হোম > জাতীয়

‘নির্বাচনই গণতান্ত্রিক উত্তরণ নয়’, বিশ্ব পরিস্থিতি ও স্বৈরাচার পতনের পর ঝুঁকি নিয়ে আলী রীয়াজের সতর্কবার্তা

ঢাবি প্রতিনিধি

বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে বক্তব্য দেন ড. আলী রীয়াজ। ছবি: আজকের পত্রিকা

গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় না উল্লেখ করে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে একাধিক বৈশ্বিক ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ড. আলী রীয়াজ। তিনি বলেছেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণকে কেবল একটি নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে রাষ্ট্র সংস্কারের পরিধি সংকুচিত হয়ে পড়ে; প্রকৃত উত্তরণ ঘটে নাগরিকের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির মাধ্যমে।

আজ বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মুজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত ‘আলী রীয়াজ স্নাতকোত্তর গবেষণা পুরস্কার ২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির এই ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর তাঁর বক্তব্যে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, গণতন্ত্রের পশ্চাদপসরণ, তরুণদের মননশীলতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাবসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন।

গণতন্ত্রের প্রচলিত ধারণা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে ড. আলী রীয়াজ বলেন, কেবল ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলেই রাষ্ট্রে জনগণের প্রকৃত অংশীদারত্ব নিশ্চিত হয় না।

তাঁর মতে, একটি সফল রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রে জনগণের প্রকৃত অংশীদারত্ব তৈরি হতে হলে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা অপরিহার্য। তিনি বলেন, ‘আমরা কেবল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছি মানেই রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশীদারত্ব পেয়ে গেলাম—বিষয়টি এমন নয়। অংশীদারত্ব তখনই তৈরি হয়, যখন নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।’

তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাধারণ মানুষের বৈষম্য প্রতিরোধ করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটকারীদের কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়শই ‘স্ট্যাটাস কো’ বা বিদ্যমান ব্যবস্থা বজায় রাখতে চায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের সূচনা তরুণদের চাপ ও সক্রিয়তার মাধ্যমেই আসতে হবে।

বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে ড. আলী রীয়াজ বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা এখন তীব্র ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এক সময়ের দ্বিমেরুকেন্দ্রিক এবং পরবর্তীকালের একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এখন একটি বহুমুখী ও অস্থির রূপ ধারণ করেছে। ১৯৩০-এর দশকের পর বিশ্ববাসী এমন পরিবর্তনশীল ও অস্থিতিশীল সময় আর প্রত্যক্ষ করেনি।

এই বৈশ্বিক অস্থিরতা কীভাবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে স্পর্শ করছে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি ও বাব-এল-মান্দেবের মতো কৌশলগত নৌপথে সামরিক বা রাজনৈতিক উত্তেজনা সরাসরি স্থানীয় বাজার ও পণ্যের দামে প্রভাব ফেলছে। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান ও নিপীড়নের প্রভাব কেবল নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে।

বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের পশ্চাদপসরণের হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরে এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জানান, বর্তমানে বিশ্বের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের স্বৈরাচারী বা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার অধীনে বসবাস করছে। তরুণদের সাহসিকতায় বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন এলেও গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ের ঝুঁকিগুলোর দিকে সতর্ক নজর রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে ড. আলী রীয়াজ সতর্ক করেন, মাদাগাস্কারে তরুণদের আন্দোলন সফল হলেও রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে পরবর্তীতে ক্ষমতা সেনাবাহিনীর হস্তগত হয়। সুদানে স্বৈরাচারবিরোধী সফল আন্দোলনের পর অসামরিক সরকারের বদলে সামরিক বাহিনীর দুই শক্তিশালী ব্লকের মধ্যে রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। তিউনিসিয়ায় ‘আরব বসন্ত’-এর পর একাধিক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দুর্বল থাকায় শেষ পর্যন্ত আবারও কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, তিউনিসিয়া ও সুদানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগোতে হবে, কারণ কেবল স্বৈরাচারকে পরাজিত করার মাধ্যমে কাজ শেষ হয়ে যায় না।

তরুণদের রাজনৈতিক চিন্তা ও আচরণের মানদণ্ড কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে দিকনির্দেশনামূলক কথা বলেন ড. আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, তরুণদের প্রধান অস্ত্র হওয়া উচিত যুক্তি, বলপ্রয়োগ বা শারীরিক শক্তি নয়।

শিক্ষাজীবনে ‘কেন’ প্রশ্ন করার প্রবণতা ধরে রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় যুক্ত হওয়ার পর প্রশ্ন করার অভ্যাস কমে যায়। প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে তরুণদের ক্রমাগত ‘কেন’ প্রশ্ন করে যেতে হবে।

তিনি বলেন, তারুণ্যের সাহস প্রশংসনীয়, কিন্তু সেই সাহস যেন কোনোভাবেই ‘ঔদ্ধত্যে’ পরিণত না হয়। ভিন্নমত পোষণকারী মানেই সে শত্রু নয়। যে মত নিজের পছন্দ নয়, তার পেছনেও কোনো যৌক্তিকতা আছে কি না তা বোঝার চেষ্টা করাই মুক্তচিন্তার লক্ষণ। অন্যকে অবমাননা করার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই।

আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অভাবনীয় অগ্রগতি নিয়ে তরুণ সমাজকে সতর্ক করেন এই অধ্যাপক। প্রযুক্তি যেন মানুষের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে দখল না করে নেয়, সেদিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ড. আলী রীয়াজ বলেন, ‘অ্যালগরিদম যেন আপনার ভবিষ্যৎ ঠিক করে না দেয়। প্রযুক্তিকে মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, মানুষ যেন প্রযুক্তির দাসে পরিণত না হয়।’ এআইয়ের ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি এর ঝুঁকি বুঝে প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে গবেষণা ও একাডেমিক ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ‘আলী রীয়াজ স্নাতকোত্তর গবেষণা পুরস্কার ২০২৬’ প্রদান করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মুজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। বিভাগের শিক্ষক, গবেষক ও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এতে অংশ নেন।

ড. আলী রীয়াজ তরুণ গবেষকদের সক্রিয়তার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, একটি বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলার দায়ভার তরুণদেরই নিতে হবে এবং তার জন্য পুরোনো প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজেদের সক্ষমতায় ভবিষ্যৎ রূপায়ণ করতে হবে।