‘অনুরোধ করা পৃষ্ঠাটি খুঁজে পাওয়া যায়নি।’ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পদাধিকারী ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে ‘বঙ্গভবনের ইতিহাস’ পাতায় ঢুকলে এমন বার্তা দেখা গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইটেও রয়েছে একাধিক অসম্পূর্ণ পাতা। প্রধানমন্ত্রীর জীবনবৃত্তান্ত, জাতির উদ্দেশে ভাষণ ও অন্যান্য ভাষণের জন্য আলাদা পাতা থাকলেও সেগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। ফটো গ্যালারিতে রয়েছে শুধু গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের ছবি। অথচ ওয়েবসাইটে সর্বশেষ হালনাগাদের তারিখ বলা হয়েছে ১৪ অক্টোবর, ২০২৬!
খোদ রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানের কার্যালয়ের অসম্পূর্ণ ওয়েবসাইটই বলে দেয়, দেশের অন্যান্য সরকারি দপ্তরের সাইটের চিত্র কেমন হতে পারে। সব ক্ষেত্রে এক রকম না হলেও সরকারি ওয়েবসাইটগুলোর অসম্পূর্ণতা, ত্রুটিসহ নানা ঘাটতির অভিযোগ অনেক পুরোনো।
সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় তথ্য এক জায়গায় সহজে পাওয়ার কথা। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ইতিহাস, সেবা, কর্মকর্তাদের তথ্য, নীতিমালা, বার্ষিক প্রতিবেদন, প্রজ্ঞাপন ও যোগাযোগের তথ্য ওয়েবসাইটে যুক্ত করা ও নিয়মিত হালনাগাদের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ দপ্তরই তা যথাযথভাবে অনুসরণ করে না। কোনো কোনো ওয়েবসাইটে নতুন খবর ও নোটিশ নিয়মিত প্রকাশ করা হচ্ছে। কিন্তু স্থায়ী তথ্যের পাতাগুলো বছরের পর বছর একই অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে ওয়েবসাইটে ‘সর্বশেষ হালনাগাদ’ লেখা থাকলেও পুরো সাইটটি হালনাগাদ —এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়াও ওয়েবসাইটগুলোতে রয়েছে ভাঙা বা অকেজো লিঙ্ক। সব মিলিয়ে ওয়েবসাইটগুলো যেন হয়ে উঠেছে অসম্পূর্ণ ও পুরোনো তথ্যের ভান্ডার। অনেক ক্ষেত্রে বহু তথ্য জমা হলেও তা প্রায়ই অগোছালো, অপ্রয়োজনীয় বা অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারের অনুপযোগী।
সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইটের বিষয়ে কোনো নীতিমালা না থাকলেও নির্দেশিকা রয়েছে। গত ২৫ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ‘সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইট নির্দেশিকা-২০২৬’ জারি করে।
সেখানে বলা হয়েছে, ওয়েবসাইটগুলোতে দপ্তর পরিচিতি, ইতিহাস, কার্যাবলি, সেবাসমূহ, নীতিমালা, আইন, বিধি, প্রকাশনা, বার্ষিক প্রতিবেদন, চলমান প্রকল্প, সমাপ্ত প্রকল্প, বাজেট, ক্রয়সহ সব তথ্য থাকতে হবে। ওয়েবসাইটে কর্মকর্তাদের নাম, পদ ও পদবি, পরিচিতি নম্বর, শাখার নাম, মোবাইল নম্বর, টেলিফোন নম্বর যুক্ত করতে বলা হয়েছে। পুরোনো তথ্যের আর্কাইভ, মেয়াদোত্তীর্ণ তথ্য ও নথি মূল পাতা থেকে সরিয়ে সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে নির্দেশিকায়। কিন্তু খুব কম ওয়েবসাইটেই শতভাগ তথ্য পাওয়া গেছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ই-পার্টিসিপেশন পাতাটি ফাঁকা পড়ে আছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে চলমান ও সমাপ্ত প্রকল্পসমূহের লিংকে প্রবেশ করা যায় না। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক ওয়েবসাইটে চলমান প্রকল্পের পাতায় প্রবেশ করা গেলেও সেখানে কোনো তথ্য নেই। মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ দপ্তরের যোগাযোগের পাতাটিও তথ্যশূন্য। কৃষি মন্ত্রণালয়ে সমাপ্ত প্রকল্পের তথ্য থাকলেও চলমান প্রকল্পের পাতা ফাঁকা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে চলমান প্রকল্পের পাতায় যুক্ত হয়েছে সমাপ্ত প্রকল্পের তথ্য। হালনাগাদ বার্ষিক প্রতিবেদন নেই বেশির ভাগ দপ্তরের ওয়েবসাইটে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৩ সালের পর কোনো বার্ষিক প্রতিবেদনও সাইটে যুক্ত হয়নি।
সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইট তৈরির কাজ করে থাকে সরকারের আইসিটি বিভাগ ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং ইউএনডিপির যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত প্রোগ্রাম এসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই)। এর প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ার উদ্দিন বলেন, ‘এটুআইয়ের মূল কাজ ছিল ওয়েবসাইট তৈরি করা। নিয়মিত তথ্য হালনাগাদের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দপ্তরের। আমরা তাদের এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে থাকি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনোটির এ জন্য পর্যাপ্ত জনবল বা কারিগরি সক্ষমতা না থাকলে হালনাগাদে কিছুটা সময় লাগতে পারে।’
