হোম > জাতীয়

সংসদীয় কমিটির বৈঠকে তথ্য

বন্দরে ড্রেজিংয়ে অপচয় দায়ী চিহ্নিতের নির্দেশ

তানিম আহমেদ, ঢাকা 

মোংলা ও পায়রা বন্দর। ছবি: সংগৃহীত

মোংলা ও পায়রা বন্দরের ড্রেজিংয়ে প্রায় ৬ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কাঙ্ক্ষিত নাব্যতা অর্জিত হয়নি। অন্যদিকে আর্থিক সংকটে পড়া ছয়টি ব্যাংকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ১ হাজার ২৬২ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে। এসব ঘটনায় সরকারি অর্থের অপচয় রোধ, দায়ীদের চিহ্নিত করা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ স্থায়ী আমানত ফেরত আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, পরিচালন কার্যক্রম এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয় বলে সূত্রে জানা গেছে। কমিটির সভাপতি ও চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে বৈঠকে সদস্য ও হুইপ মিয়া নূরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়া, তাহসিনা রুশদীর, খোন্দকার আবু আশফাক, মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান ও মোহাম্মদ কামাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

সূত্র জানায়, পায়রা বন্দরের ড্রেজিং নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ১০০ থেকে ১০৫ মিটার প্রশস্ত চ্যানেলের গভীরতা ১০ দশমিক ৫ মিটারে উন্নীত করতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করা হয়। এতে ব্যয় হয় ৬ হাজার ২৬৫ কোটি ৯২ লাখ টাকা। নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ড্রেজিংয়ের আগে চ্যানেলের গভীরতা ছিল ৫ মিটার। কাজ শেষ হওয়ার পরও গভীরতা ৫ মিটারই পাওয়া গেছে। অথচ ঠিকাদারকে পুরো বিল পরিশোধ করা হয়েছে। আদৌ কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছে সংসদীয় কমিটি।

এ ছাড়া মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলে ১২৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ড্রেজিংয়ের পর ৭ দশমিক ৫ মিটার গভীরতা পাওয়ার কথা থাকলেও হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের প্রতিবেদনে পাওয়া গেছে মাত্র ৫ দশমিক ৫ মিটার। নিরীক্ষা আপত্তি অনুযায়ী, চ্যানেলে নির্ধারিত গভীরতা এবং জেটিতে ৯ দশমিক ৫ থেকে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ চলাচলের উপযোগী করতে এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ায় নিরীক্ষায় প্রকল্পের পুরো ব্যয়কে আর্থিক ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছে, নির্ধারিত গভীরতায় ড্রেজিং করা হলেও পশুর নদীতে পলি জমার হার বেশি হওয়ায় চ্যানেলটি আবার দ্রুত ভরাট হয়ে যায়। তবে প্রকল্পের আগে পলি জমার মাত্রা ও নদীর গতিপ্রকৃতি যথাযথভাবে নিরূপণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংসদীয় কমিটি। অডিট বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা তৈরি করা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নে যুক্ত কর্মকর্তাদের দায়দায়িত্ব নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছে কমিটি। পাশাপাশি অপচয় হওয়া সরকারি অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে আদায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

বৈঠকে ড্রেজিং কাজ পরিচালনা ও এর বিল পরিশোধের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অপচয় ঠেকাতে কাজের পরিমাণের পাশাপাশি ফলাফলভিত্তিক চুক্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ মাটি অপসারণের পাশাপাশি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত চ্যানেলের কাঙ্ক্ষিত গভীরতা বজায় রাখার দায়িত্বও ঠিকাদারকে নিতে হবে।

এদিকে পশুর চ্যানেলে প্রতিবছর সংরক্ষণ ড্রেজিংয়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হলেও পলি জমার সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে পলি জমার হার কমাতে নদী শাসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য ২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে পশুর চ্যানেলে নদী শাসনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার একটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মোংলা ও পায়রা বন্দরের ড্রেজিং কার্যক্রম, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও নিরীক্ষা আপত্তি পর্যালোচনায় কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পে অনিয়ম বা আর্থিক ক্ষতির বিষয় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণ ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত তাদের মোট স্থায়ী আমানত ছিল ১১ হাজার ১৩৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকার বেশি। এর মধ্যে আর্থিক সংকটে থাকা ছয়টি ব্যাংকে ছিল ১ হাজার ২৬২ কোটি ১৬ লাখ ৭৮ হাজার ৩৮৪ টাকা, যা মোট স্থায়ী আমানতের প্রায় ১১ দশমিক ৩৪ শতাংশ। পদ্মা ব্যাংকে ছিল ১৭৯ কোটি ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অন্য পাঁচটি ব্যাংক—গ্লোবাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী, এক্সিম ও ইউনিয়ন ব্যাংকে সম্মিলিত আমানত ছিল ১ হাজার ৮২ কোটি ৮৫ লাখ ২৮ হাজার ৩৮৪ টাকা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব ব্যাংকে তারল্যসংকট থাকায় আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত। এ অবস্থায় আমানত ফেরত পাওয়ার ঝুঁকি থাকলেও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানদণ্ড আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী সম্ভাব্য ক্ষতির জন্য হিসাবভিত্তিক সংস্থান না রাখায় নিরীক্ষায় আপত্তি তোলা হয়েছে। এই সংস্থান আর্থিক হিসাবে সম্ভাব্য ঝুঁকির প্রভাব তুলে ধরতে রাখা হয়। তবে নিরীক্ষায় পুরো আমানত ক্ষতি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা পাঁচটি ইসলামি ব্যাংক একীভূত করে রাষ্ট্রায়ত্ত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাংকটি ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া শুরু করলেও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মতো প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের বর্তমান অবস্থা জানা যায়নি।