স্বাস্থ্যসেবা পেতে সমস্যায় পড়ছেন। খরায় ক্ষতিগ্রস্ত মেয়েদের ক্ষেত্রে এই হার ৮৪ শতাংশ।

মাসিক স্বাস্থ্যসেবাতেও সমস্যা বাড়ছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া অর্ধেক মেয়ে জানিয়েছেন, তাঁদের এলাকার মেয়েরা মাসিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী বা পরিষ্কার পানি পেতে সমস্যায় পড়ছেন।

দীর্ঘস্থায়ী খরায় বাড়ে বিয়ের ঝুঁকি

গবেষণায় জলবায়ু অভিঘাতের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী খরাকে বাল্যবিবাহের সঙ্গে সবচেয়ে ধারাবাহিকভাবে সম্পর্কিত ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে ফসল, গবাদিপশু ও আয় হারাতে থাকায় পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়। একপর্যায়ে মেয়েকে বিয়ে দেওয়াকে পরিবারগুলো টিকে থাকার কৌশল হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।

কেনিয়ার ২২ বছর বয়সী গালগালো গবেষকদের বলেন, ‘আমার বাবার বিক্রি করার মতো কোনো গবাদিপশু নেই, আমাকে কলেজে পড়ানোর সামর্থ্যও নেই। এ কারণেই আমি বিয়ে করে নিতে রাজি হয়েছিলাম।’

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর মেয়েদের যৌন নির্যাতন ও সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়ে। সুরক্ষা ব্যবস্থা ও সহায়তার নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়লে অর্থ বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বিনিময়ে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রেও ভিড় ও অপর্যাপ্ত আলোর কারণে হয়রানি ও যৌন সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ে।

প্রায় অর্ধেক (৪৯ শতাংশ) মেয়ে জানিয়েছেন, জলবায়ু অভিঘাতের পর তাঁদের এলাকায় গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মদানের সময় স্বাস্থ্যগত জটিলতা বেড়েছে। প্রায় চারজনের একজন বলেছেন, গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মদানের সময় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

মেয়েদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগের আহ্বান

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিনা ঘেলানি বলেন, জলবায়ু সংকট মেয়েদের জন্য কোনো দূরবর্তী হুমকি নয়; এটি ইতিমধ্যে তাঁদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রভাব ফেলছে। তাঁর মতে, জলবায়ু নীতি ও অর্থায়নের শুরু থেকেই মেয়েদের অধিকার ও প্রয়োজনকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

সংস্থাটি জলবায়ু বিপর্যয়ের সময় স্কুল খোলা ও বিনা মূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা, জলবায়ু অভিযোজনের অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ করা এবং জরুরি সহায়তা কর্মসূচিতে মাসিক ব্যবস্থাপনার সামগ্রী, গর্ভনিরোধক ও সুরক্ষা সেবা অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে।

এ ছাড়া সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মেয়ে, প্রতিবন্ধী মেয়ে এবং বাস্তুচ্যুত মেয়েদের মতো সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সহায়তা পৌঁছানোর ওপর জোর দিয়েছে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল।

আগামী নভেম্বরে তুরস্কে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে মেয়েদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তাকে জলবায়ু মোকাবিলার নীতি ও অর্থায়নের মূলধারায় আনার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।