১৩১ সাইটে ৮ হাজারের বেশি ভাঙা লিংক সরকারি তথ্য ও সেবার জন্য চালু করা ওয়েবসাইটগুলোতে তথ্য খুঁজতে গেলেই পাওয়া যায় ভাঙা বা অকেজো লিংক। ডকেট বিডি নামের একটি প্ল্যাটফর্ম দেশের ১৩১টি সরকারি ওয়েবসাইট নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে থাকে। প্ল্যাটফর্মটি গত ৩০ আগস্ট থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি সাইটগুলোতে ৮ হাজার ৬১০টি ভাঙা লিংক শনাক্ত করেছে। সাইটগুলো ৬৭টি মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও সংস্থার অধীনে পরিচালিত হয়ে থাকে।
ডকেট বিডির ‘বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ওয়েবসাইট মনিটর’ নামের এই ব্যবস্থায় সরকারি ওয়েবসাইটগুলো প্রতি সপ্তাহে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরীক্ষা করা হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা রাজকুমারী (একশব্দের নাম) বলেন, ‘এ ব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা সরকারি ওয়েবসাইটগুলোতে কী কী সেবা রয়েছে এবং কোথায় সমস্যা রয়েছে, তা শনাক্তের চেষ্টা করি। আমরা ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্য দিয়েছি। এরপর ওয়েবসাইটগুলোতে পরিবর্তন হয়ে থাকতে পারে।’
সরকারি অনেক ওয়েবসাইটে বিপুলসংখ্যক নোটিশ ও নথি রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পাওয়ার ব্যবস্থা সহজ নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে নোটিশের সংখ্যা ১২ লাখ ৪৮ হাজার ৯১৭। এত বিপুল তথ্যের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথি দ্রুত খুঁজে পেতে কার্যকর অনুসন্ধান ও শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থা দরকার। কোন নথি কার্যকর, কোনটি সংশোধিত, কোনটি বাতিল, সে বিষয়টি স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়েবসাইট হালনাগাদ করা মানে শুধু নতুন খবর বা নোটিশ প্রকাশ নয়। কর্মকর্তাদের নাম ও যোগাযোগের তথ্য, সেবা, নীতিমালা, ফরম, প্রকল্পের তথ্য, পুরোনো নথি এবং বিভিন্ন লিংকও নিয়মিত যাচাই করা প্রয়োজন। চাকরির আবেদন, সরকারি সেবা, নীতিমালা, প্রজ্ঞাপন, অনুমোদন, অভিযোগ ও যোগাযোগের তথ্যের জন্য বহু মানুষ এখন সরকারি ওয়েবসাইটের ওপর নির্ভর করছেন।
ডিজিটাল ডেমোক্রেসি-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এ এইচ এম বজলুর রহমান বলেন, ‘ওয়েবসাইট সচল, হালনাগাদ, সহজে অনুসন্ধানযোগ্য এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের উৎস হওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের দেশে সরকারি সাইটগুলোতে অনেক সময়ই প্রয়োজনীয় ও হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায় না। এ জন্য সরকারি ওয়েবসাইট হালনাগাদ নীতিমালা বা কত দিন পরপর ওয়েবসাইটের তথ্য হালনাগাদ হবে, সে বিষয়ে নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।’
প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরে ওয়েবসাইট পরিচালনা ও তথ্য হালনাগাদের জন্য জনবল রয়েছে উল্লেখ করে বজলুর রহমান বলেন, কার দায়িত্ব কী, কোন তথ্য কত দিনের মধ্যে হালনাগাদ করতে হবে, এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় ব্যবস্থাপনার কাজটি অনেক ক্ষেত্রে দুর্বলভাবে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সরকারি ওয়েবসাইট হালনাগাদ থাকা এবং এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে বিষয়টি প্রতি মাসের মন্ত্রণালয় বা দপ্তরভিত্তিক সমন্বয় সভার আলোচ্যসূচিতে রাখা যেতে পারে।
তথ্য প্রযুক্তিবিদ তানভীর হাসান জোহা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সাইটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের অনেকে এখন পলাতক। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রকৌশলী থাকলেও তাঁদের দায়িত্ব মূলত ইন্টারনেট ও আইটি নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এটুআইয়ের হয়ে কাজ করা ভেন্ডরদের কাছ থেকে ওয়েবসাইট বুঝে নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য ও পাসওয়ার্ড হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক ওয়েবসাইটের রক্ষণাবেক্ষণ শুধু নামমাত্র হচ্ছে। দপ্তরগুলো অনেক সময় মনে করে, ওয়েবসাইট হালনাগাদ করার দায়িত্বও এটুআই এর, তাদের নয়। এভাবে দায়িত্বের বিষয়টি এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষের দিকে ঠেলে দেওয়ার কারণেও ওয়েবসাইটগুলো কার্যত অবহেলিত থেকে যাচ্ছে।