সংবিধান সংশোধনী বিল জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর যেসব বিষয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেগুলোতে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ। বিশেষ কমিটি আগামী ডিসেম্বরেই সংসদে তাঁদের প্রতিবেদন পেশ করতে চায় এবং এর ভিত্তিতে আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জানুয়ারির প্রথম অধিবেশনেই সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে তোলা সম্ভব হতে পারে।
আজ রোববার জাতীয় সংসদে আয়োজিত সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সঙ্গে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের মতবিনিময় সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা প্রধান বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের জোর পরামর্শ দেন।
কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে দুপুর আড়াইটা থেকে শুরু হয়ে বিকেল ৫টা ২০ মিনিট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলান উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, সাকিলা ফারজানা এবং মো. মাহমুদুল হক রুবেল। গণমাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম, প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, নিউ এজের সম্পাদক নুরুল কবির, সমকালের সম্পাদক শাহেদ মো. আলী, বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, দেশ রূপান্তরের সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, ডেইলি ওয়াদারের সম্পাদক শফিকুল আলম, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমাদ, সাবেক গণমাধ্যম কমিশনের প্রধান কামাল হোসেন, বিপিজেএ সভাপতি হারুন জামিল ও সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী খান লিথোসহ ২৬ জন সাংবাদিক প্রতিনিধি।
বৈঠক শেষে ব্রিফিংকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সম্পাদকদের অনেকেই প্রস্তাব দিয়েছেন বিরোধী দলের সদস্যদের এই কমিটিতে অংশগ্রহণের জন্য পুনরায় আহ্বান জানানো উচিত, যাতে ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রস্তাবগুলো প্রণয়ন করা যায়। আমরা এতে সম্পূর্ণ একমত। সংসদ চলাকালীন এবং এখনো তাঁদের আহ্বান জানাচ্ছি। তাঁরা যেকোনো সময় এলেই আমরা স্বাগত জানাব। তাঁরা অংশ নিলে তাঁদের দলের উত্থাপিত অনেক প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা সহজ হতো।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করা হবে। এর পাশাপাশি নির্বাচনী ইশতেহার ও অন্যান্য যেসব প্রয়োজনীয় প্রস্তাব ঐকমত্যের ভিত্তিতে আসবে, সেগুলোও বিবেচনা করা হবে। সংবিধান সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করা হবে।
গণভোটের বাধ্যবাধকতা ও আইনি ভিত্তি প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে বিশেষ কমিটির সভাপতি জানান, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে থাকা গণভোটের বিধানটি পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাদ দেওয়া হয়েছিল। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের পর উচ্চ আদালতের আদেশে ১৪৮ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করায় গণভোটের বিষয়টি সংবিধানে ফেরত আসছে। তিনি ব্যাখ্যা দেন, পুরো সংবিধান সংশোধনীর ওপর গণভোটের প্রয়োজন হবে না; কেবল প্রস্তাবনা, ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদের মতো বিশেষ জায়গায় সংসদে কোনো পরিবর্তন আনা হলে রাষ্ট্রপতি সই করার আগে তা গণভোটে দেওয়া সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। এ ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাসহ বিএনপি প্রস্তাবিত অতিরিক্ত অনুচ্ছেদগুলো ভবিষ্যতে পরিবর্তন করতে হলেও গণভোটে যেতে হবে।
জুলাই সনদ নাকি বিএনপির ইশতেহার বেশি গুরুত্ব পাবে—এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখানে প্রথম অগ্রাধিকার জুলাই জাতীয় সনদ। তবে জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়া আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারও ধারণ করা হবে। যেমন ‘মহান আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি আমাদের প্রতিশ্রুতি এবং এ বিষয়ে বিরোধী দলও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে একমত ছিল।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত সম্পাদক ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রস্তাব ও মতামত তুলে ধরেন।
প্রধান বিরোধী দলের পাঁচজন সদস্যকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করতে আরও জোর প্রচেষ্টা চালানোর অনুরোধ জানান সাংবাদিকেরা, যাতে ২৪ জুলাইয়ের গণ-পরিবর্তনের পর সব মতামত প্রতিফলিত হয়।
রাষ্ট্রপতি যাতে কোনোভাবেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান না হতে পারেন এবং বিচার বিভাগকে এই প্রক্রিয়ার পুরোপুরি বাইরে রাখা যায়, সে বিষয়ে বিকল্প পদ্ধতির চিন্তাভাবনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমিয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স নিশ্চিত করা, প্রধানমন্ত্রী পদ ও দলীয় প্রধানের পদ পৃথক করা, সুপ্রিম কোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ এবং সংবিধানে উল্লেখিত ‘ন্যায়পাল’ পদটি দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দেওয়া হয়।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ হলে উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি জানান বক্তারা, তবে এতে অর্থের অপচয় হবে কি না সে প্রশ্নও তোলেন কেউ কেউ। এ ছাড়া দুদকসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের নিয়োগ রাষ্ট্রপতির অধীনে ন্যস্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
এক ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদক নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি একটি ‘সাংবিধানিক কাউন্সিল’ গঠনের প্রস্তাব দেন এবং ‘গণপ্রজাতন্ত্রী’ শব্দের ঔপনিবেশিক মানসিকতা বাদ দিয়ে কেবল ‘প্রজাতন্ত্র’ ব্যবহারের পক্ষে মত দেন।