বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মৃত্যুর আগে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া শরিফ ওসমান বিন হাদির জবানবন্দি আমলে নিয়েছেন। এ মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ বিচারাধীন রয়েছে।
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ জবানবন্দি দেন। তাঁর মৃত্যুর কারণে ট্রাইব্যুনালে সরাসরি সাক্ষ্য দেওয়া আর সম্ভব হয়নি।
শরিফ ওসমান বিন হাদি তার জবানবন্দিতে বলেন, অতি দ্রুত যদি আওয়ামী লীগের বিচার করতে না পারলে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা ভবিষ্যতে কি পরিমাণ গণহত্যা চালাবে, তা অকল্পনীয়। তাদেরকে বিচারের আওতায় না আনলে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে। ওই আন্দোলনে আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বহু সাংবাদিক, লেখক বিভিন্ন এক্টিভিস্ট অবদান রেখেছেন।
ওসমান হাদি তার জবানবন্দিতে বলেন, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে মিছিল হয়েছিল, সেটা যুবলীগের সেক্রেটারি নিখিলের নেতৃত্বেই হয়েছিল। যুবলীগের সেক্রেটারি নিখিল সারাদেশে উস্কে দিয়ে তার বাহিনী দিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। মিরপুরের এমপি হওয়ার সুবাদে মিরপুরে যখন আন্দোলন চলে তখন তিনি মিপুরের অন্যান্য এমপিদের নিয়ে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে গুলি চালিয়ে মানুষকে হত্যা করেছে।
ওসমান হাদি বলেন, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই রাতে সাদ্দাম হোসেন ছাত্রলীগ এবং বহিরাগতদের নিয়ে ক্যাম্পাসে মিছিল করেছেন। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদেরকে তার নেতৃত্বে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছিল। এছাড়াও সে রাজু ভাস্কর্যে দাড়িয়ে ঘোষণা করেছিল– যারা আন্দোলনে যোগ দিয়েছে, তাদের প্রত্যেককে সে দেখে নিবে এবং তাদের জীবনকে তছনছ করে দিবে। ছাত্রলীগের সভাপতি হওয়ার কারণে সে সারা বাংলাদেশে ছাত্রলীগকে আন্দোলনকারীদের হত্যা করার বৈধতা দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেছাকারের মূল হোতা সাদ্দাম হোসেন।
ওসমান হাদি বলেন, ২০২৪ সালের ১৩ জুলাই ছাত্রলীগের সেক্রেটারি ইনান মধুর ক্যান্টিনে বলেছে, "ডোর টু ডোর" ক্যাম্পেইন করবে। কিন্তু সেদিন সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা আন্দোলন করছিল, তাদেরকে গেস্ট রুমে ডেকে ভয়ংকরভাবে হুমকি দিয়েছে। এমনকি মেয়েদের মধ্যে যারা আন্দোলনে অংশগ্রগণ করেছিল, তাদের অভিভাবকদের ফোন করে ভয় দেখিয়েছিল। যার কারণে পরদিনই কিছু অভিভাবক এসে তাদের মেয়েদের নিয়ে গিয়েছিল। ১৭ই জুলাই ইনান শেখ হাসিনার সঙ্গে কিভাবে হত্যা করা হবে, কিভাবে সাফ করা হবে, কিভাবে আক্রমন করা হবে, সে বিষয় নিয়ে সরাসরি কথা বলেছে। যার কল রেকর্ড আমরা আল জাজিরার মাধ্যমে শুনেছি। সেক্রেটারি হিসেবে ইনান ছাত্রলীগের কর্মীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করিয়েছেন।
সারাদেশে আন্দোলন দমনের নামে সংঘটিত ও পরিকল্পিত হামলার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, যুবলীগের সাধারন সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনানসহ ঘটনায় জড়িত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও আওয়ামীলীগ দলীয় ক্যাডারদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন ওসমান হাদি।
এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর সাংবাদিকদের জানান, শহীদ ওসমান হাদি জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় সংগঠক ছিলেন। তিনি প্রত্যক্ষভাবে আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ দেখেছেন এবং কীভাবে হামলা ও গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে সাক্ষ্য দেন।
চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, প্রচলিত আইনের ১৯ ধারায় বিধান রয়েছে—কোনো সাক্ষী যদি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে বক্তব্য দেন, কিন্তু পরে আদালতে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব না হয়, তাহলে ট্রাইব্যুনাল সেই বক্তব্যকে গ্রহণ করতে পারেন।
এই বিধানের আলোকে রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন এবং ওসমান হাদির জবানবন্দি প্রমাণ হিসেবে গ্রহণের সিদ্ধান্ত দেন।