রেলের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা
রেলের দুটি রুটে নতুন আন্তনগর ট্রেন চালু, পুরোনো কারখানার আধুনিকায়ন ও নতুন কারখানা স্থাপন, অকেজো ডেমু ট্রেনকে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীবাহী কমিউটার ট্রেনে রূপান্তর ও জনপ্রিয় রুটে বেসরকারি ট্রেন চালুর মতো বিভিন্ন নতুন উদ্যোগের কথা ভাবছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। রেল যোগাযোগের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এসব উদ্যোগ নেওয়ার কথা হচ্ছে। এ বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে আজ বৃহস্পতিবার রেলপথ মন্ত্রণালয়ে সভা হবে।
রেলের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর দিক-নির্দেশনার বিষয়টি জানা গেছে রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে। জানা গেছে, ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে রেল নিয়ে যেসব অঙ্গীকার করা হয়েছে, তার দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী এসব নির্দেশনা দিয়েছেন।
পরিকল্পনার মধ্যে আরও রয়েছে শিক্ষার্থী, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ভাড়া ছাড়, ঢাকা-চট্টগ্রাম যাত্রার সময় কমানোর মতো উদ্যোগ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল বুধবার রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘রেলের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সেগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তা নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় এসব দিকনির্দেশনার বাইরেও আরও কিছু যুক্ত হতে পারে।’
প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় বলা হয়েছে, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১৮০ দিনের মধ্যে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে রেলের উন্নয়নের অঙ্গীকারের বাস্তবায়নযোগ্য অংশের কার্যক্রম দৃশ্যমান করতে হবে। সে অনুযায়ী বাজেটে অর্থ সংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।
নির্দেশনায় ঢাকা-পাবনা-ঢাকা ও ঢাকা-খুলনা-ঢাকা রুটে দুটি নতুন আন্তনগর ট্রেন চালু করতে বলা হয়েছে। কবে তা চালু হবে সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। রেলের কর্মকর্তারা বলেছেন, ভারত থেকে ২০০টি কোচ আনা হচ্ছে প্রকল্পের মাধ্যমে। এর প্রথম দফার কোচগুলো আগামী মে থেকে জুনের মধ্যে আসার কথা। নতুন কোচ এলে চালু হতে পারে নতুন ট্রেন সার্ভিস দুটি।
এ ছাড়া রেলওয়ের আলোচিত-সমালোচিত অকেজো ও অব্যবহৃত ডেমু ট্রেনকে ব্যবহারের উপযোগী কমিউটার ট্রেনে রূপান্তর করতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করার কথাও বলা হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে আগ্রহী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে একটি করে ডেমু ট্রেন ব্যবহারের উপযোগী করার দায়িত্ব দেওয়া হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভালো কাজ করা প্রতিষ্ঠানকে বাকি ডেমু ট্রেনগুলো ব্যবহারের উপযোগী করার কাজ দেওয়া হবে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে সরকারের পরিকল্পনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কার্যক্রমগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে তার বাস্তবায়নে বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে রেলের উন্নয়নে অগ্রাধিকারমূলক কাজগুলো চিহ্নিত করে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
রেলওয়ের বিদ্যমান কারখানাগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের পাশাপাশি সংযোজন (অ্যাসেম্বলিং) সুবিধা চালুর উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ ওয়ার্কশপ (সিএলডব্লিউ)-এর বিদ্যমান অবকাঠামোর আধুনিকায়ন ও নতুন একটি ইউনিট স্থাপনের দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এ জন্য অনুমোদিত প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
রেলের নিজস্ব জমিতে ইঞ্জিন ও বগি উৎপাদনের নতুন কারখানা স্থাপনে বিদেশি বিনিয়োগ ও বেসরকারি অংশীদারত্ব উৎসাহিত করতে বলা হয়েছে। ইঞ্জিনের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় চুক্তি করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল করিডরে যাত্রার সময় কমিয়ে ৪ ঘণ্টায় নিয়ে আসতে বলা হয়েছে। টঙ্গী-আখাউড়া ও লাকসাম-চট্টগ্রাম সেকশনের ২২৭ কিলোমিটার ডাবল লাইন হয়নি। এই ২২৭ কিলোমিটার আগামী চার বছরের মধ্যে ডুয়েলগেজ লাইনে রূপান্তর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জনপ্রিয় রুটে বেসরকারি অংশীদারদের সেবা দেওয়ার সুযোগ করে দিতে বলা হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে এই ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে।
ঢাকা শহরের যানজট কমাতে ঢাকা-টঙ্গী সেকশনের গুরুত্বপূর্ণ লেভেল ক্রসিংয়ে আন্ডারপাস/ওভারপাস নির্মাণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া এসব নির্দেশনা কীভাবে এবং কত দিনের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে বিস্তারিত পরিকল্পনা জানতে চাওয়া হয়েছে।
রেল মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা, নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে ২০২৬-২৭ অর্থবছরব্যাপী কর্মপরিকল্পনা এবং আগামী পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কৌশল নির্ধারণ করতে ৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘রেল উন্নয়নের উদ্যোগগুলো প্রয়োজনীয়। তবে বাস্তবায়নের আগে রেলের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও দক্ষ জনবলের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। ইঞ্জিন-কোচের সংকটের পাশাপাশি প্রযুক্তি বোঝার মতো মানবসম্পদও দরকার। ডেমু ট্রেন পুনরায় চালুর মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেটি টেকসই ও ব্যয়সাশ্রয়ী হবে কি না তা যাচাই করা জরুরি। এ জন্য রেল পরিচালনায় অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে উদ্যোগগুলো পর্যালোচনা করা উচিত। না হলে এসব সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।’