স্লিপার বাসের সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনা নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে প্রথমবারের মতো তৈরি হচ্ছে এ বাসের বডি নির্মাণ ও চলাচল নিয়ন্ত্রণের নীতিমালা। পুরোনো বা ব্যবহৃত চেসিস দিয়ে আর স্লিপার বাস তৈরি করা যাবে না। বাসের পেছনের দিকে দুটি করে এক্সেল, সব এক্সেলে এয়ার সাসপেনশন এবং উন্নত ব্রেকিং ব্যবস্থা রাখতে হবে। এ ছাড়া প্রতিটি বার্থে (শোয়ার জায়গা) ৩০০ কেজি ওজন বহনের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) স্লিপার বাসের খসড়া নীতিমালা তৈরি করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে জমা দিয়েছে বলে বিআরটিএ সূত্র জানিয়েছে। ‘স্লিপার বাস গাইডলাইন/নীতিমালা, ২০২৬’ শিরোনামের খসড়ায় বাসের কাঠামো, বার্থ, স্থিতিশীলতা, অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি নির্গমনব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন শর্ত রাখা হয়েছে।
দেশে সড়কপথের দূরপাল্লার যাত্রায় স্লিপার বাসের চাহিদা বাড়লেও এত দিন এ ধরনের বাসের বডি নির্মাণ ও চলাচলের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা ছিল না। খসড়া নীতিমালার বিশেষ দ্রষ্টব্যে বিআরটিএ বলেছে, অনুমোদন ছাড়াই স্লিপার বাস নির্মাণ করে সড়ক-মহাসড়কে চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। যাত্রীদের মধ্যে এর চাহিদা ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তবে এসব বাসে ঝুঁকি রয়েছে।
খসড়ায় স্লিপার বাস বলতে চালক ছাড়া কমপক্ষে ১৩ জন যাত্রী বহনের উপযোগী এমন বাসকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে যাত্রীরা শুয়ে বা আয়েশ করে ভ্রমণ করতে পারবেন। প্রসঙ্গত, বর্তমানে সারা দেশে ৮০০টির বেশি স্লিপার বাস চলছে। বিআরটিএ খসড়ায় বলেছে, দেশে সম্পূর্ণ তৈরি (সিবিইউ) অবস্থায় আমদানি করা কোনো স্লিপার বাস নেই। আবার দেশে এ ধরনের বাসের বডি তৈরির বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানও নেই। তাই অনলাইনে পাওয়া বিভিন্ন দেশের গাইডলাইন থেকে কিছু তথ্য নিয়ে ‘জরুরি প্রয়োজন ও বিশেষ বিবেচনায়’ খসড়াটি তৈরি করা হয়েছে।
খসড়া নীতিমালায় স্লিপার বাস তৈরিতে সম্পূর্ণ নতুন চেসিস ব্যবহারের শর্ত দেওয়া হয়েছে। বাসের পেছনে টেনডেম এক্সেল এবং সব এক্সেলে এয়ার সাসপেনশন বা এর চেয়ে উন্নত প্রযুক্তির সাসপেনশন রাখতে হবে। ব্রেকিং ব্যবস্থায় থাকতে হবে এবিএস বা তার চেয়ে উন্নত প্রযুক্তি। বাসের স্থিতিশীলতা পরীক্ষার সময় প্রতিটি বার্থে ৭৫ কেজি ওজন প্রয়োগ করে স্থিতিশীলতা যাচাই করতে হবে। যাত্রী ও মালামালসহ বাসের সর্বোচ্চ ওজন ২১ টনের বেশি হতে পারবে না। বাসের সর্বোচ্চ উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ দশমিক ২৫ মিটার।
বাসের কাঠামোগত দৃঢ়তা নিশ্চিত করতে মূল প্রস্তুতকারকের কারিগরি নির্দেশিকা ও নকশা অনুসরণ করতে হবে। পাশাপাশি বিআরটিএর স্থায়ী টেকনিক্যাল কমিটি নির্ধারিত পদ্ধতিও অনুসরণ করতে হবে।
স্লিপার বাসের বার্থের দৈর্ঘ্য কমপক্ষে ১ হাজার ৮০০ মিলিমিটার রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এক সারিতে তিনটি বার্থ বা শোয়ার জায়গা থাকলে প্রতিটির প্রস্থ কমপক্ষে ৬০০ মিলিমিটার এবং দুটি থাকলে ৬৫০ থেকে ৭৫০ মিলিমিটার রাখতে হবে। প্রতিটি বার্থে ৩০০ কেজি ওজন বহনের সক্ষমতা থাকতে হবে। যাত্রীর পড়ে যাওয়া ঠেকাতে বার্থের দুই পাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী রাখতে হবে। উপরের বার্থে ওঠানামার জন্য হাতলসহ সিঁড়ি রাখতে হবে। প্রতিটি বার্থে আলাদা কলিং লাইট ও কলবেল, রিডিং লাইট, হেডরেস্ট, আর্মরেস্ট এবং খাবারের ট্রে রাখার ভাঁজযোগ্য টেবিল রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।
প্রতিটি বাসে প্রয়োজনীয় সংখ্যক অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডার ও কমপক্ষে তিনটি স্মোক ডিটেক্টর রাখতে হবে। দুর্ঘটনা বা আগুনের সময় দ্রুত বের হওয়ার জন্য জরুরি নির্গমন দরজা ও নিচের-ওপরের ডেকে জরুরি জানালা রাখতে হবে। সেফটি গ্লাস ভাঙার হাতুড়ি ও সার্ভিস দরজার এয়ারলক খোলার ম্যানুয়াল ভালভ রাখতে হবে।
বার্থের আসন ও প্যাডে অগ্নিপ্রতিরোধক ফোম এবং আসনের কভার, পর্দা, প্লাইউড ও ফ্লোরিংসহ অভ্যন্তরীণ উপকরণে নির্ধারিত দাহ্যতা মান নিশ্চিত করতে হবে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের (বিআরটিএ অধিশাখা) যুগ্মসচিব মো. আব্দুস সোবহান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘স্লিপার বাসের খসড়া নীতিমালা বিআরটিএ থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে আলোচনা চলছে। ইতিমধ্যে একটি সভা হয়েছে। নীতিমালাটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।’
এ বিষয়ে বিশদ জানতে বিআরটিএ কার্যালয়ে গিয়ে এবং মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও বিআরটিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমানের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. এহসান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সরকার এত দিন পর হলেও স্লিপার বাসের নীতিমালা তৈরির চেষ্টা করছে, এটা ভালো উদ্যোগ। নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী বাস তৈরি করতে গেলে খরচ বাড়বে। সেই বাড়তি খরচ বহনে সংশ্লিষ্টরা কতটা রাজি হবেন, সেটিও দেখতে হবে। প্রথম থেকেই নিয়ম থাকলে বাস্তবায়ন সহজ হতো। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন অনিয়ম চলার পর নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। নীতিমালা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।’
স্লিপার এসি বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম বাবু আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘২০১৪ সাল থেকে দেশে স্লিপার বাস চলছে। এত দিন যদি এগুলো অবৈধভাবে চলতে থাকে, তাহলে এর দায় অবশ্যই বিআরটিএর ওপরও বর্তায়। আমরা নিষেধাজ্ঞার বিপক্ষে, নীতিমালার পক্ষে। প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ ও দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এই খাতে। আমরা বুয়েটের কারিগরি পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংশোধন করে নীতিমালার আওতায়ই স্লিপার বাস পরিচালনা করতে চাই।’