পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের কাজের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা আগামী জুনে। তবে শেষ দিকে এসে মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে প্রকল্প দপ্তর। তবে তাদের প্রস্তাবে ব্যয় বাড়ানো হয়নি। মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবের বিষয়ে আজ সোমবার রেল মন্ত্রণালয়ে প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভা ডাকা হয়েছে।
রেল মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রকল্পের কিছু খুঁটিনাটি কাজ এখনো বাকি আছে এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষের মধ্যে কয়েকটি বিষয়ে বিরোধ রয়েছে, যা সমাধানে সময় লাগবে। তা ছাড়া প্রকল্পের আওতায় মুন্সিগঞ্জের নিমতলায় ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) নির্মাণের জন্য ১২০ একর জমি অধিগ্রহণ যুক্ত করা হয়েছে। জমি অধিগ্রহণপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে।
এ ছাড়া ভাঙ্গা জংশনের ফিনিশিং ও সিগন্যাল সিস্টেমের কমিশনিং কাজ এখনো শেষ হয়নি। কমলাপুরের টিটিপাড়া আন্ডারপাস, ভাঙ্গা জংশন এবং সেন্ট্রাল ট্রাফিক কন্ট্রোল (সিটিসি) নির্মাণকাজের ত্রুটি দায়বদ্ধতার সময়কাল (ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড) বাড়ানোর বিষয়ও রয়েছে। এসব কারণে প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত মোট ২৩৬.২৭ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৭২.৯৭৫ কিলোমিটার মূল লাইন এবং ৬২.৩০ কিলোমিটার লুপ লাইন। রেললাইন নির্মাণের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়েছে। প্রকল্পটি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে জি-টু-জি পদ্ধতিতে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হলো চায়না রেলওয়ে গ্রুপ।
২০২৩ সালে প্রকল্পের একাংশ চালু হয়। আর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা থেকে সরাসরি যশোর পর্যন্ত ট্রেন চলাচল শুরু হয়। বর্তমানে এই প্রকল্পের নিয়মিত বাণিজ্যিক ট্রেন চলাচল চলছে। তবে ছোটখাটো কিছু কাজ বাকি আছে।
প্রকল্পের জানুয়ারি মাসের অগ্রগতির প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৯৭ শতাংশ এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে ৮৯ শতাংশ।
প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব ও সার্বিক কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের মেয়াদ আগামী জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা কিছুটা বাড়ানোর বিষয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। নির্মাণকাজ মূলত শেষের দিকে। তবে ঠিকাদারের কিছু ক্লেইম রয়েছে, আবার প্রকল্প কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও কিছু কাউন্টার ক্লেইম ও বিরোধ আছে। এসব বিষয় নিষ্পত্তির জন্য ডিসপিউট বোর্ড কাজ করছে। জুনের মধ্যে সব নিষ্পত্তি না হলে সময় বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়া এখন যেসব কাজ শেষ হচ্ছে, সেগুলোর জন্য এক বছরের ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড থাকে, সেটিও সময় বাড়ানোর বিষয় বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।’
মো. আফজাল হোসেন আরও জানান, নিমতলায় ১২০ একর জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কার্যালয় থেকে এখনো চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ পাওয়া যায়নি; প্রাথমিক নোটিশ জারি হয়েছে। ভবিষ্যতে সেখানে আইসিডি নির্মাণের সুবিধা রাখতে আগাম এই জমি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে প্রয়োজন হলে দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়। এটিকে তিনি বাড়তি চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য একটি সুযোগ হিসেবেও উল্লেখ করেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ৩ মে একনেক সভায় পদ্মা সেতুর ওপর রেললাইন স্থাপনে ৩৪ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকার এই প্রকল্প অনুমোদন করে তৎকালীন সরকার। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত। ২০১৮ সালের ২২ মে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে প্রায় ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা এবং মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। করোনার কারণে কাজের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হলে আরও দুই বছর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সাল পর্যন্ত করা হয়। এরপর আবারও প্রকল্পের মেয়াদ বেড়ে হয় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত।
এ বিষয়ে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘রেলের জন্য আইসিডি প্রয়োজন হলেও এত বড় প্রকল্পের শেষপর্যায়ে নতুন করে ১২০ একর জমি অধিগ্রহণ যুক্ত করা পরিকল্পনার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। শুরুতেই বিষয়টি বিবেচনায় নিলে সময় ও প্রশাসনিক জটিলতা এড়ানো যেত। জমি অধিগ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই সময়সাপেক্ষ। এটি যুক্ত হওয়ায় মেয়াদ বাড়ানোর চাপ তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতের জন্য জমি সংরক্ষণ যুক্তিযুক্ত হতে পারে, তবে সেটি আলাদা ও সুস্পষ্ট পরিকল্পনার আওতায় নেওয়া উচিত ছিল। জমি অধিগ্রহণ যেন প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর অজুহাত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।’