চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের গবেষণা
২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নেওয়া মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে ২৯টিতে গড়ে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ ব্যয় বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দুর্নীতি, অদক্ষতা ও যোগসাজশের মাধ্যমে হারিয়ে গেছে। এমন চিত্র উঠে এসেছে একটি গবেষণায়।
গতকাল বুধবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘সরকারি ঋণ ও সুশাসন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এই গবেষণা উপস্থাপন করা হয়। গবেষণাটি পরিচালনা করে যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন একটি শিক্ষা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, সহযোগিতায় একটি আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা এবং দেশের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, ২০০৯ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১২ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ ১৬ বছরে বৃদ্ধি প্রায় ৩৭৭ শতাংশ। একই সময়ে সুদ পরিশোধের চাপও বেড়েছে। বর্তমানে সরকারি আয়ের প্রতি ৫ টাকার মধ্যে ১ টাকা শুধু সুদ পরিশোধেই ব্যয় হচ্ছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য সরকারের হাতে কম অর্থ থাকছে।
২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পরিবহন, বিদ্যুৎ, বন্দর, বিমান চলাচল, শিল্পাঞ্চলসহ ৪২টি মেগা প্রকল্প বিশ্লেষণ করে এই চিত্র মিলেছে।
আলোচনায় অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুশতাক এইচ খান বলেন, ‘চুক্তির দামে সামান্য বাড়তি নির্ধারণও দীর্ঘ মেয়াদে বিশাল আর্থিক বোঝা তৈরি করে। কয়েক সেন্ট বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনলেও ২০ থেকে ২৫ বছরে তা বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত দায়ে রূপ নেয়।’ তাঁর মতে, সমস্যা শুধু ঋণের পরিমাণ নয়; বরং প্রতিযোগিতাহীন চুক্তি, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল জবাবদিহিই বড় ঝুঁকি।
গবেষণায় অবকাঠামো প্রকল্পে দুই ধরনের ব্যর্থতার কথা বলা হয়েছে। প্রথমত, প্রকল্প সঠিকভাবে নির্মিত হলেও দাম অতিরিক্ত বেশি ধরা হয়। এতে আয় দিয়ে ব্যয় ওঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, দুর্বল পরিকল্পনা ও ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণে অনেক প্রকল্প প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারে না। ফলে আয় কম হয়, কিন্তু ঋণের কিস্তি নিয়মিত দিতে হয়।
বিদ্যুৎ খাতে চাপ
গবেষণার তথ্যে বিদ্যুৎ খাতকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে। ২০২৫ সালে স্থির সক্ষমতা চার্জ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ ব্যবহার হোক বা না হোক, সরকারকে নির্দিষ্ট অঙ্ক পরিশোধ করতে হচ্ছে। উচ্চমূল্যের চুক্তির কারণে বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যাতে খুচরা বিদ্যুতের দাম সহনীয় রাখা যায়। ভর্তুকি বন্ধ হলে বিদ্যুতের দাম ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে।
২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদকদের পরিশোধ ১১ গুণ এবং সক্ষমতা চার্জ ২০ গুণ বেড়েছে, অথচ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র চার গুণ। অনেক কেন্দ্র জ্বালানি সংকটে অলস থাকলেও চুক্তির কারণে অর্থ পরিশোধ অব্যাহত রয়েছে।
শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা
গবেষণায় ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার আর্থিক সংকটের উদাহরণ তুলে ধরা হয়। দেশটির প্রায় ৬৫ শতাংশ বৈদেশিক ঋণ অবকাঠামো খাতে ব্যয় হয়েছিল। কিন্তু অনেক প্রকল্প প্রত্যাশিত আয় দিতে পারেনি। সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ্রা রাজাপক্ষের সময় নেওয়া একাধিক প্রকল্প পরে অকার্যকর হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত আয় না থাকায় ঋণ পরিশোধে চাপ বাড়তে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত দেশটি গভীর সংকটে পড়ে।
গবেষকদের মতে, বাংলাদেশেও একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। প্রকৃত ঋণ-জিডিপি অনুপাত সংশোধিত হিসাবে ৪২ শতাংশ, যেখানে আগে ৩৩ শতাংশকে নিরাপদ বলা হতো। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই অনুপাত ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
আলোচনায় চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের জাকির হোসেন খান বলেন, ‘জ্বালানি হলো অর্থনীতির প্রাণশক্তি। কিন্তু আমাদের বৈদেশিক ঋণ ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করার পরেও যদি দুর্নীতিতে নিমজ্জিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বার্ষিক ৫ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি অব্যাহত রাখা হয়, তবে বাংলাদেশ দ্রুতই আর্থিক দেউলিয়াত্বের দিকে এগিয়ে যাবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মহাপরিকল্পনা দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ডদের দ্বারা হাইজ্যাক হয়েছে।’
নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংগঠন বিএসআরইএ প্রেসিডেন্ট মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, ‘যেখানে সৌরবিদ্যুতের দাম ৫ সেন্টের নিচে, সেখানে আমাদের আমদানির পেছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার নষ্ট করা বন্ধ করতে হবে। গ্রিড-সংলগ্ন জমির মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ করা এখন আর কোনো বিকল্প নয়, এটি বাংলাদেশের বেঁচে থাকার জন্য একটি অপরিহার্য কৌশল।
বাংলাদেশ আমেরিকা অ্যালায়েন্সের কো-চেয়ার কাওসার চৌধুরী বলেন, ‘৫ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি এবং ৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত সক্ষমতা নিয়ে আমরা এক অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। খরচ এবং দুর্নীতি কমাতে সরকারি জমিতে; যেমন খালের ওপর, প্রতিযোগিতামূলক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প অপরিহার্য।’